মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পরিপাকতন্ত্র। আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই, তা হজম করে শরীরের শক্তি জোগানো থেকে শুরু করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার কাজও করে এই পরিপাকতন্ত্র। অথচ অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, ভেজাল খাবার, ফাস্টফুড, মানসিক চাপ এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবে দেশে দিন দিন বাড়ছে পেটের নানা জটিল রোগ।
২৯ মে, বিশ্ব পরিপাক স্বাস্থ্য দিবস (World Digestive Health Day)। বিশ্ব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সংস্থা (WGO) প্রতিবছর দিবসটি পালন করে পরিপাকতন্ত্রের সুস্থতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে। এ বছরের প্রতিপাদ্য— “Chronic Diarrhea: Don’t Flush the Signs Away” অর্থাৎ, “দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়ার লক্ষণ অবহেলা নয়”।
প্রতিটি ঘরের ‘নীরব ভুল’ ও শিশুর পেটের ঝুঁকি
বাংলাদেশের বহু পরিবারে শিশুদের খাবারের সঙ্গে ঘনঘন পানি খাওয়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। অনেক মা মনে করেন, এতে খাবার সহজে গিলতে সুবিধা হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এই অভ্যাস শিশুর হজমশক্তির জন্য ক্ষতিকর।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. নাঈমা সুলতানা বলেন, “খাবার চিবানোর সময় মুখের লালা এবং পাকস্থলীর পাচক রস খাবার হজমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত পানি পান করলে এই পাচক রস পাতলা হয়ে যায়, ফলে হজমে সমস্যা তৈরি হয়। এতে শিশুরা বদহজম, গ্যাস, পেট ফাঁপা ও পুষ্টিহীনতায় ভুগতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “শিশুকে খাবারের অন্তত আধাঘণ্টা আগে বা পরে পানি খাওয়ানো ভালো। খাবারের মাঝখানে খুব প্রয়োজন হলে সামান্য পানি দেওয়া যেতে পারে, তবে প্রতি লোকমায় পানি খাওয়ানোর অভ্যাস বন্ধ করতে হবে।”
ঘুম থেকে উঠেই দাঁত ব্রাশ: বাড়ছে গ্যাস্ট্রিকের ঝুঁকি?
দেশের অনেক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মতে, সকালে ঘুম থেকে উঠেই খালি পেটে দাঁত ব্রাশ করার অভ্যাসও পরিপাকতন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ফার্মাসিস্ট মেহেদী হাসান রুমী বলেন, “রাতভর মুখে জমে থাকা লালায় কিছু প্রাকৃতিক এনজাইম থাকে, যা হজমে সহায়তা করে। সকালে উঠে পানি পান করার আগেই ব্রাশ করলে সেই প্রাকৃতিক উপাদান নষ্ট হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস্ট্রিক বা বুক জ্বালাপোড়ার কারণ হতে পারে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “দেশে পেটের সমস্যায় রোগীদের অনেক সময় কারণ খুঁজে বের না করেই দীর্ঘদিন গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ দেওয়া হয়। জীবনযাত্রার ভুলগুলোও রোগীদের বোঝানো দরকার।”
মন ও পেটের গভীর সম্পর্ক
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখন “গাট-ব্রেন কানেকশন” বা মন-পেটের সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হচ্ছে। মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং অনিদ্রা সরাসরি হজমে প্রভাব ফেলে।
এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. পলাশ রায় বলেন, “পেটকে শরীরের দ্বিতীয় মস্তিষ্ক বলা হয়। মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা এবং অনিদ্রা অনেক সময় হজমপ্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। আইবিএস বা ফাংশনাল ডিসপেপসিয়ার মতো রোগের পেছনে মানসিক অস্থিরতাও বড় কারণ।”
বাড়ছে গ্যাস্ট্রিক, আলসার ও লিভারের রোগ
মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের কনসালটেন্ট ডা. মো. আব্দুল্লাহ আল মারুফ বলেন, “বর্তমানে হাসপাতালে আসা রোগীদের বড় একটি অংশ গ্যাস্ট্রিক, আলসার, আইবিএস, লিভারের সমস্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়ায় ভুগছেন। অনিয়ন্ত্রিতভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খাওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।”
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মুক্তা দাশ বলেন, “অনেক মানুষ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খান। এতে লিভার ও কিডনির ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।”
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আশরাফ আলী বলেন, “পরিপাকতন্ত্র ভালো রাখতে হলে খাবারে আঁশ বাড়াতে হবে, পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে এবং নিয়মিত হাঁটাচলা করতে হবে।”
পুষ্টি ও লিভার বিশেষজ্ঞ ডা. ফাহমিদা সুলতানা বলেন, “সঠিক পুষ্টি এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাপনই সুস্থ পরিপাকতন্ত্রের মূল চাবিকাঠি।”
নারী ও শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে
চট্টগ্রামের মেমন মাতৃসদন হাসপাতালের প্রাক্তন সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. প্রীতি বড়ুয়া বলেন, “গর্ভাবস্থায় হরমোন পরিবর্তনের কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য ও এসিডিটির সমস্যা বাড়ে। ভুল খাদ্যাভ্যাস এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবনে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।”
এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রাক্তন সহকারী অধ্যাপক (শিশু বিশেষজ্ঞ) ডা. জিল্লুল হক বলেন, “চিপস, কোমল পানীয় ও ফাস্টফুড শিশুদের হজমশক্তি নষ্ট করছে। শিশুদের ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর খাবারে অভ্যস্ত করতে হবে।”
ভুক্তভোগী ও মাঠপর্যায়ের কণ্ঠস্বর
সাতক্ষিরা সদর উপজেলার ফতেপুর সপ্রাবি’র সহকারী শিক্ষিকা মিথিলা ফারজানা (৩৭) নিজের দীর্ঘদিনের শারীরিক সমস্যার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, “পেশাগত ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় সময়মতো খাওয়া হয় না। গত কয়েক বছর ধরে আমি গ্যাস্ট্রিক ও আইবিএস (IBS)-এর সমস্যায় ভুগছি। একটু ভাজাপোড়া খেলেই পেট ফুলে যায়, বুকে ব্যথা করে। আমরা শিক্ষকরাই যদি নিজেদের পরিপাক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন না থাকি, তবে শিক্ষার্থীদের কী শেখাব? কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই রোগগুলো নিয়ে সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কোনো সচেতনতামূলক সেমিনার বা প্রচারণা কখনোই আমাদের চোখে পড়ে না।”
শিশুদের অধিকার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা তুলে ধরে ন্যাশনাল চিল্ড্রেন টাস্ক ফোর্স (এনসিটিএফ) বরিশালের বামনা উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শাহ মুহাম্মদ শাফি উদ্দিন বলেন, “আমাদের গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার স্কুলগুলোতে শিশুরা অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং অনিরাপদ পানি পানের কারণে প্রায়ই ডায়রিয়া ও পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়। বিশ্ব পরিপাক স্বাস্থ্য দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনেও মাঠপর্যায়ে কোনো সরকারি ক্যাম্পেইন হয় না। আমরা চাই, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের পরিপাক স্বাস্থ্য সচেতনতায় বিশেষ ক্লাস নেওয়া হোক।”
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণেও স্বাস্থ্য সচেতনতার গুরুত্ব
হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার পূর্ব সিংহ গ্রাম জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব মুফতি হাফেজ মাওলানা মনিরুল ইসলাম বলেন, “ইসলামে স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে বড় নেয়ামত বলা হয়েছে। রাতে দ্রুত ঘুমানো এবং ভোরে জেগে ওঠা সুন্নাত। নিয়মিত জীবনযাপন শরীর সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। রাত জাগা ও অনিয়মিত জীবনযাপন পেটের নানা রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।”
মৌলভীবাজার পৌরসভার দক্ষিণ কলিমাবাদ জামে মসজিদের খতিব ও ইমাম মাওলানা আব্দুন নুর বলেন, “আমরা সুন্নাহভিত্তিক খাবার গ্রহণ করি না। রাসূল (সা.) পরিমিত খাবার গ্রহণের শিক্ষা দিয়েছেন। একভাগ খাবার, একভাগ পানি এবং একভাগ খালি রাখার নির্দেশনা মানলে অনেক পেটের সমস্যা কমে যেত। এছাড়া ভোরে হাঁটা, দুপুরে কিছু সময় বিশ্রাম এবং রাতে হাঁটার সুন্নাহও শরীর সুস্থ রাখতে সহায়ক। নিয়মিত নামাজ আদায়ও একটি উত্তম শারীরিক ব্যায়াম, যা পরিপাকতন্ত্র ভালো রাখতে সাহায্য করে।”
গণমাধ্যম ও সরকারের ভূমিকা
EyeNews.news-এর সম্পাদক হাসানাত কামাল বলেন, “আমাদের পরিপাকতন্ত্র বা পেটকে শরীরের ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’ বলা হয়। বর্তমান ব্যস্ত ও যান্ত্রিক জীবনে ফাস্টফুড, মানসিক চাপ এবং অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস আমাদের পরিপাকস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত সহজ কিন্তু কার্যকর স্বাস্থ্যসচেতনতা বিষয়গুলো নিয়মিতভাবে তুলে ধরা।”
সরকারি প্রচারণার ঘাটতির অভিযোগ
স্বাস্থ্যসচেতন মহলের অভিযোগ, বিশ্ব পরিপাক স্বাস্থ্য দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি দিবস বাংলাদেশে প্রায় নীরবেই পার হয়ে যায়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন, সেমিনার বা স্বাস্থ্য বার্তা খুব কমই দেখা যায়।
জালালাবাদ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আনহার সমশাদ বলেন, “সরকারি প্রচারণার অভাবে দেশের অধিকাংশ মানুষই জানেন না যে ২৯ মে বিশ্ব পরিপাক স্বাস্থ্য দিবস। গণমাধ্যমকেও জনস্বাস্থ্যের বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব দিতে হবে।”
তরুণদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে উদ্বেগ
পৌরসভা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মৌলভীবাজারের ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান বলেন, “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে বেশিরভাগ খাবারই অস্বাস্থ্যকর। আমরা রাস্তার পাশে বসা ঝালমুড়ি, ফুচকা, চানাচুর, সমুচা, সিংগারা খেয়ে থাকি। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পেটের সমস্যা বাড়ছে। কিন্তু স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে কোনো কার্যকর প্রচারণা নেই।”
উপসংহার
পরিপাকতন্ত্রের বেশিরভাগ রোগই সচেতনতা ও সঠিক জীবনযাপনের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। স্বাস্থ্যকর খাবার, পরিচ্ছন্নতা, মানসিক প্রশান্তি এবং নিয়মিত জীবনযাপন একটি সুস্থ পরিপাকতন্ত্রের ভিত্তি।
বিশ্ব পরিপাক স্বাস্থ্য দিবসে বিশেষজ্ঞদের আহ্বান, শুধু চিকিৎসা নয়, প্রয়োজন দেশব্যাপী স্বাস্থ্য সচেতনতা। সরকারের পাশাপাশি চিকিৎসক, গণমাধ্যম, শিক্ষক, পরিবার এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগেই গড়ে উঠতে পারে সুস্থ ও রোগমুক্ত প্রজন্ম।










পাঠকের মন্তব্য