অবৈধ সিন্ডিকেটের তাণ্ডবে মহাসড়ক জিম্মি

বিশেষ প্রতিবেদকঃ

প্রশাসনের নাকের ডগায় ১০ বছরের অনিয়ম; বিআরটিএ নথিতে ধরা পড়ল ৩২ বাসের অধিকাংশেরই নেই বৈধ রুট পারমিট!

ছবি সংগ্রহ

শ্রীমঙ্গল ‘এসএমএস’ ও হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে। শনিবার সকাল থেকে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ নতুন ব্রিজ এলাকায় যাত্রীবাহী বাস আড়াআড়ি করে রেখে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে হবিগঞ্জের পরিবহন শ্রমিক-মালিকরা। তীব্র গরমে শতাধিক বাস-ট্রাক আটকা পড়ায় হাজারো যাত্রী চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী ও পুলিশ আলোচনা চালালেও মীমাংসা হয়নি। এদিকে এই বিরোধের মূলে ধরা পড়েছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—‘হবিগঞ্জ-সিলেট ভায়া মৌলভীবাজার’ রুটে চলা অধিকাংশ বাসেরই নেই বৈধ রুট পারমিট! বিআরটিএ নথি বলছে, প্রশাসনের চোখের সামনেই দীর্ঘ ১০ বছর ধরে চলছে কোটি টাকার অবৈধ পরিবহন ব্যবসা।

ছবি সংগ্রহ

মহাসড়ক অবরোধে স্থবির যোগাযোগ: শনিবার পূর্বঘোষিত এ কর্মসূচিতে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ নতুন ব্রিজের ফ্লাইওভারের নিচে উভয় করিডোরে আড়াআড়িভাবে দাঁড় করানো হয়েছে এক্সপ্রেস বাস। ফলে ঢাকামুখী ও সিলেটমুখী—দুই পথেই যানচলাচল পুরোপুরি বন্ধ। অবরোধের কারণে পণ্যবাহী ট্রাক ও দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস আটকা পড়ে আছে প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে।

দীর্ঘদিনের বিরোধের জের: জানা গেছে, হবিগঞ্জ থেকে মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গল হয়ে সিলেটগামী বিরতিহীন এক্সপ্রেস বাসগুলোর স্টপেজ ও চলাচল নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে দুই জেলার পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। হবিগঞ্জ পক্ষের অভিযোগ, শ্রীমঙ্গল ‘এসএমএস’ বাস মালিক সমিতি ও স্থানীয় শ্রমিকরা তাদের নির্ধারিত স্টপেজ দিতে দিচ্ছে না; বাস আটক, চালক-হেলপারকে হয়রানি ও মারধর করা হচ্ছে। প্রশাসনের আশ্বাস সত্ত্বেও সমাধান না হওয়ায় পিঠ দেয়ালে ঠেকে তারা এই অনড় আন্দোলন শুরু করেছে।

যাত্রী দুর্ভোগের চরমমাত্রা: তীব্র দাবদাহে মহাসড়কে আটকে আছেন শত শত সাধারণ যাত্রী। অনেকের কাছে পানি-খাবার নেই। অসুস্থ রোগী ও শিশুদের নিয়ে পড়েছেন বিপাকে। কিছু পরিবহন বিকল্প রুট (নসরতপুর-মিরপুর হয়ে) ব্যবহার করলেও বাড়তি সময় ও ভোগান্তি কমছে না। পণ্যবাহী ট্রাকচালকরা বলছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকায় মাল পচে যাওয়ার শঙ্কা।

প্রশাসনের ব্যর্থতা ও চাঞ্চল্যকর তথ্য: ঘটনাস্থলে ছুটে এসেছেন সেনাবাহিনী, জেলা পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন। তবে মৌলভীবাজার পক্ষের অনুপস্থিতিতে আলোচনা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। প্রশাসন উভয়পক্ষকে এক টেবিলে বসানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে, এই বিরোধের মূলে ধরা পড়েছে প্রশাসনের নাকের ডগায় দশ বছর ধরে চলা এক অবৈধ কারবার। ‘হবিগঞ্জ-সিলেট এক্সপ্রেস’ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে উদ্ধারকৃত বিআরটিএ ও পরিবহন নথি বিশ্লেষণে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে:

· এই রুটে চলা ৩২টি বাসের অধিকাংশের কোনো বৈধ রুট পারমিট নেই।

· অনেক গাড়ির ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদ বহু বছর আগে শেষ।

· কিছু বাসের পারমিট সম্পূর্ণ ভিন্ন রুটের (সায়েদাবাদ-সোনাপুর, টাঙ্গাইল-মাঝদিহী, গাবতলী-পটুয়াখালী ইত্যাদি)।

· দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বাতিল ও পুরনো গাড়ি এনে অবৈধভাবে ‘হবিগঞ্জ-সিলেট ভায়া মৌলভীবাজার’ রুটে নামানো হয়।

তার মানে, প্রশাসনের চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়িয়েও কেউ ব্যবস্থা নেয়নি। কেন? সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—মোটা অঙ্কের বাণিজ্যের সঙ্গে কারা জড়িত?

সর্বশেষ অবস্থা ও কড়া বার্তা: সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে এখনো। আলোচনা নামে কাগজ-কলমের অনুষ্ঠান চললেও শায়েস্তাগঞ্জ নতুন ব্রিজের ওপর বাসের ব্যারিকেড সরেনি। এক চুলও নড়েনি সিন্ডিকেট। অথচ অপর পাশে তীব্র রোদে, না খেয়ে-না পান করে শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ মানুষজন সড়কে পড়ে থেকে থেকে বারবার শুধু একটাই প্রশ্ন করছেন—‘আইন কাদের জন্য? নথি ধরে প্রমাণ থাকার পরও কেন নামছে না হাতুটি?’ সাধারণ যাত্রীরা এখন স্লোগান দিচ্ছেন, ‘অবৈধ সিন্ডিকেটের পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করো, মহাসড়ক মুক্ত করো।’ প্রশাসনের এখন চূড়ান্ত পরীক্ষা। নীরবতা কিংবা বিলম্ব আর চলবে না। তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা না নিলে এই দুর্ভোগ ভয়াবহ আকার নেবে—এটা সময়ের ব্যাপার মাত্র

মুক্তিবাণী

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও