নারী আইনজীবীকে লাঞ্ছিত ও যুবককে মারলেন সাংসদ রিমন

বরগুনায় স্থানীয় সাংসদের হাতে এক যুবক মারধরের শিকার হয়েছেন এবং একজন নারী আইনজীবীও লাঞ্ছিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এমনকি ওই সাংসদের সহযোগীরা একটি মন্দিরেও ভাঙচুর চালিয়েছে। রোববার বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী বাজারে এ ঘটনা ঘটে।

প্রিয়াংকা মিত্র নামের আইনজীবীর অভিযোগ, তাদের জমিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইজ গেট নির্মাণ নিয়ে বিরোধের জের ধরে স্থানীয় সাংসদ শওকত হাচানুর রহমান রিমন এসব ঘটনার অবতারণা করেছেন।

প্রিয়াংকা মিত্র জানান, তাদের রেকর্ডিয় সম্পত্তিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড স্লুইজ গেট নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়। চায়না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সিকো’ সম্প্রতি ওই জমিতে প্রকল্পের কাজ শুরু করে। বিরোধের নিষ্পত্তি নিয়ে পাউবো কর্তৃপক্ষের সাথে একাধিকবার বৈঠক হয় এবং বিরোধ নিষ্পত্তির পরই কাজ করার কথা হয়। শনিবার সকালে পাউবো’র সাথে এ নিয়ে ওই এলাকায় বৈঠক হয় এবং জমি পরিমাপের কাজ শুরু হয়। কিন্ত হঠাৎ করেই সেখানে সাংসদ রিমনের লোকজন এসে তাকে পাথরঘাটা এলাকায় ডেকে পাঠান। এক পর্যায়ে সাংসদের নির্দেশে ওই লোকজন তাদের জোর করে পাথরঘাটা নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে থানায় আশ্রয় নেন প্রিয়াংকা ও তার নিয়োজিত প্রতিনিধি তাইমুর ইসলাম। এসময় সাংসদ রিমন থানায় প্রবেশ করে তাদের অকথ্য গালাগাল করে তাইমুরকে পাথরঘাটা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এ ঘটনার পর বাড়িতে চলে আসেন প্রিয়াংকা। রাতে সাংসদের লোকজন তাদের বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করে। রোববার সকালে থানায় এ বিষয়ে অভিযোগ করতে গেলে থানা কর্তৃপক্ষ অভিযোগ নেয়নি।

প্রিয়াংকা মিত্র জানান, পরবর্তীতে রোববারও পাউবো কর্তৃপক্ষ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও ভূমি অফিসের লোকজন বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বসলে সেখানে সাংসদের লোকজন এসে তাকে ও তাইমুরকে গালাগালি করতে থাকে। জানায়- ‘এমপি ডেকেছে, যেতে হবে। নয়ত টেনে নিয়ে যেতে বলেছে।’

প্রিয়াংকা বলেন, ‘এক পর্যায়ে সাংসদ রিমন সেখানে লোকজন নিয়ে উপস্থিত হয়ে আমাকে অকথ্য গালিগালাজ শুরু করেন। এর প্রতিবাদ করলে আমার নিয়োজিত প্রতিনিধি তাইমুর ইসলামকে নিজেই চুল ধরে টেনে চর থাপ্পর ও লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দেন। এসময় তার সাথে থাকা লোকজন তাইমুরকে এলোপাতাড়ি মারধর করে। পরে পাথরঘাটা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাবির হোসেন তাইমুরকে উদ্ধার করে ঘটনাস্থল থেকে মোটরসাইকেলযোগে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দেন। পরবর্তীতে সাংসদের নির্দেশে তার লোকজন আমার বাসা বাড়িতে হামলা চালিয়ে মন্দিরে ভাঙচুর করে মূর্তি খালে ফেলে দেয়।’

প্রিয়াংকা বলেন, ‘একজন সাংসদের এমন আচরণে আমি বিস্মিত ও হতবাক। আমি শুনেছি, তার পিতা এই এলাকার রাজাকার কমান্ডার ছিলেন এবং তার বাবার নেতৃত্বে যুদ্ধের সময় এলাকার হিন্দুদের নির্যাতন করা হয়েছে। আজ তার ছেলে নিজেই প্রমাণ করলেন যে ইনি সেই রাজাকার বাবার যোগ্য উত্তরসূরি।’

এ ব্যাপারে সোমবার আইনী সহায়তা নেবেন বলে প্রিয়াংকা জানান।

আইনজীবী প্রিয়াংকা মিত্র আজ সোমবার ১১ টায় বরগুনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সম্মেলনে তিনি সাংসদ রিমনের এসব ঘটনা বর্ণনা করে এর যথার্থ বিচার দাবি করেছেন।

বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাইমুর জানান, তিনি চায়না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিকো’তে কাজ করতেন। সম্প্রতি ওই প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি অব্যাহতি নেন। চরদুয়ানী বাজারের বাসিন্দা প্রিয়াংকা মিত্রের জমি জমা দেখাশোনার জন্য প্রতিনিধি হিসেবে তিনি কাজ করতেন। তার ওপর সাংসদের অযাচিত হামলার বিচার দাবি করেছেন তিনি।

ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন পাথরঘাটা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাবির হোসেন। তিনি মুঠোফোনে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘সাংসদ রিমন নিজেই তাইমুরকে মারধর করে লাথি দিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়েছেন। আমি ওই ছেলেটিকে সেভ করে সেখান থেকে পাঠিয়ে দিয়েছি। সেখানে মন্দির লেখা একটি ঘর দেখেছি, সেটিতেও ছেলেরা ভাঙচুর চালিয়েছে।’

বরগুনা পাবলিক পলিসি ফোরামের সভাপতি হাসানুর রহমান ঝন্টু বলেন, ‘এর আগেও সাংসদ রিমন একাধিক ঘটনা ঘটিয়েছে। এবার তিনি যে কাজটি করেছেন নিন্দনীয়। একজন সাংসদ হিসেবে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়াটা চরম অশোভনীয়। বিশেষ করে নারীদের গালাগাল করাটা দুঃখজনক। তার বাবা খলিলুর রহমান এই এলাকার রাজাকার কমান্ডার ছিলেন। সাংসদ রিমন সেই বিষয়টিই বারবার তার আচরণের মধ্য দিয়ে মনে করিয়ে দিচ্ছেন। প্রিয়াংকার ব্যাপারে আমরা মানাবাধিকার সংগঠনগুলো সহযোগীতায় কাজ করবো।’

এ ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে সাংসদ শওকত হাচানুর রহামান রিমন মুঠোফোনে বলেন, ‘প্রিয়াংকাদের ওখানে কোনো জমি নেই, জমি পানি উন্নয়ন বোর্ডের। তারা বারবারই এ নিয়ে অযথা ঝামেলা সৃষ্টি করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করে আসছে। আমি বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বললেও তারা কারো কোনো কথাই না শুনে এক তরফা ঝামেলা বাঁধিয়ে আসছে। সেখানে কোনো মন্দির ছিল কিনা বা ভাঙচুরের মত ঘটনা ঘটেছে আপনারা খোঁজ নেন।’

তাইমুর ইসলামকে মারধরের বিষয়টি এড়িয়ে তিনি বলেন, ‘এই ছেলে কে? এর ওই জমিতে কাজে বাধা দেয়ার কোনো রাইটস আছে কিনা আপনারা সেটাও খোঁজ নেন।’

বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেন, ‘আমার বিষয়টি জেনেছি। আসলে কি ঘটেছে সেখানে আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি। সরেজমিন পরিদর্শন করে ঘটনা জেনে আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।’

উল্লেখ্য, এর আগে সালিশ বৈঠকে এক নারীর মাথায় বিষ্ঠা ঢেলে দেয়ার নির্দেশ দিয়ে রিমন ব্যাপক সমালোচিত হন। এরপর তিনি তাঁতী লীগের সভাপতি ইদ্রিসুর রহমান ও হাসাপাতালের এক কর্মচারীকেও নিজ হাতে মারধর করে আলোচনায় ছিলেন।

সর্বশেষ আপডেট: ১৩ জানুয়ারী ২০২০, ১৬:৩২
মুক্তিবাণী

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

ভিডিও