প্রভাবশালী এক মহল পরিবেশ আইন ও নির্দেশনা উপেক্ষা করে কুলাউড়া উপজেলার ঐতিহাসিক জয়পাশা সৈয়দ হেদায়ত উল্লাহ ওয়াকফ এস্টেটের শতবর্ষী দিঘিটি অবৈধভাবে ভরাটের চেষ্টা চালিয়েছে। তবে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দ্রুত ও দৃঢ় হস্তক্ষেপে এই ঐতিহ্যবাহী জলাশয়টি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। বর্তমানে দিঘিটি পুনরায় তার স্বাভাবিক রূপে ফিরে এসেছে।
![]()
যেভাবে রাতের আঁধারে শুরু হয় ভরাট: দিঘিটি রক্ষায় তৎপর স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সম্প্রতি এক রাতে হঠাৎ করে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে ট্রাকবহর নিয়ে মাটি ও বালু ফেলে দিঘি ভরাটের কাজ শুরু করা হয়। স্থানীয়রা ইউএনও মহিউদ্দিনকে বিষয়টি জানান। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ভরাটের কাজ বন্ধ করেন এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও ব্যাবহার: এই দিঘি কয়েক প্রজন্ম ধরে এলাকার হাজার হাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবন-জীবিকার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে আসছে। স্থানীয়রা জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে এই দিঘির পানি গোসল, ওজু, গৃহস্থালি কাজসহ নানা প্রয়োজনে ব্যবহার করে আসছেন। দিঘিটি ভরাট হয়ে গেলে শুধু তাদেরই নয়, এলাকার পরিবেশের ওপরও মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা ছিল।
প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থান: এ ঘটনায় দ্রুত ও সক্রিয় ভূমিকার জন্য ইউএনও মহিউদ্দিন প্রশংসিত হয়েছেন। তিনি ‘সুপ্রভাত বাংলাদেশ’ কে বলেন, “অভিযোগ পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ভরাটের সত্যতা পাই এবং সেটি বন্ধ করা হয়েছে। নগর ও গ্রামাঞ্চলে পুকুর-দিঘি ভরাট নিষিদ্ধ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দিঘিটি কেউ অবৈধভাবে দখল বা ভরাট করার চেষ্টা করলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তার এই দৃঢ় অবস্থানের ফলে দিঘিটি রক্ষা পায়।
ভরাটের পেছনের কারণ: জলাশয় দখল ও ভরাটের এমন ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। প্রায়শই দালাল ও প্রভাবশালী চক্র প্রকৃত মালিকানা জটিলতাকে পুঁজি করে বা ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে এই ধরনের সরকারি ও ওয়াকফ সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করে। তারপর সেখানে বাণিজ্যিক স্থাপনা বা আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলে। জয়পাশা দিঘির ক্ষেত্রেও একই রকম একটি চক্রান্তের ইঙ্গিত স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে পাওয়া গেছে।
উচ্চ পর্যায়ে অভিযোগ প্রস্তুতি: ইউএনও’র পদক্ষেপের পাশাপাশি এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশ সচেতন নাগরিক সমাজ। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতিও চলছে বলে জানা গেছে। তাদের আশা, এর ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুঃসাহসিক কাজ থেকে বিরত থাকবে প্রভাবশালীরা।
আইন ও নির্দেশনা: বাংলাদেশে প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণে সরকারের স্পষ্ট নীতি ও আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। ২০০০ সালের ২২ মে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জারি এক স্মারকে বলা হয়েছিল, ‘কোনো অবস্থাতেই খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের স্বাভাবিক গতি ও প্রকৃতি পরিবর্তন করা যাবে না।’ এছাড়াও উচ্চ আদালত নগরের জলাধার ভরাট নিষিদ্ধ করেছেন। এরপরও আইন অমান্য করে জলাশয় দখল ও ভরাটের ঘটনা চলছেই।
সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া: দিঘিটি ভরাটের অভিযোগে অভিযুক্ত প্রভাবশালী মহল এখনও পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে, স্থানীয় প্রশাসনের দৃঢ়তায় এবার তাদের চক্রান্ত সফল হয়নি। স্থানীয়রা ইউএনও মহিউদ্দিনের দ্রুত পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং দিঘিটিকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।










পাঠকের মন্তব্য