স্বায়ত্তশাসনের নামে প্রশাসনিক শাসন: স্থানীয় সরকারে স্বার্থান্বেষী চক্রের দখল, বঞ্চিত জনগণ

ছবি মুক্তিবাণী
ছবি মুক্তিবাণী
মনিরুজ্জামান মনিরঃ

বাংলাদেশের ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের মতো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এক সময়ে জনগণের হাতেই ছিল — এখন সেখানকার শূন্যতা পূরণ করছে এক জটিল আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা আর স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর দখলদারিত্ব। জনগণ কোথায়? ভোট কোথায়? সেবা কোথায়? এই প্রশ্নগুলো আজ আর শুধু কথার কথা নয়, জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে।

ছবি মুক্তিবাণী

১. নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই, সেবার সংকট চরমে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ: ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি কর্পোরেশন পর্যন্ত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন অনিয়মিত বা বছরের পর বছর বিলম্বিত। ফলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নিয়োগকৃত কর্মকর্তারাই এখন প্রধান কর্তা। এতে জনগণের ভোটাধিকার ক্রমশ অর্থহীন হয়ে পড়ছে।

বৈষম্য ও জটিলতা: বারবার বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের হাতে স্থানীয় সমস্যার স্থায়ী সমাধান মেলে না। সাধারণ মানুষকে অগণিত ফাইলে, নোটশীটে ঘুরতে হয়। একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওষুধ সরবরাহ থেকে শুরু করে একটি ভাঙা রাস্তা মেরামতের আবেদন — সবই পড়ে থাকে মাসের পর মাস।

দখলদার স্বার্থচক্র: নির্বাচিত নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে ঠিকাদার, ক্ষমতাসীন দলের কর্মী আর আমলাদের ঘনিষ্ঠ লবিস্টদের জন্য তৈরি হচ্ছে লুটের স্বর্গ। সরকারি প্রকল্প, চাকরি, সরবরাহ চুক্তি — সবকিছুতেই কোটি কোটি টাকার লেনদেনের অনিয়ম সাধারণ নিয়মে দাঁড়িয়েছে।

২. কেন এ অবস্থার সৃষ্টি? ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার: ব্রিটিশ শাসন স্থানীয় স্বশাসনকে অকার্যকর রেখে কেন্দ্রের শক্তি মজবুত করেছিল। স্বাধীনতার পরও সেই কাঠামোর মূল সুর বদলায়নি।

রাজনৈতিক অনীহা: ক্ষমতাসীনরা প্রায়ই স্থানীয় নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দিতে চায় না। দলীয় প্রভাব বজায় রাখতে নির্বাচন পিছিয়ে দেয়া, দলীয় প্রতীক বাধ্যতামূলক করা — এসবই অনিয়ম ও সহিংসতার পথ খুলে দিয়েছে।

সাংবিধানিক দুর্বলতা: সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ ধারা স্থানীয় সরকারের স্বশাসনের কথা বললেও প্রশাসনিক ক্ষমতা এখনো জেলা প্রশাসকের মতো কর্মকর্তাদের হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে জনগণের প্রতিনিধি কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারেন না।

৩. জনগণের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব সেবা ব্যবস্থার ভাঙন:

• স্বাস্থ্য: গ্রামে ৪০% ক্লিনিকে নিয়মিত ডাক্তার থাকেন না, ওষুধের ঘাটতি লেগেই আছে।

• শিক্ষা: অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসবাব ও ল্যাবের অভাবে শিক্ষা কার্যত অচল।

• অবকাঠামো: বর্ষায় উপজেলার ৭০% রাস্তা প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

• আস্থা হারানো মানুষ: স্থানীয় প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ দায়ের করেও মিলছে না প্রতিকার। অসহায় মানুষ দুর্নীতিকে নীরবে মেনে নিচ্ছে — গণতন্ত্রের মূলে এই নীরবতা ভয়ংকর।

• গণতন্ত্রের সংকট: নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকলে জনগণের অংশগ্রহণ ভিত্তিক শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণই হয়ে ওঠে একমাত্র সত্য।

৪. কীভাবে বদলাবে এ চিত্র? দ্রুত পদক্ষেপ: স্থানীয় নির্বাচন নিশ্চিত করতে জোরালো জনআন্দোলন গড়ে তোলা। ২০২৩ সালের “ভোট চাই” মিছিল দেখিয়েছে, এই দাবি আদায় সম্ভব।

• জনগণের তদারকি — সোশ্যাল অডিট, যেখানে মানুষ নিজেরাই দেখবে কোন প্রকল্পে কত টাকা খরচ হচ্ছে। মুন্সীগঞ্জে এভাবে অনিয়ম ৩০% কমেছে।

• ডিজিটাল অভিযোগ ও সেবা — ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সেবার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

• দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার: সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ ধারা বাস্তবায়ন করে ইউনিয়ন/পৌরসভাকে সত্যিকার অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়া।

• স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বাতিল করে নির্দলীয় পদ্ধতিতে ভোট আয়োজন।

• স্থানীয় তহবিলের তথ্য প্রকাশ ও দুর্নীতির মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি।

• রাজনৈতিক ঐকমত্যের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার আইন সংস্কার।

• জনগণের করণীয়: গ্রাম সভা, গণশুনানির মাধ্যমে সচেতনতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা।

• স্থানীয় পর্যায়ে সেবা মনিটরিং টিম গঠন করে মাসিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

• স্থানীয় অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করে গণমাধ্যম ও মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ দাখিল।

“স্থানীয় সরকার জনগণের সরকার, আমলাদের নয়। প্রশাসনিক শাসন নয়, স্বশাসনই স্থানীয় সরকারের প্রাণ।”— ড. বদিউল আলম মজুমদার, নির্বাচন সংস্কার কমিশন

সিনিয়র সাংবাদিক এস এম মেহেদী হাসান বলেন, “নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া স্থানীয় সরকার অর্থহীন। যে কোনো সরকারেরই উচিত নিরপেক্ষ ও সময়মত নির্বাচন নিশ্চিত করা, যাতে জনগণের মৌলিক সেবা ও অধিকার সুরক্ষিত থাকে।”

ড. আবু তাহের (অ্যাডভোকেট) বলেন, “স্থানীয় সরকার আইন সংশোধন ও নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। না হলে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণই থেকে যাবে, জনগণ ভোট আর সেবার অধিকার হারাবে।”

শেষ কথা: নির্বাচিত প্রতিনিধি, সরাসরি অংশগ্রহণ আর স্বশাসনের ত্রয়ী শক্তি ছাড়া স্থানীয় সরকার কখনোই জনগণের জন্য কাজ করবে না। স্বার্থান্বেষী চক্রের রাশ টানতে জনগণকেই সজাগ হতে হবে — একতাবদ্ধ আন্দোলন, সোচ্চার দাবি আর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠাই এই অচলাবস্থার একমাত্র জবাব।

মুক্তিবাণী

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও