“বাপ-দাদার আমল থাইকা এই চরে আছি। চরের জমি যখন জাগলো, ভাবছিলাম আমাগো কপাল খুলবো। কিন্তু জাল কাগজ বানাইয়া এলাকার প্রভাবশালীরা আমাগো উচ্ছেদ কইরা দিল। আদালতে মামলা করছি সাত বছর হইলো, শুধু তারিখের পর তারিখ পড়ে, বিচার পাই না।”
![]()
কথাগুলো বলতে বলতে চোখ ভিজে উঠছিল সিরাজগঞ্জের নদীভাঙনে সর্বস্বান্ত কৃষক সোলেমান মিয়ার (৫২)।
সোলেমান মিয়ার এই আর্তনাদ শুধু একজন মানুষের নয়; এটি বাংলাদেশের লাখো ভূমিহীন, প্রান্তিক ও অসহায় মানুষের দীর্ঘদিনের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। প্রতি বছর ১০ জুন বেসরকারিভাবে ‘ভূমি অধিকার দিবস’ পালিত হলেও দেশের কোটি মানুষের ভূমির অধিকার আজও আদালতের বারান্দা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং প্রভাবশালী দখলদারদের ক্ষমতার কাছে জিম্মি।
জমি মামলার জট: আদালতে আটকে অধিকার
বাংলাদেশে জমি নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের একটি জাতীয় সমস্যা। বিভিন্ন সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন আদালতে বর্তমানে প্রায় ২৪ লাখ জমি-সংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বিচারাধীন মোট মামলার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমি বিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত।
জমির মালিকানা, অবৈধ দখল, জাল দলিল, নামজারি ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিরোধের কারণে এসব মামলার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এর ফলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছেন, অন্যদিকে বিচার ব্যবস্থার ওপরও বাড়ছে চাপ।
জমি-সংক্রান্ত মামলার প্রধান ধরন
দেওয়ানি মামলা (Civil Suit): জমির মালিকানা, সীমানা নির্ধারণ, বাটোয়ারা বা জাল দলিল বাতিলের মতো বিষয়ে দায়ের করা হয়।
ফৌজদারি মামলা (Criminal Case): দখল নিয়ে সংঘর্ষ বা শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা দেখা দিলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারায় মামলা করা হয়।
বিবিধ বা মিস মামলা (Miscellaneous Case): নামজারি, খতিয়ান সংশোধন কিংবা রেকর্ড সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে ভূমি প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হয়।
পাহাড়ের ভূমি সংকট: ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন, যাদের বড় অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে।
পাহাড়ের ভূমি সমস্যা শুধু জমির মালিকানার প্রশ্ন নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের প্রশ্নও।
• ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন আইনের কারণে প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামোর দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়।
• কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হয় এবং বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়।
• ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে জনমিতিক পরিবর্তনের কারণে ভূমি নিয়ে নতুন জটিলতা সৃষ্টি হয়।
• ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির পর ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করা হলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি এখনও দৃশ্যমান নয়।
বেদখলে সরকারি জমি
দেশে একদিকে কোটি মানুষ ভূমিহীন, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ সরকারি জমি বছরের পর বছর অবৈধ দখলে রয়েছে।
বিভিন্ন সরকারি ও গণমাধ্যম সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী:
• প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার একরের বেশি বনভূমি অবৈধ দখলের শিকার।
• জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকা অন্তত ৮৭৪ একর জমি বেদখলে রয়েছে।
• খাসজমি, অর্পিত সম্পত্তি এবং বিভিন্ন তফসিলভুক্ত সরকারি জমির বড় অংশ প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে বনভূমি দখল করে সেখানে বাণিজ্যিক বাগান, রিসোর্ট, শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত খামার গড়ে তোলা হয়েছে। এতে পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব।
কত মানুষ ভূমিহীন?
ভূমি সংকটের বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হয় ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের পরিসংখ্যানে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষের নিজস্ব আবাদযোগ্য জমি নেই। এছাড়া প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষের নিজস্ব বাসস্থান বা স্থায়ী আবাসনের সুযোগ নেই। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর বড় অংশ গ্রামীণ দরিদ্র, চরবাসী, নদীভাঙনকবলিত পরিবার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য।
সরকারের উদ্যোগ ভূমি বিরোধ কমানো এবং ভূমিহীনদের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
গ্রাম আদালত ইউনিয়ন পর্যায়ে ছোটখাটো বিরোধ দ্রুত ও কম খরচে নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩
এই আইনের আওতায় বৈধ মালিকানা ছাড়াই জোরপূর্বক জমি দখলকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্প সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে পাঁচ লাখেরও বেশি পরিবারকে খাসজমিসহ ঘর প্রদান করা হয়েছে। এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ পুনর্বাসন কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত।
বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের মতামত খুলনা জজ কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ বাবুল হাওলাদার বলেন,
“জমি-সংক্রান্ত দেওয়ানি মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হলে জমি নিবন্ধনের সময় শতভাগ ডিজিটাল যাচাই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি (ADR) আরও কার্যকর করতে হবে।”
বাংলাদেশ সম্মিলিত সাংবাদিক পরিষদের সহ-সভাপতি মো. নেছার উদ্দিন বলেন,
“সরকার ভালো আইন করছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি, জালিয়াতি ও দালালচক্র পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। ফলে প্রকৃত ভূমিহীনরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।”
দি মৌলভীবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হাসান আহমেদ জাভেদের মতে,
“ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করা গেলে যেমন বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন বাড়বে, তেমনি প্রান্তিক মানুষের অধিকারও সুরক্ষিত হবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, দলিল রেজিস্ট্রেশনের সময় ডিড রাইটারদের মাধ্যমে সাবরেজিস্ট্রারদের অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
ভূমি অধিকার বাস্তবায়নে সরকারি জমি উদ্ধার এবং ভূমিদস্যুতা বন্ধের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন মৌলভীবাজার পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আনিছুজ্জামান বায়েছ। তিনি বলেন,
“বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দেশে বিপুল পরিমাণ সরকারি বনভূমি, খাসজমি এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মালিকানাধীন জমি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে রয়েছে। বিশেষ করে বনভূমি দখল করে অনেক জায়গায় বাণিজ্যিক বাগান, খামার ও অন্যান্য প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে। এর ফলে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রকৃত ভূমিহীন ও ক্ষুদ্র কৃষকরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আইন অনুযায়ী এসব সরকারি জমি উদ্ধার করে ভূমিহীন মানুষের মধ্যে বন্দোবস্ত দেওয়া গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, উৎপাদন বাড়বে এবং বহু পরিবার স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাবে।
বর্তমান সরকার ভূমি ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ এবং দলিল জালিয়াতি প্রতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা আশা করি, অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে সরকারি জমি উদ্ধার এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। দুর্নীতি ও ভূমিদস্যুতা রোধ করা গেলে দেশের উন্নয়ন আরও গতিশীল হবে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।”
করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি:
এক. অবৈধ দখলে থাকা সরকারি খাসজমি ও বনভূমি উদ্ধার।
দুই. প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের স্থায়ী পুনর্বাসন।
তিন. পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের কার্যক্রম আরও কার্যকর করা।
চার. ভূমি রেকর্ড ও নিবন্ধন ব্যবস্থার পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন।
পাঁচ. ইউনিয়ন পর্যায়ে ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
শেষ কথা
ভূমি শুধু একটি সম্পদ নয়; এটি মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা, পরিচয় ও বেঁচে থাকার অধিকার। ১০ জুনের ভূমি অধিকার দিবস তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়, বরং কোটি ভূমিহীন মানুষের ন্যায়বিচারের দাবিকে সামনে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
ভূমি অধিকার দিবসের মূল বার্তা একটাই, রাষ্ট্রের জমি রাষ্ট্রের মানুষের জন্য। অবৈধ দখলমুক্ত সরকারি জমি উদ্ধার, ভূমি প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং প্রকৃত ভূমিহীনদের পুনর্বাসনের মধ্য দিয়েই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক ভূমি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সেদিনই সোলেমান মিয়াদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটবে।










পাঠকের মন্তব্য