‘আরে মিয়া যান’ নির্বাহী প্রকৌশলীর দুর্নীতির অভিযোগ

ছবি সংগৃহীত
ছবি সংগৃহীত
বিশেষ প্রতিনিধি

প্রধানমন্ত্রীর সফর সামনে রেখে তড়িঘড়ি শুরু কাজ, বরাদ্দ জানতে চাইলে সাংবাদিকদের ‘বিরক্ত করছেন কেন?’ ধমক; ক্ষোভে ফুটছে জনমত

সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নামে নিয়ম থাকলেও মৌলভীবাজার সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিভাগটির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কায়সার হামিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও তথ্য গোপনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মৌলভীবাজার সফরকে সামনে রেখে মৌলভীবাজার-শ্রীমঙ্গল সড়কের পাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদার নিয়োগের কথা থাকলেও তা না করেই কাজ করানো হচ্ছে বলে অভিযোগ। এই কাজে কত বরাদ্দ এসেছে—সাংবাদিকরা সেই জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী হামিদ চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আরে মিয়া যান, আপনারা আমাকে বিরক্ত করছেন কেন?” তিনি বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট অংক এড়িয়ে দাবি করেন, কাজটির জন্য কোনো সরকারি বরাদ্দ নেই, বরং এটি ‘নিজস্ব উদ্যোগে’ করা হচ্ছে। অথচ প্রশ্ন ওঠে—কোন আইনের বলে সরকারি সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ব্যক্তিগত বা নিজস্ব উদ্যোগে সরকারি সড়কে শ্রমিক খাটিয়ে কাজ করান? স্থানীয়দের ধারণা, এই চতুর উত্তরের আড়ালে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম লুকিয়ে রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সড়ক ও জনপথ বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর সড়কের দুই পাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কারের জন্য নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ থাকে। কিন্তু মৌলভীবাজারের সাধারণ মানুষ বলছেন, বছরের পর বছর পার হলেও সড়ক বিভাগের কোনো কর্মী বা ঠিকাদারকে বিপজ্জনক ঝোপঝাড় পরিষ্কার করতে দেখা যায় না। সওজ কার্যালয় যদিও দাবি করে তারা ‘পরিচ্ছন্ন গ্রাম-পরিচ্ছন্ন শহর’ কর্মসূচির আওতায় সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করে, কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর ঝোপঝাড় পরিষ্কারের নামে যে অর্থ বরাদ্দ হয় তা ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে তড়িঘড়ি কাজ শুরু হলেও ব্যয়ভার লুকাতে সাংবাদিকদের সঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলীর এমন অপেশাদার আচরণে ক্ষুব্ধ গণমাধ্যমকর্মী ও সুশীল সমাজ। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তথ্য না দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ‘বিরক্ত করছেন কেন’ বলে ধমক দেওয়া স্পষ্টতই তথ্য অধিকার আইনের লঙ্ঘন। কায়সার হামিদের এই একগুঁয়েমি ও অসৌজন্য সওজ বিভাগের ভেতরের অনিয়ম ও দুর্নীতিকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

স্থানীয় জনগণ ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছে, মৌলভীবাজার সড়ক ও জনপথ বিভাগের বিগত কয়েক বছরের ঝোপঝাড় পরিষ্কারসহ সব উন্নয়নমূলক কাজের খরচের হিসাব জরুরি ভিত্তিতে খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের প্রতি কঠোর বার্তা—আর আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নয়; যেখানেই দুর্নীতি ও অনিয়ম, সেখানেই শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কায়সার হামিদের মতো কর্মকর্তারা যদি সরকারি প্রকল্পকে নিজেদের আয়ের উৎস বানিয়ে ফেলেন এবং সাংবাদিকদের তথ্য অধিকার অস্বীকার করে ‘ধমক’ দেওয়ার সাহস পান, তাহলে জনকল্যাণমুখী কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে। তথ্য অধিকার আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের এ অভিযোগ আর উপেক্ষিত নয়। জনমনে ক্রমশ তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে—সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছেন, বারবার অভিযোগের পরেও কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না? কেন ঝোপঝাড় পরিষ্কারের এত বরাদ্দ অঙ্ক কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে সড়কের ধারগুলো বছরের পর বছর জঙ্গলাকীর্ণ থাকে? অথচ প্রধানমন্ত্রীর মাত্র এক সফরকে ঘিরে অথৈ জল থেকে যেন যাদুর কাঠি নেড়ে কাজ বের করে আনা হয়! এসব কাটাছেঁড়ার পেছনের অর্থকাণ্ড ও কারচুপি উদঘাটন করতে দ্রুত দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দায়েরের উদ্যোগ নিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন গণমাধ্যম কর্মী। তাঁরা বলছেন, কায়সার হামিদের ‘নিজস্ব উদ্যোগ’ ও ‘বিরক্তি’র জবাব আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েই দিতে হবে। কারণ সরকারি চাকরির জবাবদিহি আর নাগরিকের জানার অধিকার কারও অহংকারের বলি নয়। মৌলভীবাজারের জনগণ এখন একমাত্র স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চায় যখন দেখবে এই নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট সব দুর্নীতির পাথেয়কে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আর কোনো ঠিকাদার কিংবা কর্মকর্তা ‘ভুয়া বিল-ভাউচার’ করে সরকারি টাকা হাতাতে সাহস পান না। ততদিন পর্যন্ত মৌলভীবাজার সড়ক বিভাগকে কেন্দ্র করে ‘উল্টো রথের’ এই কাহিনি শুধু স্থানীয় নয়, সারাদেশের জন্যই দুর্নীতির এক জ্বলন্ত দলিল হয়ে থাকবে। প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন এলাকাবাসী।

মুক্তিবাণী

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও