আবারও ভয়াবহ পরিণতির শিকার হলো মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ইচ্ছালছড়া পুঞ্জির খাসিয়া জনগোষ্ঠী। এক প্রভাবশালী চক্রের মদদে তাদের প্রাচীন পান পুঞ্জি লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে নির্মম সন্ত্রাস। গাছ কাটার মিথ্যা অভিযোগে দায়ের করা মামলার সুযোগ নিয়ে দুর্বৃত্তরা পুঞ্জির বিভিন্ন টিলায় শত শত পানগাছ কেটে দিয়েছে এবং সুপারি গাছের চারা উপড়ে ফেলেছে।
![]()
ইতিহাসের সাক্ষী খাসিয়াদের ভোগদখল: স্বাধীনতার আগে থেকেই এই পুঞ্জিতে বসবাস করে আসছে নিরীহ খাসিয়া জনগোষ্ঠী। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁদের ঐতিহ্যবাহী পান ও সুপারি চাষ করে আসছে তারা। খাসিয়াদের মাতৃতান্ত্রিক এই সমাজের মানুষগুলো পাহাড়-টিলায় বসবাস করে পান, সুপারি, কলা, আনারস, কমলা, তেজপাতা, গোলমরিচ ইত্যাদি উৎপাদনে অভ্যস্ত। তাদের গ্রামকে ‘পুঞ্জি’ বলা হয়।
![]()
ইচ্ছালছড়া পুঞ্জির বাসিন্দারা জানান, স্বাধীনতার আগে থেকেই তাঁরা এই পান পুঞ্জি ভোগ দখল করে আসছেন। কিন্তু বর্তমানে একটি প্রভাবশালী কুচক্রি মহল এই পানপুঞ্জি দখলে নেওয়ার জন্য নানা পায়তারা চালাচ্ছে।
![]()
‘মিথ্যা অভিযোগে’ সন্ত্রাস : পুঞ্জি নিবাসীদের অভিযোগ, দুর্বৃত্তরা প্রথমে মিথ্যা গাছ কাটার অভিযোগ দায়ের করে তাদেরকে হয়রানি করে। এরপর সুযোগ বুঝে রাতের অন্ধকারে হানা দেয় পুঞ্জিতে। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চাষ করা পানগাছ এবং সুপারি গাছের চারা কেটে ফেলে তারা। এই ঘটনায় পুঞ্জি নিবাসীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
![]()
পুঞ্জি সূত্রে জানা গেছে, তারা ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে অভিযোগ দায়ের করেছেন। তারা বর্তমান সরকারের কাছে এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন, যাতে তারা সন্তান-সন্ততি নিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে পারে।
![]()
ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া : স্থানীয় আদিবাসী নেতারা বলছেন, এই ঘটনা মৌলভীবাজার জেলার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পান চাষ তাদের প্রধান জীবিকা, যা ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে দীর্ঘদিনের ভূমি দখল পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের নেতারা বলছেন, ‘শুধু সংখ্যালঘু বলে তাদের ভূমি অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না। প্রশাসনকে দ্রুত হস্তক্ষেপ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
![]()
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) জানিয়েছে, ‘এভাবে বারবার আদিবাসীদের পানজুম ধ্বংস করলে এবং আইনি পদক্ষেপ না নিলে উদ্বেগ আরও বাড়বে।’
![]()
কুলাউড়া উপজেলার বন কর্মকর্তা রবিন্দ্র কুমার সিংহ জানান আমাদের কাছে অভিযোগ আছে ইউনও স্যারের নির্দেশে বিষয়টি তদন্তধিন আছে তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত আপনাদেরকে জানাতে পারব।
![]()
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা আক্তার বলেন আমাদের কাছে এইরকম একটা আভিযোগ আছে আমি বন বিভাগের কাছে পাঠিয়েছি তদন্ত করে আমাকে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য রিপোর্ট পেলে আপনাকে বিস্তারিত বলতে পারব।
![]()
প্রশাসনের কাছে জোরালো আবেদন: ইচ্ছালছড়া পুঞ্জির খাসিয়ারা শুধু গাছ হারায়নি, হারিয়েছে প্রজন্মের সঞ্চিত স্বপ্ন, হারিয়েছে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ঠিকানা। আজ তারা উদ্বাস্তু হওয়ার দ্বারপ্রান্তে—অথচ অপরাধীদের বিরুদ্ধে এখনও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। প্রশাসন যদি দ্রুততম সময়ে ঘটনার তদন্ত না করে, দোষীদের গ্রেপ্তার না করে এবং খাসিয়াদের ভূমি অধিকার আইনি ভিত্তিতে পুনরুদ্ধার না করে, তবে এই নির্যাতন থামবে না—বরং আরও নির্মম রূপ নেবে। আমরা দৃঢ়কণ্ঠে দাবি জানাই, বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি যেন ক্ষমতার দাপটে আদিবাসীদের শেষ আশ্রয়টুকুও কেড়ে না নেয়। প্রধানমন্ত্রী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আমাদের একটাই প্রত্যাশা—শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োগ করুন সর্বোচ্চ আইনি শক্তি; নইলে ইতিহাস ক্ষমা করবে না, আর এই নিরীহ খাসিয়াদের চোখের জলও নয়।
![]()
![]()
![]()











পাঠকের মন্তব্য