মৌলভীবাজার জেলায় সংবাদমাধ্যমকর্মীদের সাথে পুলিশ প্রশাসনের সম্পর্কে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে একটি ঘটনা। সম্প্রতি মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত একটি সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় সাংবাদিকদের সর্বাধিক প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন ‘মৌলভীবাজার জেলা সাংবাদিক ইউনিয়ন’কে আমন্ত্রণ না জানানোয় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে ইউনিয়নের জরুরি বৈঠকে জেলা পুলিশের সকল প্রকার সংবাদ কার্যক্রম ও অনুষ্ঠান বয়কটের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি আমন্ত্রণ বর্জনের প্রতিবাদ নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সংবাদ পরিবেশনে বৈষম্য ও বাছাই-বিচারের বিরুদ্ধে সাংবাদিক সম্প্রদায়ের জোরালো অবস্থান।
ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার মৌলভীবাজার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনকে ঘিরে। এই সম্মেলনে জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধ প্রতিরোধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু শ্রম অধিদপ্তর কর্তৃক নিবন্ধিত সিলেট বিভাগের একমাত্র এবং জেলার সর্ববৃহৎ সাংবাদিক সংগঠন ‘মৌলভীবাজার জেলা সাংবাদিক ইউনিয়ন (রেজি নং- মৌল-০৩৮)’কে এই সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। বরং কেবলমাত্র কিছু নির্দিষ্ট সাংবাদিক নেতা ও নির্বাচিত মিডিয়ার প্রতিনিধিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। এ ঘটনায় ইউনিয়ন পুলিশের “ইচ্ছাকৃত বর্জন ও পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ” এর অভিযোগ তোলে।
জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি জাফর ইকবাল জানান,“এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত ও ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী বহু সংবাদকর্মীকে রাষ্ট্রীয় বা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে রাখা হচ্ছে। শুধু সংবাদ সম্মেলন নয়, পুলিশ সুপারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আজ পর্যন্ত তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো পরিচিতি সভাও করেননি। এটি শুধু আমাদের প্রতি অবজ্ঞা নয়, গোটা সংবাদপেশার প্রতি অসম্মান।”
স্থানীয় সক্রিয় সাংবাদিকরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মর্মবেদনার সাথে জানান,“আমরা প্রতিদিন মাঠে কাজ করি, ঘটনাস্থল থেকে প্রতিবেদন তৈরি করি, জনদুর্ভোগের কথা তুলে ধরি। কিন্তু যখনই প্রশাসনের কোনো আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম হয়, তখন শুধুমাত্র একটি বিশেষ গোষ্ঠীই সেখানে প্রবেশাধিকার পায়। এটি সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত সমতা ও মুক্ত তথ্যপ্রবাহের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।”
একপেশে আমন্ত্রণ প্রসঙ্গে বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক কোনো অনুষ্ঠানই নির্দিষ্ট সংগঠন বা ব্যক্তিবিশেষের জন্য উৎসর্গীকৃত হওয়া উচিত নয়। জনগণের তথ্য পাবার অধিকার এবং সকল গণমাধ্যমকর্মীর সমান সুযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যদি আগে থেকে তালিকা তৈরি করে কাউকে বাদ দেওয়া হয়, তবে তা গণতান্ত্রিক চর্চা ও স্বচ্ছতার পরিপন্থী। একজন প্রবীণ সাংবাদিকের ভাষায়, “সাংবাদিক নেতারা সম্মানিত, কিন্তু শুধু নেতৃত্বই কি প্রকৃত সাংবাদিকতা? যারা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মাঠে থাকেন, তারাও তো এই পেশার অপরিহার্য অংশ।”
পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপারেশন) নবেল চাকমা মন্তব্য করেন, “সাংবাদিকরা সাধারণত প্রেসক্লাবে বসেন। আমরা মূলত প্রেসক্লাবকেই চিনি। এর বাইরে অন্য কোনো সাংবাদিক সংগঠনের বিষয়ে আমাদের ধারণা নেই।” অন্যদিকে, জেলা পুলিশ সুপার মোঃ বিল্লাল হোসেন বলেন, “আমি সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আমরা দুটি প্রেসক্লাবকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। মৌলভীবাজার জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের বিষয়ে আমি আগে থেকে অবগত ছিলাম না।”
সুশীল সমাজ ও গণতন্ত্রকামী মহল মনে করেন, এই ধরনের বিভেদ ও বাছাইয়ের সংস্কৃতি চলমান থাকলে প্রকৃত তথ্যপ্রবাহ বিঘ্নিত হবে, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং প্রশাসনের ওপর জনগণের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। তাদের সুপারিশ, জেলা প্রশাসন ও পুলিশের উচিত নিবন্ধিত সকল সাংবাদিকের একটি আপডেটেড ও অন্তর্ভুক্তিমূলক তালিকা তৈরি করা এবং যেকোনো অনুষ্ঠানের তথ্য আগেভাগে স্বচ্ছ ও উন্মুক্তভাবে সবাইকে জানানো।
এই বয়কট শুধু একটি স্থানীয় ঘটনা নয়, এটি একটি জাতীয় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে আমাদের—রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কি সত্যিই জনগণের কাছে পৌঁছাচ্ছে, নাকি কিছু গোষ্ঠী বা ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে? মৌলভীবাজার জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের এই সিদ্ধান্ত সকল পর্যায়ের সংবাদকর্মীর অধিকার, মর্যাদা ও সমান সুযোগের দাবিতে একটি জোরালো বার্তা। এটি এখন প্রশাসনের সদিচ্ছা ও দূরদর্শিতার ওপর নির্ভর করছে—তারা কি এই ফাটল মেরামত করতে এগিয়ে আসবেন, নাকি নীরবতা ও বিভেদের দেয়াল আরও উঁচু করবেন? দেশের গণমাধ্যম অঙ্গন ও গণতান্ত্রিক চর্চার স্বার্থে এই সংকটের শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত সমাধান জরুরি। সকলের জন্য সমান তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করাই হোক সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থার অগ্রাধিকার।










পাঠকের মন্তব্য