বিচার যেন নিঃশেষে দলানোর হাতিয়ার হয়ে ওঠে। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মতো একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের গল্পটি সে কারণে শুধু ইতিহাসের পাতার ঘটনা নয়—একটি শাসনের হিংস্রতার নগ্ন দলিল। ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর দিবাগত রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি কার্যকর করা হয় তাকে।
মৃত্যুদণ্ড হলে সেটা ঘোষিত হওয়ার পর কারাগারে সময় দেওয়ার নিয়ম। তবে সালাহউদ্দিনের কেস ভিন্ন। ফাঁসির ৪ ঘণ্টা আগেও তিনি জানতেন না যে আজই তাঁর শেষ দিন। পরিবারের সদস্যরা যখন শেষবারের মতো দেখা করতে আসেন, তখন তাদের কাছ থেকেই জানতে পারেন—আজ ফাঁসি। তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল স্বাভাবিক মানসিকতার এক মানুষের কষ্টের নিঃশ্বাস। জেলারকে বলেছিলেন, “অন্তত আমাকে তো বলতে পারতি রে, একটা প্রিপারেশন নেওয়ার ব্যাপার আছে না?”
এরপর যা ঘটে তা আরও বিচিত্র। ফাঁসি কার্যকরের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি পরিবারকে জানান, ১৯৭৮ সালে রাঙ্গুনিয়ার মানুষের কাছে ওয়াদা করেছিলেন—সেখানেই তাঁর কবর হবে। শেষ ইচ্ছা পূরণে চৌধুরী পরিবার ফাঁসির আগেই রাঙ্গুনিয়ায় কবর খনন শুরু করে দেয়। এক অদ্ভুত পরিস্থিতি—মানুষ তখনো বেঁচে, অথচ নিজের কবর খোঁড়া হচ্ছে।
কিন্তু ফাঁসি কার্যকরের পর জেলার সরাসরি বলে দেন—লাশ রাঙ্গুনিয়া যাবে না, যেতে হবে রাউজানে। চৌধুরী পরিবারের সব চেষ্টা বিফল। শেষে তাঁর কাজিন সালমান এফ রহমানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন জানানো হয়, যেন লাশ রাঙ্গুনিয়ায় দাফনের অনুমতি দেন। কিন্তু শেখ হাসিনার জবাব ছিল স্পষ্ট এবং একরোখা—“রাঙ্গুনিয়া না, রাউজানেই করতে হবে”। শেষমেশ রাউজানে দ্বিতীয় কবর খোড়া হয়। সেখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত হন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী।
শুধু তিনিই কেন—নির্বাচিত বিরোধী নেতাদের ফাঁসি বা নিষ্পেষণের ইতিহাসে এমন নজির বিরল। একটি মামলার রায় আদালতে লেখা না হয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে বসে লেখা হয় এবং রায়ের দুই দিন আগেই তার কপি চলে যায় আসামির পরিবারের কাছে। পক্ষে সাক্ষী দেওয়ার জন্য ১০০ জনের তালিকা জমা দিলেও অধিকাংশ বিশিষ্ট ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়নি।
একটি শাসনের কী সর্বনাশা হিংস্রতা! ইতিহাসের নমরুদ আর ফেরাউনেরা ক্ষমতার উন্মত্ততায় এতদূর এগিয়েছিল কি? না। তাঁদের বিদ্বেষ ছিল পাথরের—নীল নদের চেয়েও গভীর, হলেও সীমারেখা জানত। কিন্তু এ যেন অন্য এক মাত্রার দাহ। পাঁচশত নমরুদ আর এক হাজার ফেরাউন যদি একত্র হয়, তবুও তারা অতিক্রম করতে পারবে না শেখ হাসিনার সেই সীমাহীন ঘৃণ্য নির্দয়তাকে, যে নির্দয়তা একটি মানুষকে ফাঁসির চার ঘণ্টা আগেও জানতে দেয়নি কোন অদৃশ্য হাত লিখে দিচ্ছে তার শেষ নিঃশ্বাসের গন্তব্য। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জন্য খোঁড়া দুইটি কবর শুধু মাটির গর্ত নয়—এটি স্বৈরাচারের এক জ্বলন্ত সাক্ষী, যার পাশে ফেরাউনের মমি আজও লজ্জায় মাথা নিচু করে। ব্যক্তিগত রাগ আর বিচারবিভীষিকার এই মিশেল পৃথিবী খুব কমই দেখেছে—আর যেদিন সেদিন সব হিসেব মিটবেই।










পাঠকের মন্তব্য