নিষ্পাপ শিশুদের আর্তনাদ: যুদ্ধ থেকে সমাজের ভেতরের আগ্রাসন

এস এম মেহেদী হাসান

পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি হলো শিশুর হাসিমাখা মুখ। অথচ আজ সেই শৈশবই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে। কোথাও যুদ্ধের বোমা ও গুলিতে ঝরে যাচ্ছে শিশুদের প্রাণ, আবার কোথাও ধর্ষণ, নির্যাতন, অপহরণ ও হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধের শিকার হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা। ঘরে, বাইরে, স্কুলে কিংবা কর্মস্থলে অনেক শিশুর জন্য নিরাপত্তা আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই বাস্তবতায় প্রতি বছর ৪ জুন পালিত হয় আন্তর্জাতিক আগ্রাসনের শিকার নিষ্পাপ শিশু দিবস (International Day of Innocent Children Victims of Aggression) যুদ্ধ, সহিংসতা, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার শিশুদের স্মরণ এবং তাদের সুরক্ষার বিষয়ে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা গড়ে তুলতেই দিবসটি পালন করা হয়।

দিবসের ইতিহাস: ১৯৮২ সালে লেবানন যুদ্ধের সময় অসংখ্য ফিলিস্তিনি ও লেবানিজ শিশু হতাহত হয়। এই ঘটনার পর জাতিসংঘ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং একই বছরের ১৯ আগস্ট গৃহীত এক প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রতি বছর ৪ জুনকে আন্তর্জাতিক আগ্রাসনের শিকার নিষ্পাপ শিশু দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধ, সংঘাত, দখলদারিত্ব, নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার শিশুদের অধিকার রক্ষা এবং বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী শিশুরা: বর্তমান বিশ্বে গাজা, ইউক্রেন, সুদান, সিরিয়া ও অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে প্রতিদিন শিশুরা ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, হাজার হাজার শিশু নিহত, আহত কিংবা বাস্তুচ্যুত হচ্ছে।

শুধু যুদ্ধ নয়, অনেক শিশু জোরপূর্বক সশস্ত্র গোষ্ঠীতে নিয়োগ, মানবপাচার, যৌন সহিংসতা এবং মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এসব ঘটনা শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।

বাংলাদেশের বাস্তবতা: ঘরের ভেতরেও অনিরাপদ শৈশব শিশু নির্যাতন ও সহিংসতা শুধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সমস্যা নয়। বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড, সাভারে শিশু গৃহকর্মীর ওপর অমানবিক নির্যাতন এবং ফেনীতে অপহরণের পর এক শিশুকে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

এসব ঘটনা প্রমাণ করে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইন নয়, প্রয়োজন সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ: শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, একটি দেশের সভ্যতার অন্যতম মাপকাঠি হলো সেই দেশের শিশুরা কতটা নিরাপদ।

তাদের ভাষায়, “যখন একটি শিশু নিজের ঘর, স্কুল কিংবা খেলার মাঠে নিরাপদ থাকে না, তখন বুঝতে হবে সমাজে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, পরিবার এবং সমাজের যৌথ দায়িত্ব।”

শিশু সুরক্ষায় করণীয় প্রথমত: দ্রুত ও কঠোর বিচার শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় দ্রুত তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত: পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা শিশুদের ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। স্কুলে কাউন্সেলিং ও শিশু সুরক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত: সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা শিশুশ্রম, নির্যাতন, বাল্যবিয়ে কিংবা সহিংসতার ঘটনা দেখেও নীরব থাকা যাবে না। সমাজের প্রতিটি মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।

চতুর্থত: নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ে অনলাইন হয়রানি, সাইবার বুলিং এবং ডিজিটাল শোষণ থেকেও শিশুদের সুরক্ষা দিতে হবে।

উপসংহার: আন্তর্জাতিক আগ্রাসনের শিকার নিষ্পাপ শিশু দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিশুদের কান্নার কোনো সীমান্ত নেই। গাজার ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া শিশু, কিংবা বাংলাদেশের কোনো গ্রামের নির্যাতিত শিশু, সবার বেদনা একই।

শিশুরা যুদ্ধ চায় না, সহিংসতা চায় না, তারা চায় নিরাপদ শৈশব, ভালোবাসা এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ। তাই আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক, পৃথিবীর প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ, সহিংসতামুক্ত ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা

মুক্তিবাণী

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও