দ্য ওয়্যারের বিশ্লেষণ ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বিসর্জন দিয়েও যে কারণে শেষ রক্ষা হবে না মোদির

মুক্তিবাণী অনলাইন ডেক্স

দ্য ওয়্যারের বিশ্লেষণ ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বিসর্জন দিয়েও যে কারণে শেষ রক্ষা হবে না মোদির

এই শাসনের নৈতিক কর্তৃত্ব এখন পুরোপুরি বিলুপ্ত। দেশের রাজপথ এবং সাধারণ মানুষ স্বৈরাচারী শাসকদের অত্যাচার আর চিরকাল নীরবে সহ্য করতে প্রস্তুত নয়। সর্বোপরি, ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনকে যারা ইতিমধ্যেই একপাক্ষিক বা নির্ধারিত খেলা বলে ধরে নিয়েছিলেন, তাদের সেই ধারণা আর টিকছে না।

সাম্প্রতিক আন্দোলনের চূড়ান্ত মুহূর্তে যারা যন্তর মন্তরে গিয়েছিলেন, তারা সকলেই সেখানে একটি স্পষ্ট মেজাজ প্রত্যক্ষ করেছেন—প্রধানমন্ত্রীর প্রতি চরম বিরূপতা এবং কোনো রকমের ভয়ডরহীন প্রতিবাদী চেতনা। নতুন করে প্রতিরোধ এবং ক্ষোভের এই তীর্থস্থানে এক ঘণ্টা সময় কাটালেই একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন মাথায় আসত: নরেন্দ্র মোদী কেন এখনো ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ছেঁটে ফেলছেন না? একজন গুরুত্বহীন রাজনৈতিক নেতা কি এতটা অপরিহার্য হয়ে উঠলেন যে, তাকে বাঁচাতে গিয়ে একটা সরকার নিজের অস্তিত্বকেই ঝুঁকিতে ফেলবে? নিজের রাজপাট বাঁচাতে দাবার বোড়েকে বলির পাঁঠা বানানোর যে পুরনো রাজনৈতিক কৌশল, তা কেন ব্যবহার করা হচ্ছিল না?

দ্য ওয়্যারের বিশ্লেষণ ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বিসর্জন দিয়েও যে কারণে শেষ রক্ষা হবে না মোদির

অবশেষে শনিবার বিকেলে যখন ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পাততাড়ি গোটানোর নির্দেশ দেওয়া হলো, ততক্ষণে আসলে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভারতের তরুণ সমাজের অপ্রতিরোধ্য শক্তির সামনে তথাকথিত ‘অপরাজেয়’ সম্রাট নতি স্বীকার করতে বাধ্য হলেন। আর এর মধ্য দিয়েই মোদীর ‘অজেয়’ থাকার মিথ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। চূড়ান্ত দায় নিশ্চিতভাবেই ‘শাহেনশাহ’-র ঘাড়ে বর্তায়, তবে অমিত শাহ এবং আরএসএস-এর শীর্ষ নেতৃত্বসহ অন্যান্য দরবারিরা কীভাবে এই বিশাল ও মারাত্মক পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হলেন, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই গুঞ্জন শুরু হয়েছে। এই ব্যর্থতার অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশ শাসক দল কীভাবে মেটাবে তা তাদের ব্যক্তিগত বিষয়, কিন্তু দেশের সার্বিক রাজনীতি ও সাধারণ মানুষের জন্য এই আন্দোলনের প্রাপ্তি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং স্থায়ী।

এই পুরো ঘটনাটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নিজের তৈরি করা রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতাকে আবারও আলোর নিচে নিয়ে এসেছে। তিনি এমন একজন নেতা যিনি বিদেশের চাটুকারিতা ও মিথ্যা প্রশংসায় মশগুল থাকতে ভালোবাসেন—হয়তো দেশের ভেতরের ক্ষোভ, উদ্বেগ ও সাধারণ মানুষের তীব্র অসন্তোষ থেকে সাময়িক পালিয়ে বাঁচার উপায় হিসেবেই তিনি এটিকে দেখেন। কিন্তু যন্তর মন্তরের তথাকথিত “কাকরোচ” বা তরুণ আন্দোলনকারীরা নিশ্চিত করে দিয়েছে যে, মোদীকে আর এই খেলার একক ভাগ্যবিধাতা হিসেবে মেনে নেওয়া হবে না।

দ্য ওয়্যারের বিশ্লেষণ ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বিসর্জন দিয়েও যে কারণে শেষ রক্ষা হবে না মোদির

প্রথমত, মোদীর অজেয় ভাবমূর্তির মূল স্তম্ভটি দাঁড়িয়ে ছিল ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদের’ একমাত্র ও পরম পুরোহিত হিসেবে নিজেকে দাবি করার ওপর। তিনি ও কেবল তিনিই ‘জাতীয় স্বার্থের’ মূর্ত প্রতীক—এটাই ছিল বার্তা। তাই তার সকল প্রতিদ্বন্দ্বী, সমালোচক বা বিরোধীদের সহজেই ‘দেশবিরোধী’ বা ‘ভারতবিরোধী’ তকমা দিয়ে কোনঠাসা করে দেওয়া যেত। কিন্তু যন্তর মন্তরের এই তরুণরা মোদীর সেই কৌশল ভালোভাবেই জানত; তারা এই ‘দেশবিরোধী’ তকমা দেওয়াকে রীতিমতো উপহাস ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে। মোদীর সনাতন রাজনৈতিক বিরোধীদের মতো এই তরুণরা কোনো রক্ষণাত্মক অবস্থানে যায়নি।

যেহেতু তাদের দাবিগুলো শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সরাসরি জড়িত ছিল, তাই শাসকের অনুগত প্রচারকরা—যারা সাধারণত যেকোনো আন্দোলনকে কোনো রাজনৈতিক দল বা নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর ট্যাগ লাগিয়ে দিতে পারদর্শী—তারা এই আন্দোলনকারীদের কোনো ছকে ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে। আন্দোলনকারীদের আমেরিকান বা চীনা এজেন্ট হিসেবে চিত্রায়িত করার সরকারপন্থী নিউজ অ্যাঙ্কারদের সমস্ত চেষ্টা ভস্তে গেছে। শুধু প্রধানমন্ত্রীই নন, পুরো সংঘ পরিবার এবং তাদের চালিত অপপ্রচার শিল্প খুব শীঘ্রই টের পাবে যে, দেশের রাজনৈতিক ন্যারেটিভ বা বয়ান নিজেদের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি তাদের হাত থেকে অনেকটাই ফসকে গেছে।

দ্য ওয়্যারের বিশ্লেষণ ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বিসর্জন দিয়েও যে কারণে শেষ রক্ষা হবে না মোদির

দ্বিতীয়ত, বিগত একশ বছরের ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি সহজ শিক্ষা হলো—”করিশমা” বা জনসম্মোহন ক্ষমতা ততক্ষণই স্থায়ী হয়, যতক্ষণ সেই “করিশমাটিক নেতা” সাফল্য ও অগ্রগতি এনে দিতে সক্ষম হন। এই তরুণদের আন্দোলন দেশের মানুষের ভাবনায় জায়গা করে নিতে পেরেছে ঠিক এই কারণে যে, মোদী সরকার দেশের একটি ত্রুটিপূর্ণ ‘সিস্টেম’ বা ব্যবস্থাকে সংশোধন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। টানা এক দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পর, কোনো নেতা এটা দাবি করতে পারেন না যে পরীক্ষার মতো অত্যন্ত মৌলিক একটি খাতের সার্বিক ধসের জন্য তাকে দায়ী করা যাবে না।

ধর্মেন্দ্র প্রধানের এই পুরো ঘটনা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রীর গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা এখন তলানিতে। দোষীদের “শাস্তি” দেওয়ার বিষয়ে তার সাম্প্রতিক হুঙ্কারকে মানুষ কয়েক বছর আগের একই ধরনের কিন্তু অপূর্ণ থেকে যাওয়া প্রতিশ্রুতির সাথেই মিলিয়ে দেখছে। শেষ পর্যন্ত মানুষ এই রাজনৈতিক কৌশল বা হাতসাফাই ধরে ফেলেছে। শেষ মুহূর্তে একটি ইনস্টাগ্রাম রিলের মাধ্যমে নিজের আন্তরিকতা ও নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণের চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

বিজেপির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে গেলে, যন্তর মন্তরের এই প্রতিবাদের সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়বে ‘মোদী সমর্থক শ্রেণির’ ওপর, যাদের নিজেদের নেতার ওপর আস্থা এখন মারাত্মকভাবে ধাক্কা খেয়েছে। যেকোনো সভ্য ও সুশৃঙ্খল সমাজের সচেতন নাগরিকরা বিশ্বাস করতে চান যে তারা কোনো বন্য রাজত্বে নয়, বরং একটি সুসংগঠিত দেশে বসবাস করছেন। সাধারণ নাগরিকরা কখনোই এমন একজন শাসকের পাশে দাঁড়াতে চান না যিনি দেশের মাটিতে আরেকটি “নির্ভয়া” কাণ্ড ঘটা প্রতিরোধ করতে পারেন না।

দেশের সাধারণ মানুষ এতদিন সরকারের শাসনকে মেনে নিয়েছিল কারণ তাদের অতি-উৎসাহী সমর্থকরা বিশ্বাস করত যে “মোদী সাহেব” কেবল ‘বাজে লোকদের’ পেছনে লাগেন। কিন্তু গত ২০ জুলাই যখন রাজধানী দিল্লির বুকে নজিরবিহীন বর্বরতা প্রত্যক্ষ করল পুরো দেশ, তখন সেই স্বস্তির অনুভূতি চুরমার হয়ে গেল। অবশ্যই ভারতীয় রাষ্ট্রের এই নির্মম বলপ্রয়োগ এটাই প্রথম নয়; তবে এবার তা কাশ্মীরের “সন্ত্রাসবাদী”, ছত্তিশগড়ের “নকশাল” বা উত্তর-পূর্বের “বিদ্রোহীদের” বিরুদ্ধে ছিল না। এই হামলা হয়েছে একেবারে ‘নয়া ভারতের’ হৃৎপিণ্ডে। এই বর্বরতা কোনো চতুর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চক্রান্তের ফসল, নাকি গত ১২ বছরে তৈরি হওয়া এক চরম দমনপীড়ন নীতির প্রকাশ—তা নিয়ে তর্ক হতে পারে; কিন্তু তরুণ ছেলে-মেয়েদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর এই তণ্ডবলীলার চিত্র সহজে মানুষের মন থেকে মুছবে না। এটি মোদীর অনুগত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিবেককে বারবার নাড়া দিতে থাকবে।

কম উদ্বেগজনক ছিল না বিরোধীদলীয় নেতার রক্তাত্ত ছবিগুলোও—যাকে বিজেপি বছরের পর বছর ধরে অপমান ও হেয় করার চেষ্টা করেছে—পুলিশ কীভাবে তাকে টেনে-হিঁচড়ে হেনস্থা করল, তা দেশবাসী দেখেছে। এই আচরণ একেবারেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। রক্তাক্ত রাহুল গান্ধীর ছবি আমাদের যৌথ ন্যায়বোধের ওপর প্রতিনিয়ত আঘাত হানতে থাকবে।

যেহেতু এই তরুণদের আন্দোলনকে পেছন থেকে কে নেতৃত্ব দিচ্ছে বা চালনা করছে তা স্পষ্টভাবে জানা নেই, তাই যন্তর মন্তরের এই জমাট বাঁধা ক্ষোভ ও উদ্দীপনা পরবর্তীতে কোন দিকে মোড় নেবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বিজেপি হয়তো আশা করছে যে এই তীব্র শক্তি সময়ের সাথে সাথে মিলিয়ে যাবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, একটি নিখুঁত ও একক নিয়ন্ত্রণে থাকা শাসনের যে ‘মিথ’ বা কাল্পনিক গল্প তৈরি করা হয়েছিল, তা আর বজায় রাখা সম্ভব নয়। রাজত্বের নৈতিক কর্তৃত্ব ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। দেশের জনগণ আর এই ধরনের তথাকথিত একনায়কদের অত্যাচার সহ্য করতে রাজি নয়। আর সবকিছুর ওপরে, ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচন আর আগের মতো মোদীর জন্য সহজ বা নির্ধারিত কোনো বিষয় হয়ে থাকছে না।

মুক্তিবাণী

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও