শৈশবের উঠোন থেকে ধূসর স্মৃতির কোঠায় বিলুপ্তির পথে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোকজ খেলাধুলা

লেখক: এস এম মেহেদী হাসান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মুক্ত লেখক ও সাংবাদিক

বিকেলের শেষ আলোটা ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে হারিয়ে যাচ্ছে। দূরের বাঁশঝাড়ে পাখিরা ফিরছে আপন নীড়ে। গ্রামের মেঠোপথ ধরে স্কুলব্যাগ ছুড়ে রেখে একদল শিশু ছুটে যাচ্ছে খোলা মাঠের দিকে। কোথাও শুরু হয়েছে গোল্লাছুট, কোথাও দাঁড়িয়াবান্দা, কোথাও আবার ডাঙ্গুলির একের পর এক আঘাতে উড়ে যাচ্ছে কাঠের ছোট টুকরো। কেউ কানামাছি খেলছে চোখ বেঁধে, কেউ বৌচি খেলায় প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দিয়ে ছুটছে নিরাপদ ঘরের দিকে। মাঠজুড়ে শুধু হাসি, দৌড়, চিৎকার আর নির্মল আনন্দ।

এই দৃশ্য একসময় ছিল গ্রামবাংলার প্রতিদিনের বাস্তবতা। আজ তা যেন কেবল স্মৃতির অ্যালবামে আটকে থাকা এক টুকরো শৈশব।

বর্তমান প্রজন্মের অনেক শিশুই হয়তো ডাঙ্গুলি, গোল্লাছুট কিংবা দাঁড়িয়াবান্দার নাম শুনেছে, কিন্তু খেলেনি কখনো। তাদের শৈশব এখন স্মার্টফোনের পর্দা, ভিডিও গেম, ইউটিউব কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যে উঠোন একসময় শিশুদের হাসিতে মুখর থাকত, সেখানে এখন নীরবতা। যে মাঠে প্রতিদিন বিকেলে ধুলো উড়ত, সেখানে উঠেছে বহুতল ভবন কিংবা আবাসন প্রকল্প।

লোকজ খেলাধুলার এই হারিয়ে যাওয়া শুধু একটি বিনোদনের মাধ্যম হারানো নয়; এটি একটি সমাজ, একটি সংস্কৃতি এবং একটি প্রজন্মের জীবনযাপনের আমূল পরিবর্তনের গল্প।

লোকজ খেলা: শুধু বিনোদন নয়, ছিল জীবনচর্চা

বাংলার লোকজ খেলাগুলোর ইতিহাস শত বছরেরও বেশি পুরোনো। কৃষিনির্ভর সমাজে শিশু-কিশোরদের অবসর, শরীরচর্চা ও সামাজিক শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম ছিল এসব খেলা। কোনো ব্যয়বহুল সরঞ্জাম লাগত না। বাঁশের লাঠি, কাঠের টুকরো, কয়েকটি ইট, কিছু দাগ কেটে দেওয়া মাটি কিংবা খোলা একটি মাঠই ছিল আনন্দের বিশাল জগৎ।

ডাঙ্গুলি শিশুদের হাত-চোখের সমন্বয়, মনোযোগ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়াত। দাঁড়িয়াবান্দা শেখাত দলগত পরিকল্পনা ও কৌশল। গোল্লাছুট তৈরি করত গতি, সহনশীলতা ও নেতৃত্বের গুণ। কানামাছি কিংবা বৌচি গড়ে তুলত পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, উপস্থিত বুদ্ধি এবং সামাজিক মেলবন্ধন।

আজকের ভাষায় যাকে “লাইফ স্কিল” বলা হয়, তার অনেকটাই শিশুেরা শিখে নিত মাঠের খেলায়, কোনো শ্রেণিকক্ষ ছাড়াই।

বাংলা একাডেমির লোকসংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণায়ও উল্লেখ করা হয়েছে, লোকজ খেলাধুলা ছিল গ্রামীণ সামাজিকীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। খেলার মধ্য দিয়েই শিশুরা বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা, ছোটদের প্রতি সহমর্মিতা, নিয়ম মেনে চলা, পরাজয় মেনে নেওয়া এবং দলগত দায়িত্ববোধের শিক্ষা লাভ করত।

কোথায় হারিয়ে গেল সেই খেলাগুলো?

বিশ্বায়ন, প্রযুক্তির প্রসার এবং নগরায়নের সঙ্গে সমাজ বদলানো স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য হয়তো দিয়েছে শিশুদের শৈশব।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও বিভিন্ন নগর উন্নয়ন গবেষণার তথ্য বলছে, গত কয়েক দশকে দ্রুত নগরায়নের ফলে খোলা মাঠের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রাজধানী ঢাকা তো বটেই, জেলা ও উপজেলা শহরেও শিশুদের খেলার জন্য নিরাপদ উন্মুক্ত স্থান ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

একসময় প্রতিটি গ্রামে ছিল খেলার মাঠ, খালি জমি কিংবা বড় উঠোন। এখন সেই জায়গায় গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, মার্কেট, ইটভাটা কিংবা আবাসন প্রকল্প। ফলে শিশুরা চাইলে খেলবেও কোথায়?

অন্যদিকে প্রযুক্তির বিস্তার শিশুদের অবসর কাটানোর ধরনও বদলে দিয়েছে। স্মার্টফোন, অনলাইন গেম, ইউটিউব, টিকটক কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের সময়ের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) পাঁচ থেকে সতেরো বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের প্রতিদিন অন্তত ৬০ মিনিট মাঝারি বা উচ্চমাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার পরামর্শ দেয়। কিন্তু বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের অধিকাংশ শিশুই এই মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

শিশুদের খেলাধুলা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং মানসিক চাপ।

হারিয়ে যাওয়া মাঠ, বদলে যাওয়া শৈশব এবং সামাজিক মূল্য

লোকজ খেলাধুলার বিলুপ্তি কোনো একদিনে ঘটেনি। এটি দীর্ঘ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ফল। গত তিন দশকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ন, প্রযুক্তির বিস্তার এবং শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন শিশুদের শৈশবের ধরনই পাল্টে দিয়েছে। যে উঠোন একসময় বিকেলের খেলায় মুখর থাকত, সেখানে এখন বহুতল ভবন। যে মাঠে গোল্লাছুট বা দাঁড়িয়াবান্দা হতো, সেখানে এখন আবাসন প্রকল্প, মার্কেট কিংবা ইট-পাথরের স্থাপনা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে নগরায়নের হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা ও সিলেটের মতো শহরগুলোতে শিশুদের জন্য উন্মুক্ত খেলার মাঠ ক্রমেই কমে এসেছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, অধিকাংশ নতুন আবাসন প্রকল্পে শিশুদের খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণের সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি।

মাঠের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন। স্মার্টফোন, ভিডিও গেম, ইউটিউব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন বিনোদন শিশুদের অবসর সময়ের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। ইউনিসেফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের শারীরিক সক্রিয়তা কমিয়ে দেয়, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় এবং সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাস্তব জীবনের দলগত খেলাধুলার পরিবর্তে ভার্চুয়াল গেম অনেক শিশুর কাছে এখন প্রধান বিনোদন।

শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তনও এই বাস্তবতাকে আরও জটিল করেছে। আগে বিদ্যালয় শেষে বিকেল ছিল খেলাধুলার সময়। এখন সেই জায়গা নিয়েছে কোচিং, প্রাইভেট টিউশন, অতিরিক্ত ক্লাস এবং পরীক্ষাভিত্তিক প্রস্তুতি। অনেক অভিভাবক সন্তানের খেলাধুলাকে সময়ের অপচয় মনে করেন। অথচ শিশু মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, খেলাধুলা শিশুর মানসিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের অপরিহার্য অংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) পাঁচ থেকে সতেরো বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের প্রতিদিন অন্তত ৬০ মিনিট মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার শারীরিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার পরামর্শ দেয়। বাস্তবে বাংলাদেশের অনেক শিশুই এই ন্যূনতম শারীরিক সক্রিয়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

লোকজ খেলাগুলোর একটি বড় শক্তি ছিল এগুলোর অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র। ব্যয়বহুল সরঞ্জাম লাগত না, বিশেষ কোনো প্রশিক্ষকেরও দরকার হতো না। একটি খোলা মাঠ, কয়েকজন বন্ধু আর কিছু সহজ উপকরণই ছিল যথেষ্ট। ফলে সমাজের ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই অংশ নিতে পারত। খেলাধুলা সামাজিক বৈষম্য কমাত, পারস্পরিক বন্ধুত্ব গড়ে তুলত এবং দলগত চেতনা তৈরি করত।

গোল্লাছুট শিশুদের শেখাত দলগত কৌশল, দাঁড়িয়াবান্দা তৈরি করত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, ডাঙ্গুলি বাড়াত মনোযোগ ও হাত-চোখের সমন্বয়, আর কানামাছি শেখাত বিশ্বাস, পর্যবেক্ষণ ও উপস্থিত বুদ্ধি। অর্থাৎ প্রতিটি খেলাই ছিল একেকটি অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

আজ সেই জায়গায় এসেছে একাকিত্ব। একক পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে, প্রতিবেশীকেন্দ্রিক সামাজিক সম্পর্ক কমেছে, ফলে সমবয়সী শিশুদের স্বাভাবিক মেলামেশার সুযোগও সীমিত হয়েছে। শিশুদের সামাজিক দক্ষতা, নেতৃত্ব, সহমর্মিতা, জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা এবং দ্বন্দ্ব সমাধানের সক্ষমতা অনেকাংশে দলগত খেলাধুলার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠত। এসব অভিজ্ঞতা ভার্চুয়াল জগৎ কখনোই পুরোপুরি দিতে পারে না।

চিকিৎসক ও শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত মাঠে খেলাধুলা না করার কারণে শিশুদের মধ্যে স্থূলতা, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, মানসিক চাপ এবং উদ্বেগের প্রবণতা বাড়ছে। একই সঙ্গে স্ক্রিননির্ভর জীবন তাদের মনোযোগের স্থায়িত্বও কমিয়ে দিচ্ছে। অনেক শিশুই বাস্তব সামাজিক পরিবেশের চেয়ে ভার্চুয়াল পরিবেশে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে।

অন্যদিকে লোকজ খেলার সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই খেলাগুলো ছিল লোকসংস্কৃতি, ভাষা, ছড়া, গান এবং সামাজিক উৎসবের অংশ। অনেক খেলার সঙ্গে নির্দিষ্ট ছড়া, ডাক কিংবা আঞ্চলিক শব্দ জড়িয়ে ছিল। ফলে খেলার বিলুপ্তি মানে শুধু একটি বিনোদনের মাধ্যম হারানো নয়; বরং একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ভাষাগত বৈচিত্র্য এবং প্রজন্মান্তরের স্মৃতিও হারিয়ে যাওয়া।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে তাদের ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোকে সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও নেপালে স্থানীয় খেলাগুলোকে স্কুল ক্রীড়া, জাতীয় উৎসব এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া গেলে লোকজ খেলাগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে আবার পরিচিত হয়ে উঠতে পারে।

লোকজ খেলাধুলা শুধু অতীতের নস্টালজিয়া নয়; এটি সুস্থ সমাজ, সুস্থ শিশু এবং সুস্থ ভবিষ্যৎ গঠনেরও একটি কার্যকর মাধ্যম। তাই এগুলোকে স্মৃতির অ্যালবামে বন্দী না রেখে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে ফিরিয়ে আনার চিন্তা এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের লোকজ খেলাধুলা হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু কয়েকটি খেলার বিলুপ্তি নয়; এটি একটি জীবনধারা, একটি সামাজিক সংস্কৃতি এবং একটি প্রজন্মের শৈশব হারিয়ে যাওয়ার গল্প। একসময় বিকেলের মাঠ ছিল শিশুদের প্রথম বিদ্যালয়। সেখানে বইয়ের বাইরে শেখা হতো নেতৃত্ব, সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা, ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস ও সহমর্মিতা। একটি গোল্লাছুটের দলে যেমন সবাইকে নিয়ে এগোতে হতো, তেমনি দাঁড়িয়াবান্দা শেখাত কৌশল, ডাঙ্গুলি শেখাত মনোযোগ, আর কানামাছি শেখাত বিশ্বাস ও পারস্পরিক নির্ভরতা।

আজকের শিশুরা প্রযুক্তির যুগে বেড়ে উঠছে, যা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ডিজিটাল দক্ষতা ভবিষ্যতের জন্য জরুরি। কিন্তু প্রযুক্তি কখনোই মাঠের বিকল্প হতে পারে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) পাঁচ থেকে সতেরো বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের প্রতিদিন অন্তত ৬০ মিনিট মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার শারীরিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার পরামর্শ দেয়। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অধিকাংশ শিশু সেই সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে স্থূলতা, মানসিক চাপ, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং স্ক্রিন-আসক্তি দ্রুত বাড়ছে।

লোকজ খেলার পুনর্জাগরণ তাই কেবল নস্টালজিয়ার বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সংস্কৃতিরও প্রশ্ন।

এ ক্ষেত্রে প্রথম দায়িত্ব পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। অভিভাবকদের বুঝতে হবে, খেলাধুলা পড়াশোনার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একটি শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশের অপরিহার্য অংশ। বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ফুটবল, ক্রিকেট বা দৌড়ের পাশাপাশি গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্দা, বৌচি কিংবা ডাঙ্গুলির মতো ঐতিহ্যবাহী খেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এতে নতুন প্রজন্ম নিজেদের সাংস্কৃতিক শেকড়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।

স্থানীয় সরকার, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় যৌথভাবে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে লোকজ ক্রীড়া উৎসবের আয়োজন করতে পারে। পহেলা বৈশাখ, নবান্ন কিংবা জাতীয় উৎসবগুলোতে এসব খেলার প্রতিযোগিতা যুক্ত করা গেলে শিশুদের আগ্রহ বাড়বে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম নিয়মিত লোকজ খেলাকে নিয়ে অনুষ্ঠান, তথ্যচিত্র ও প্রতিযোগিতা সম্প্রচার করতে পারে।

নগর পরিকল্পনাতেও বড় পরিবর্তন জরুরি। বহুতল ভবনের শহরে শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার মাঠ নিশ্চিত না করলে কোনো উদ্যোগই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। প্রতিটি আবাসিক এলাকায় উন্মুক্ত মাঠ সংরক্ষণ এবং নতুন নগরায়ণে খেলার জায়গা বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি এখন নীতিগত সিদ্ধান্ত হওয়া দরকার।

পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও লোকসংস্কৃতি বিশেষজ্ঞদের উদ্যোগে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোর ইতিহাস, নিয়ম, আঞ্চলিক বৈচিত্র্য ও সামাজিক গুরুত্ব নিয়ে গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ, কোনো ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে হলে আগে তাকে নথিবদ্ধ করতে হয়।

প্রশ্ন হলো, আগামী প্রজন্ম কি জানবে ডাঙ্গুলি কী? তারা কি কোনো দিন বিকেলের মাঠে গোল্লাছুটের উচ্ছ্বাস অনুভব করবে? নাকি এসব নাম শুধু বইয়ের পাতায় পড়ে পরীক্ষার উত্তর লিখবে?

উত্তরটি আমাদেরই নির্ধারণ করতে হবে।

একটি জাতি শুধু প্রযুক্তিতে নয়, তার সংস্কৃতি, স্মৃতি ও সামাজিক বন্ধনের ওপরও দাঁড়িয়ে থাকে। লোকজ খেলাধুলা সেই ভিত্তিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়া জরুরি, কিন্তু নিজের শিকড় ভুলে নয়।

যে শিশুরা আজ খোলা মাঠে দৌড়াতে পারে না, তারা আগামী দিনের সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী ও সামাজিক নাগরিক হয়ে উঠতে পারবে কি না, সেই প্রশ্নও আমাদের সামনে রয়েছে।

তাই এখনই সময়, হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে ফিরিয়ে আনার। মাঠ ফিরুক, খেলার হাসি ফিরুক, ফিরে আসুক সেই বিকেলের ডাক। কারণ, একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু শ্রেণিকক্ষে নয়, গড়ে ওঠে মাঠেও। আর সেই মাঠেই বেঁচে থাকে বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্যের প্রাণ।

মুক্তিবাণী

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও