দৌড়ের ওপর ওষুধ নেই কিছুটা ইচ্ছাশক্তি আর সুস্থ জীবনের বিজ্ঞানের গল্প

দৌড়ের ওপর ওষুধ নেই কিছুটা ইচ্ছাশক্তি আর সুস্থ জীবনের বিজ্ঞানের গল্প
দৌড়ের ওপর ওষুধ নেই কিছুটা ইচ্ছাশক্তি আর সুস্থ জীবনের বিজ্ঞানের গল্প
এস এম মেহেদী হাসান

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। রাজধানীর রমনা পার্কে কিংবা চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে, সিলেটের লাক্কাতুরা চা-বাগানের পথ ধরে অথবা রাজশাহীর পদ্মা পাড়ে তখন একদল মানুষ দৌড়াচ্ছেন। কারও বয়স বিশ, কারও ষাট। কেউ ওজন কমাতে চান, কেউ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে, কেউ আবার শুধু মন ভালো রাখার জন্য। তাঁদের সবার লক্ষ্য একটাই, সুস্থ থাকা।

দৌড়ের ওপর ওষুধ নেই কিছুটা ইচ্ছাশক্তি আর সুস্থ জীবনের বিজ্ঞানের গল্প

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আজ বিস্ময়কর অগ্রগতি অর্জন করেছে। ক্যানসারের নতুন চিকিৎসা এসেছে, হৃদরোগের জটিল অস্ত্রোপচার এখন অনেকটাই নিরাপদ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রোগ নির্ণয়েও ভূমিকা রাখছে। তবু চিকিৎসকেরা এখনো একটি সহজ পরামর্শ দিতে ভোলেন না, প্রতিদিন কিছুটা হাঁটুন কিংবা দৌড়ান।

কারণ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোর একটি আজও অপরিবর্তিত, প্রতিরোধ চিকিৎসার চেয়ে কার্যকর।

এই সত্যের প্রতিফলন যেন বহু পুরোনো বাংলা প্রবাদেও আছে, “দৌড়ের ওপর ওষুধ নেই।” যদিও প্রবাদটির প্রচলিত অর্থ বিপদ থেকে দ্রুত সরে যাওয়া, কিন্তু স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের আলোকে বাক্যটি নতুন এক অর্থ খুঁজে পায়। সত্যিই কি দৌড় এমন এক ওষুধ, যার বিকল্প নেই?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বিশ্বজুড়ে অকালমৃত্যুর অন্যতম প্রধান ঝুঁকি। প্রতিবছর প্রায় ৫০ লাখ মানুষের মৃত্যু এমন জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম নেই। সংস্থাটি প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক ব্যায়াম অথবা ৭৫ থেকে ১৫০ মিনিট জোরালো ব্যায়াম করার পরামর্শ দেয়। দৌড় সেই সুপারিশ পূরণের সবচেয়ে সহজ উপায়গুলোর একটি।

দৌড় শুরু হলে শরীরে কী ঘটে

মানুষের শরীর চলার জন্যই তৈরি। দৌড় শুরু করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই হৃদ্‌যন্ত্র দ্রুত রক্ত পাম্প করতে শুরু করে। ফুসফুস বেশি অক্সিজেন গ্রহণ করে, পেশিতে রক্তপ্রবাহ বাড়ে এবং বিপাকক্রিয়া সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এর পাশাপাশি মস্তিষ্ক থেকে নিঃসৃত হয় এন্ডোরফিন, ডোপামিন ও সেরোটোনিন, যেগুলোকে বিজ্ঞানীরা ‘ফিল-গুড’ নিউরোকেমিক্যাল বলে থাকেন। এগুলো মানসিক চাপ কমাতে, ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা বাড়াতে এবং ইতিবাচক অনুভূতি তৈরিতে ভূমিকা রাখে। অনেক দৌড়বিদ যে আনন্দ বা প্রশান্তির অনুভূতির কথা বলেন, সেটিই পরিচিত ‘রানার্স হাই’ নামে।

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষকেরা দেখিয়েছেন, নিয়মিত দৌড়ানো মানুষের আয়ু গড়ে কয়েক বছর পর্যন্ত বাড়াতে পারে। অন্যদিকে British Journal of Sports Medicine-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিট ধীরগতির দৌড়ও হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সহায়তা করতে পারে।

হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য কেন উপকারী

বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হৃদ্‌রোগ। বাংলাদেশেও উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের বিস্তারের সঙ্গে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

নিয়মিত দৌড়ালে হৃদ্‌পেশি শক্তিশালী হয়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে এবং রক্তে ‘ভালো’ কোলেস্টেরল (HDL) বাড়াতে ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে ক্ষতিকর চর্বি জমার প্রবণতাও কমে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, যাঁদের আগে থেকেই হৃদ্‌রোগ আছে বা দীর্ঘদিন ব্যায়ামের অভ্যাস নেই, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ধীরে ধীরে দৌড় শুরু করা উচিত।

ডায়াবেটিস, ওজন ও বিপাকক্রিয়া

বাংলাদেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের এক কোটিরও বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত।

দৌড়ানোর সময় পেশিগুলো শক্তির জন্য বেশি গ্লুকোজ ব্যবহার করে। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা হয় এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতাও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নিয়মিত ক্যালরি খরচ হওয়ায় অতিরিক্ত ওজন কমানোর ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখে।

মানসিক স্বাস্থ্যেরও সঙ্গী

মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্নতা এখন শুধু শহুরে সমস্যা নয়, গ্রামেও এর প্রভাব বাড়ছে। কর্মব্যস্ততা, ডিজিটাল আসক্তি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অনেককে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলছে।

এই জায়গায় দৌড় একটি কার্যকর সহায়ক হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম উদ্বেগের মাত্রা কমাতে এবং মনের স্থিতি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। যদিও এটি গুরুতর মানসিক রোগের চিকিৎসার বিকল্প নয়, তবে চিকিৎসার সহায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের বাস্তবতা

বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে খেলার মাঠ কমছে, হাঁটার পথ সংকুচিত হচ্ছে। শিশুরা মোবাইল ও স্ক্রিনে বেশি সময় কাটাচ্ছে, বড়দের জীবনও ডেস্ক ও যানজটের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।

এই বাস্তবতায় দৌড় শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যচর্চা নয়, এটি নগর পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সচেতনতারও একটি বিষয়। নিরাপদ পার্ক, উন্মুক্ত মাঠ, হাঁটার পথ ও সাইকেল লেন বাড়ানো জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের অংশ হওয়া উচিত।

কীভাবে শুরু করবেন

দৌড় শুরু করতে ম্যারাথন দৌড়বিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রথম সপ্তাহে ২০ মিনিট হাঁটা, তারপর অল্প সময়ের জন্য ধীরগতির জগিং, এরপর ধীরে ধীরে সময় ও গতি বাড়ানোই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।

আরামদায়ক জুতো, হালকা পোশাক, পর্যাপ্ত পানি পান এবং শরীরের সংকেতের প্রতি মনোযোগ দেওয়া জরুরি। হঠাৎ বুকে ব্যথা, মাথা ঘোরা বা তীব্র শ্বাসকষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে থেমে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

শেষ কথা

চিকিৎসাবিজ্ঞান আমাদের অসুখ সারাতে পারে, কিন্তু সুস্থ থাকার দায়িত্ব আমাদেরই। সেই দায়িত্ব পালনের জন্য সব সময় ব্যয়বহুল জিম, দামি যন্ত্রপাতি কিংবা জটিল পরিকল্পনার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শুধু প্রতিদিনের একটি ছোট সিদ্ধান্ত।

এক জোড়া আরামদায়ক জুতো, খোলা আকাশের নিচে কয়েক কিলোমিটার পথ আর কিছুটা ইচ্ছাশক্তি অনেক সময় এমন কাজ করতে পারে, যা ওষুধ একা পারে না।

তাই বহু পুরোনো প্রবাদটি আজও নতুন করে সত্য হয়ে ধরা দেয়। শুধু রূপক অর্থে নয়, স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের আলোতেও বলা যায়, দৌড়ের ওপর সত্যিই ওষুধ নেই।

মুক্তিবাণী

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও