ব্যাংকে ঋণ থাকলে কুরবানি ওয়াজিব হবে কি? ইসলামী বিধান কী বলে?

ফাইল ছবি
ফাইল ছবি
মুক্তিবাণী ডেক্স :

আপনি যদি ঋণগ্রস্ত হন, তাহলে কুরবানি ওয়াজিব হবে কি না, তা যাচাই করার জন্য নিচের নিয়মটি মেনে চলতে হবে:

১.  প্রথমে মোট সম্পদ থেকে সব ঋণ বাদ দিন (যেমন ব্যাংকের লোন, ব্যক্তিগত ঋণ, ক্রেডিট কার্ডের বিল)।

২.  তারপর দেখুন, কুরবানির দিনগুলিতে (১০, ১১ ও ১২ জিলহজ মাসে ) ঋণ বাদ দেওয়ার পরও আপনার কাছে ‘নেসাব’ পরিমাণ সম্পদ থাকে কি না।

*   যদি থাকে, তাহলে ঋণ থাকা সত্ত্বেও আপনার ওপর কুরবানি দেওয়া ওয়াজিব।

*   যদি না থাকে, তাহলে আপনার ওপর কুরবানি ওয়াজিব নয়। এক্ষেত্রে ঋণ করে কুরবানি দেওয়ার প্রয়োজনও নেই।

নেসাব কী এবং এর পরিমাণ কত?

নেসাব হলো সেই নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ, যার মালিক হলেই কিছু আর্থিক ইবাদত (যেমন যাকাত, কুরবানি) ওয়াজিব হয়।

· ৭.৫ ভরি স্বর্ণ (প্রায় ৮৭.৪৮ গ্রাম) অথবা,

· ৫২.৫ ভরি রুপা (প্রায় ৬১২.৩৬ গ্রাম) অথবা, এই পরিমাণ রুপার সমমূল্যের নগদ টাকা বা অন্যান্য সম্পদ।

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

ঋণগ্রস্ত অবস্থায় কুরবানি করা জায়েয হলেও, এখানে দুটি বিষয় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিবেচনা করতে হবে:

· ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য না থাকলে: যদি ঋণ পরিশোধের পর নেসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকে, তাহলে আপনার ওপর কুরবানি ওয়াজিব নয়। ঋণ করে কুরবানি করাটাও উৎসাহিত করা হয় না।

· সুদি ঋণ (ইন্টারেস্ট) দ্বারা কুরবানি করা হারাম: ইসলামে সুদভিত্তিক লেনদেন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাই সুদি ঋণ নিয়ে বা সুদি টাকা দিয়ে কুরবানি করা কিছুতেই জায়েজ হবে না।

কাদের ওপর কুরবানি ওয়াজিব? (সঠিক শর্তাবলি)

আপনি সঠিকভাবে বুঝতে পারেন কিনা, সেই জন্য কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্তগুলো জেনে নিন (হানাফি মাজহাব অনুসারে):

1. মুসলিম হওয়া।

2. স্বাধীন ও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া (বালেগ হওয়া)।

3. সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া।

4. মুসাফির (শরঈ সফরে অবস্থানকারী) না হওয়া।

5. কুরবানির দিনগুলোতে (১০, ১১ ও ১২ জিলহজ মাসে) নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া।

সহিহ হাদিসের রেফারেন্স

নিচে কুরবানির গুরুত্ব ও ওয়াজিব হওয়া সংক্রান্ত দুটি বিশুদ্ধ হাদিস আরবি ও বাংলা অর্থসহ দেওয়া হলো।

হাদিস ১: কুরবানি পরিত্যাগের কঠোর হুঁশিয়ারি

مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ وَلَمْ يُضَحِّ فَلاَ يَقْرَبَنَّ مُصَلاَّنَا

· উচ্চারণ: ‘মান কানা লাহু সা’আতুন ওয়া লাম ইউদাহহি, ফালা ইয়াকরাবান্না মুসাল্লানা।’

· বাংলা অর্থ: “যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদের মাঠের কাছেও না আসে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩১২৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদিসটির মান: হাসান)

হাদিস ২: কুরবানি একটি পরিবারের জন্য দায়িত্ব

يَا أَيُّهَا النَّاسُ: إِنَّ عَلَى كُلِّ أَهْلِ بَيْتٍ فِي كُلِّ عَامٍ أُضْحِيَّةً

· উচ্চারণ: ‘ইয়া আইয়ুহান নাসু, ইন্না আলা কুল্লি আহলি বায়তিন ফি কুল্লি আমিন উযহিয়্যাতান।’

· বাংলা অর্থ: “হে লোক সকল! প্রত্যেক পরিবারের ওপর প্রত্যেক বছর কুরবানি করা অপরিহার্য (ওয়াজিব)” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৭৮৮; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩১২৫; হাদিসটির মান: হাসান)

১. ফুকাহায়ে কেরামের মতে

ইসলামী শরীয়তে কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য মৌলিক প্রয়োজনীয় সম্পদ (নেসাব) থাকা শর্ত। আর এই নেসাব নির্ধারণের সময় আসল প্রয়োজন ছাড়া অন্য ঋণ বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ব্যাংকের লোন কি সেই ঋণের অন্তর্ভুক্ত?

হানাফি মাজহাবের বিস্তারিত মত:

· কেবল সেই ঋণ নেসাব থেকে বাদ দেওয়া হবে, যা তাৎক্ষণিক পরিশোধ করতে হয় (যেমন ক্রেডিট কার্ডের বিল, স্বল্পমেয়াদী ব্যক্তিগত ঋণ)।

· দীর্ঘমেয়াদী ঋণ (যেমন হাউজ লোন, গাড়ির লোন, যা কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য) সম্পর্কে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, যে পরিমাণ কিস্তি তাৎক্ষণিক বকেয়া, শুধু তা বাদ দেওয়া হবে। বাকি ভবিষ্যতের কিস্তি নেসাব গণনায় রাখতে হবে। তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, পূর্ণ ঋণই বাদ যাবে (যদি আদায়ে সক্ষমতা থাকে)।

সুতরাং, আপনার উপর কোন মত প্রযোজ্য, তা আপনার ঋণের ধরণ ও মাজহাব অনুসরণের ওপর নির্ভর করে। অধিকাংশ সাধারণ মুসল্লির জন্য সহজ নিয়ম হলো: যে ঋণ আদায়ে আপনার সামর্থ্য আছে এবং তাৎক্ষণিক বা অদূর ভবিষ্যতে পরিশোধ করতে বাধ্য, সেটি বাদ দিয়ে নেসাব দেখুন।

২. ঋণের প্রকারভেদ ও কুরবানি

সুদি ব্যাংক লোন (যেকোনো ধরনের) সুদি লোন গ্রহণ করা নিজেই হারাম, তাই এই লোনের অস্তিত্ব আপনার দায়িত্ব। তবে যদি ইতিমধ্যে নিয়ে ফেলেন, তাহলে আপনার মূল সম্পদ থেকে সম্পূর্ণ লোনের মূল পরিমাণ বাদ দেবেন। সুদের টাকা নেসাবের অংশ নয়, বরং তা ফেলে দিতে হবে। যদি লোন বাদ দিয়ে নেসাব থাকে, তবে কুরবানি ওয়াজিব। কিন্তু সেই কুরবানি সুদি টাকা দিয়ে করবেন না; হালাল উপার্জন থেকে কুরবানি দিন।

সুদমুক্ত ইসলামিক ব্যাংকের লোন (বা আত্মীয়-স্বজনের ঋণ) সম্পূর্ণ বকেয়া বাদ দিয়ে নেসাব হিসাব করুন। ঋণ বাদ দিয়ে নেসাব থাকলে ওয়াজিব।

যে ঋণ পরিশোধের কোনো সময়সীমা নেই (ঋণদাতা ছাড় দিয়েছেন) সেটি নেসাব গণনা থেকে বাদ যাবে না, কারণ তাৎক্ষণিক পরিশোধের চাপ নেই। নেসাব থাকলে ওয়াজিব।

৩. অন্যান্য মাজহাবের দৃষ্টিভঙ্গি (সতর্কতামূলক জ্ঞান)

· মালিকি মাজহাব: কুরবানি ওয়াজিব নয়; এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। তাই ঋণ থাকলে কুরবানি ছাড়তে কোনো বাধা নেই।

· শাফিঈ ও হাম্বলি মাজহাব: কুরবানি সুন্নাত (ওয়াজিব নয়)। তবে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য কুরবানি করার চেয়ে ঋণ পরিশোধ উত্তম।

সুতরাং, যারা হানাফি মাজহাব মানেন (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের অধিবাসী), তাদের জন্য কুরবানি ওয়াজিব—কিন্তু ঋণ থাকলে তার প্রভাব উপরের নিয়ম অনুযায়ী।

৪. সুদের টাকায় কুরবানি দেওয়া সম্পর্কে কঠোর সতর্কবার্তা

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন:

“সুদি টাকায় কুরবানি করা কবুল হবে না, কারণ এটি হারাম সম্পদ। বরং তা দিয়ে মৃতজন্তু কোরবানি করার মতো।”

একটি সহিহ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন:

إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا

“নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)

সুতরাং, আপনার ব্যাংকের লোন যদি সুদি হয়, তবে সেই সুদের টাকা দিয়ে বা সুদি উৎস থেকে পাওয়া টাকা দিয়ে কুরবানি করবেন না। বরং হালাল উপার্জন থেকে কুরবানি দিন। আর যদি আপনার হালাল সম্পদ নেসাবের কম হয়, তাহলে কুরবানি ওয়াজিব নয়।

উপসংহার,যদি ব্যাংকের সুদি লোন বা অন্য কোনো ঋণ বাদ দেওয়ার পর আপনার কাছে নেসাব পরিমাণ হালাল সম্পদ থাকে, তাহলে কুরবানি দেওয়া আপনার ওপর ওয়াজিব। কিন্তু সেই কুরবানি অবশ্যই হালাল উপার্জন থেকে করতে হবে। আর যদি ঋণ বাদ দিলে আপনার কাছে নেসাবের কম সম্পদ থাকে, তাহলে আপনার ওপর কুরবানি ওয়াজিব নয়। সেক্ষেত্রে ঋণ করে কুরবানি দেওয়া জায়েজ নয়, বরং ঋণ পরিশোধের চেষ্টাই উত্তম।

আপনার জন্য ব্যবহারিক নির্দেশনা

1. এখনই হিসাব করুন: আপনার মোট নগদ, সঞ্চয়, স্বর্ণ-রুপা, ব্যবসায়িক মালামালের মূল্য একত্র করুন।

2. ঋণ বাদ দিন: ব্যাংকের বকেয়া মূল ঋণ (সুদ বাদে) এবং অন্যান্য ঋণ বিয়োগ করুন।

3. নেসাব মিলিয়ে দেখুন: ৫২.৫ ভরি রুপার মূল্য (বাংলাদেশে প্রায় ৬৫,০০০-৭০,০০০ টাকা) আপনার কাছে থাকে কি না।

· যদি থাকে: তাহলে ওয়াজিব; হালাল টাকায় কুরবানি দিন।

· যদি না থাকে: তাহলে ওয়াজিব নয়; ঋণ পরিশোধে মন দিন এবং কুরবানির দিনগুলোতে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন।

মনে রাখবেন, কুরবানি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের একটি মাধ্যম। পক্ষান্তরে, সুদি লোন আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ। আপনি যদি সুদি লোন গ্রহণ করে থাকেন, তবে প্রথম কাজ হলো তওবা করা ও লোন পরিশোধের সংকল্প করা। তারপর, যদি সম্পদ থাকে, তবে কুরবানি দিন। কিন্তু কখনোই সুদের টাকা বা সুদি লোনের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ কুরবানিতে ব্যবহার করবেন না—এমন কুরবানি আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না, বরং তা হবে হারামের ভিত্তিতে একটি খারাপ কাজ।

আল্লাহ কুরআনে বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ

“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা সত্যিকার মুমিন হও।” (সূরা বাকারা, ২:২৭৮)

পরিশেষে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘোষণা মনে রাখবেন:

مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ وَلَمْ يُضَحِّ فَلاَ يَقْرَبَنَّ مُصَلاَّنَا

“যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদের মাঠের কাছেও না আসে।” (ইবনে মাজাহ, হাদিস সহিহ)

সুতরাং, সামর্থ্য থাকলে কুরবানি দিন—কিন্তু নিশ্চিত হন যে তা ঋণের চাপে পড়ে বা হারাম উপার্জন দিয়ে যেন না হয়। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমীন।

মুক্তিবাণী

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও