বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসে এমন কিছু অনুষ্ঠান আছে, যেগুলো কেবল বিনোদন নয়, একটি প্রজন্মের স্মৃতি, আবেগ ও স্বপ্নের অংশ। বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) জনপ্রিয় শিশু-কিশোর প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতা ‘নতুন কুঁড়ি’ তেমনই একটি নাম। একসময় দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের কোনো শিশুর গান, আবৃত্তি কিংবা অভিনয় জাতীয় টেলিভিশনের পর্দায় পৌঁছে যেত এই মঞ্চের হাত ধরে। অনেকের কাছে এটি ছিল তারকা হওয়ার প্রথম সিঁড়ি, আবার অনেকের কাছে ছিল আত্মবিশ্বাস ও সৃজনশীলতার প্রথম পাঠশালা।
দীর্ঘ বিরতির পর আবারও ফিরে এসেছে ‘নতুন কুঁড়ি’। তবে এবার সংস্কৃতির মঞ্চে নয়, খেলাধুলার অঙ্গনে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন ক্রীড়া পরিদপ্তরের উদ্যোগে শুরু হয়েছে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬-২৭’। ইতোমধ্যে দ্বিতীয় ধাপের নিবন্ধন শুরু হয়েছে এবং আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত আবেদন করা যাবে।
একটি স্বপ্নের সূচনা
‘নতুন কুঁড়ি’র যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি দূরদর্শী সাংস্কৃতিক ভাবনা থেকে। বিশিষ্ট শিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও টেলিভিশন নির্মাতা মুস্তফা মনোয়ার ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনে সীমিত পরিসরে এই ধারণার সূচনা করেন। স্বাধীনতার পর তাঁর পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও পরিচালনায় ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে এটি জাতীয় প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতা হিসেবে নতুন রূপ লাভ করে।
ঐতিহাসিক বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় এই উদ্যোগ দেশব্যাপী সম্প্রসারিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল শহর-গ্রাম নির্বিশেষে প্রতিভাবান শিশু-কিশোরদের খুঁজে বের করে জাতীয় পর্যায়ে তুলে আনা এবং তাদের সৃজনশীল বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করা।
অনুষ্ঠানটির নামকরণও ছিল ব্যতিক্রমী। মুস্তফা মনোয়ারের বাবা, প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফা রচিত ‘কিশোর’ কবিতার পঙ্ক্তি থেকে নেওয়া হয় ‘নতুন কুঁড়ি’ নামটি। কবিতার প্রথম অংশ দীর্ঘদিন অনুষ্ঠানটির থিম সং হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা আজও বহু দর্শকের স্মৃতিতে অম্লান।
একটি অনুষ্ঠান নয়, একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন
আজকের মতো তখন অসংখ্য টেলিভিশন চ্যানেল কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। ফলে দেশের শিশু-কিশোরদের জন্য জাতীয় পর্যায়ে প্রতিভা প্রকাশের সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম ছিল বিটিভির ‘নতুন কুঁড়ি’।
জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বাছাইয়ের মাধ্যমে সারা দেশের প্রতিযোগীরা অংশ নিত জাতীয় পর্বে। গান, নাচ, অভিনয়, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কনসহ বিভিন্ন বিভাগে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। এর মাধ্যমে গ্রামবাংলার বহু প্রতিভাবান শিশু প্রথমবারের মতো জাতীয় পরিচিতি লাভের সুযোগ পেয়েছিল।
‘নতুন কুঁড়ি’ কেবল শিল্পী তৈরি করেনি; এটি আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা, সৃজনশীলতা এবং নেতৃত্বের গুণও বিকশিত করেছে। জাতীয় মঞ্চে দাঁড়িয়ে পরিবেশনা করার অভিজ্ঞতা হাজারো শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
যে মঞ্চ থেকে উঠে এসেছেন তারকারা
বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের বহু উজ্জ্বল নক্ষত্রের পথচলা শুরু হয়েছে এই মঞ্চ থেকে। তারানা হালিম, সামিনা চৌধুরী, কনকচাঁপা, রুমানা রশীদ ঈশিতা, তারিন জাহান, মেহের আফরোজ শাওন এবং নুসরাত ইমরোজ তিশা-সহ অসংখ্য শিল্পী ‘নতুন কুঁড়ি’র মাধ্যমে প্রথম জাতীয় পরিচিতি পান। পরবর্তীকালে তাঁরা অভিনয়, সংগীত, উপস্থাপনা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের গর্বে পরিণত হন।
এ কারণেই ‘নতুন কুঁড়ি’কে অনেকেই বাংলাদেশের প্রথম এবং সবচেয়ে সফল শিশু-কিশোর প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করেন।
কেন ফিরে আসা জরুরি ছিল
দীর্ঘ সময় ধরে ‘নতুন কুঁড়ি’র নিয়মিত আয়োজন বন্ধ থাকায় একটি প্রজন্ম এমন একটি রাষ্ট্র পরিচালিত প্রতিভা বিকাশ কর্মসূচি থেকে বঞ্চিত হয়েছে, যা একসময় দেশের সাংস্কৃতিক বিকাশে অনন্য ভূমিকা রেখেছিল।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে অসংখ্য রিয়েলিটি শো থাকলেও অধিকাংশই বাণিজ্যিক উদ্যোগ। কিন্তু রাষ্ট্রের উদ্যোগে তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভা খুঁজে বের করার মতো কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা কখনোই কমে যায়নি।
অনেকের মতে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে ‘নতুন কুঁড়ি’ উদ্যোগের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশের যে দর্শনের সূচনা করেছিলেন, বর্তমান ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ সেই ভাবনারই একটি আধুনিক সম্প্রসারণ।
এবার খেলাধুলার মাঠে নতুন কুঁড়ি
সময়ের চাহিদা বিবেচনায় এবার ‘নতুন কুঁড়ি’ নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। সংস্কৃতির পাশাপাশি দেশের ক্রীড়াঙ্গনের ভবিষ্যৎ তারকা খুঁজে বের করার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬-২৭’।
বর্তমানে দ্বিতীয় ধাপের নিবন্ধন চলছে ১ জুলাই থেকে এবং আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত আবেদন করা যাবে।
এই কর্মসূচিতে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী ছেলে ও মেয়েরা অংশ নিতে পারবে। প্রতিযোগিতা হবে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, অ্যাথলেটিক্স, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, দাবা, মার্শাল আর্ট, সাঁতার ও টেবিল টেনিসসহ ১০টি খেলায়।
আবেদন করা যাবে www.notunkurisports.gov.bd ওয়েবসাইটে।
ভবিষ্যতের বিনিয়োগ
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বহু বছর ধরেই তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভা বাছাই করে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি করছে। বাংলাদেশেও দীর্ঘমেয়াদি ক্রীড়া উন্নয়নের জন্য ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ হতে পারে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ।
তবে নিবন্ধনের মধ্যেই এই উদ্যোগের সাফল্য সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নির্বাচিত শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, দক্ষ কোচিং, পুষ্টি, চিকিৎসা সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই এই কর্মসূচি দেশের ক্রীড়াঙ্গনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারবে।
নতুন কুঁড়ি, নতুন বাংলাদেশ
একসময় ‘নতুন কুঁড়ি’ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগতকে সমৃদ্ধ করেছিল। আজ সেই একই নাম দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। সময় বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু প্রতিভা আবিষ্কার ও বিকাশের প্রয়োজনীয়তা বদলায়নি।
যে দেশ ‘নতুন কুঁড়ি’ থেকে অসংখ্য শিল্পী, অভিনেতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব পেয়েছে, সেই দেশই হয়তো আগামী দিনে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ থেকে পাবে আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলার, ক্রিকেটার, অ্যাথলেট কিংবা অলিম্পিয়ান।
একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ প্রজন্ম। তাদের প্রতিভা আবিষ্কার, পরিচর্যা ও বিকাশে রাষ্ট্রের বিনিয়োগই ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে আরও সমৃদ্ধ করবে। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথেই নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে ‘নতুন কুঁড়ি’। এটি কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, আগামী বাংলাদেশের সম্ভাবনার বীজ বপনের একটি জাতীয় উদ্যোগ।










পাঠকের মন্তব্য