বাংলাদেশের জাতীয় খেলা কাবাডি শুধু একটি ক্রীড়া ইভেন্ট নয়, এটি গ্রামীণ জনজীবন, লোকজ সংস্কৃতি এবং বাঙালির শিকড়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি ঐতিহ্য। একসময় গ্রামের খোলা মাঠে “হা-ডু-ডু” নামে পরিচিত এই খেলাই স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে জাতীয় খেলার মর্যাদা লাভ করে। দক্ষিণ এশিয়ায় কাবাডির শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হতো সম্মানের সঙ্গে। এশিয়ান গেমসে রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ পদক জয়, দক্ষিণ এশীয় আসরে ধারাবাহিক সাফল্য এবং ভারতের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ঈর্ষণীয়।
কিন্তু বিশ্ব কাবাডি যখন আধুনিক প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ এবং পেশাদার লিগের মাধ্যমে দ্রুত এগিয়ে গেছে, তখন বাংলাদেশ অনেকটাই থেমে থেকেছে। ফলাফল, যে খেলাটি আমাদের জাতীয় পরিচয়ের অংশ, সেই খেলাতেই আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আগের তুলনায় অনেক দুর্বল।
প্রশ্ন হলো, জাতীয় খেলা হয়েও কাবাডিতে বাংলাদেশ কেন বিশ্বমানের শক্তিতে পরিণত হতে পারছে না?
এর প্রথম কারণ অবকাঠামোগত বৈপরীত্য। আন্তর্জাতিক কাবাডি আজ আর মাটির মাঠের খেলা নয়। আন্তর্জাতিক কাবাডি ফেডারেশন (IKF) বহু বছর আগেই খেলাটিকে সিন্থেটিক ম্যাটভিত্তিক প্রতিযোগিতায় রূপান্তর করেছে। ম্যাটে খেলার গতি, ভারসাম্য, ট্যাকলিং, ডাইভিং, রেইডিং এবং কৌশল মাটির কোর্টের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন।
অথচ বাংলাদেশের অধিকাংশ খেলোয়াড় এখনও মাটির মাঠেই অনুশীলন করেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মানের ম্যাট প্রায় নেই বললেই চলে। জাতীয় দলের ক্যাম্পে এসে অল্প সময়ের জন্য ম্যাটে অনুশীলন করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নামা বাস্তবসম্মত নয়। ফলে প্রতিপক্ষ যখন বছরের পর বছর ম্যাটে খেলে দক্ষতা অর্জন করছে, তখন বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা মৌলিক পরিবেশগত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
দ্বিতীয় বড় সংকট পেশাদারিত্বের ঘাটতি। ভারতের প্রো কাবাডি লিগ (PKL) বিশ্ব কাবাডির ইতিহাসই বদলে দিয়েছে। ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করা এই লিগ কাবাডিকে শুধু জনপ্রিয়ই করেনি, খেলাটিকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক একটি ক্রীড়া শিল্পে পরিণত করেছে। আন্তর্জাতিক তারকা খেলোয়াড়, করপোরেট বিনিয়োগ, টেলিভিশন সম্প্রচার, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ এবং উচ্চ পারিশ্রমিক কাবাডিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
আজ ভারতের কাবাডি খেলোয়াড়রা স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, নিউট্রিশনিস্ট, ভিডিও অ্যানালিস্ট এবং স্পোর্টস সাইকোলজিস্টের সহায়তায় নিজেদের প্রস্তুত করেন। বাংলাদেশে এখনও তেমন কোনো পেশাদার ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ গড়ে ওঠেনি। জাতীয় লিগও নিয়মিত নয়। ফলে অধিকাংশ খেলোয়াড়ের জন্য কাবাডি পূর্ণকালীন পেশা হয়ে উঠতে পারেনি।
খেলোয়াড় তৈরির কাঠামোও আরেকটি বড় দুর্বলতা। বর্তমানে দেশের কাবাডির বড় অংশ নির্ভর করে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও নৌবাহিনীর মতো সার্ভিসেস দলের ওপর। এসব প্রতিষ্ঠানের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু একটি জাতীয় খেলার ভিত্তি শুধু সার্ভিসেসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
বিশ্বমানের ক্রীড়া ব্যবস্থায় খেলোয়াড় তৈরির কাজ শুরু হয় স্কুল, কলেজ, একাডেমি ও বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা থেকে। বাংলাদেশে কাবাডির ক্ষেত্রে সেই ধারাবাহিক পাইপলাইন এখনও দুর্বল। অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় বয়সের গুরুত্বপূর্ণ সময় পার হওয়ার পর সংগঠিত ক্রীড়ার আওতায় আসেন। তখন আন্তর্জাতিক মানের গতি, রিফ্লেক্স ও ফিটনেস তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার অভাবও বাংলাদেশের অন্যতম সীমাবদ্ধতা। আধুনিক ক্রীড়ায় নিয়মিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ছাড়া উন্নতি সম্ভব নয়। ইরান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা থাইল্যান্ডের খেলোয়াড়রা সারা বছর আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নেন। বাংলাদেশের জাতীয় দল অনেক সময় বড় টুর্নামেন্টের কয়েক মাস আগে ক্যাম্পে একত্রিত হয়। এতে ম্যাচ পরিস্থিতি, কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং চাপ সামাল দেওয়ার অভিজ্ঞতায় ঘাটতি থেকেই যায়।
এদিকে বিশ্ব কাবাডির মানচিত্রও দ্রুত বদলেছে। একসময় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা প্রতিযোগিতায় এখন ইরান শক্তিশালী পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড, চাইনিজ তাইপে এমনকি আফ্রিকার কেনিয়াও আধুনিক প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। অথচ বাংলাদেশের অগ্রগতি সেই তুলনায় ধীর।
তবে সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, কাবাডি এই দেশের মানুষের রক্তে মিশে আছে। গ্রামবাংলার অসংখ্য শিশু এখনও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই খেলায় অংশ নেয়। প্রয়োজন শুধু সেই প্রাকৃতিক প্রতিভাকে বৈজ্ঞানিকভাবে গড়ে তোলার।
প্রথমত, প্রতিটি বিভাগ এবং সম্ভাবনাময় জেলায় আন্তর্জাতিক মানের সিন্থেটিক ম্যাট স্থাপন করতে হবে। শুধু জাতীয় দলের জন্য নয়, তৃণমূল থেকেই খেলোয়াড়দের ম্যাটে অনুশীলনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, একটি নিয়মিত বাংলাদেশ প্রো কাবাডি লিগ চালু করা জরুরি। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করে টেলিভিশন সম্প্রচার ও স্পন্সরশিপের মাধ্যমে খেলাটিকে আর্থিকভাবে টেকসই করতে হবে। এতে খেলোয়াড়রা কাবাডিকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার উৎসাহ পাবেন।
তৃতীয়ত, বিকেএসপি, জেলা ক্রীড়া সংস্থা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বয়সভিত্তিক কাবাডি একাডেমি গড়ে তুলতে হবে। স্কুল পর্যায়ে নিয়মিত কাবাডি প্রতিযোগিতা চালু করা গেলে ভবিষ্যতের জাতীয় দলের জন্য শক্তিশালী খেলোয়াড়ভিত্তি তৈরি হবে।
চতুর্থত, আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্সকে প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। পুষ্টিবিজ্ঞান, বায়োমেকানিক্স, ভিডিও অ্যানালাইসিস, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং স্পোর্টস সাইকোলজি ছাড়া এখন আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব নয়।
সবশেষে প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা। ফুটবল বা ক্রিকেটের মতো কাবাডিকেও চার বা পাঁচ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। ফেডারেশন, সরকার, করপোরেট খাত এবং জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব নয়।
জাতীয় খেলা হিসেবে কাবাডি আমাদের গর্বের প্রতীক। কিন্তু শুধু অতীতের সাফল্য স্মরণ করে ভবিষ্যৎ গড়া যায় না। বিশ্ব কাবাডি বদলে গেছে, বদলাতে হবে আমাদের চিন্তা, অবকাঠামো এবং প্রস্তুতিও। ঐতিহ্যের শক্তির সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশের কাবাডি আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে। জাতীয় খেলার মর্যাদা তখন শুধু সংবিধান বা ইতিহাসের পাতায় নয়, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনেও নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হবে।










পাঠকের মন্তব্য