বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যখন গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন অপতথ্য, রাজনৈতিক চাপ ও ডিজিটাল হুমকির মধ্যেও পরিবর্তনের নতুন সম্ভাবনা দেখছেন গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, বর্তমান সংকট শুধু চ্যালেঞ্জ নয়, বরং সাংবাদিকতার কাঠামোগত পরিবর্তনের বড় সুযোগও তৈরি করেছে। রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এ উঠে আসে এমন নানা গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও উদ্বেগের কথা।
গতকাল শুক্রবার (৮ মে) সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে শুরু হয় ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এর উদ্বোধনী আয়োজন। আন্তর্জাতিক এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে মিডিয়া রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)। এতে দেশি-বিদেশি পাঁচ শতাধিক সাংবাদিক, সাংবাদিকতার শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থী অংশ নেন। দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের আজ শেষ দিন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইউনেস্কোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুসান ভাইজ বলেন, গত দুই বছরে গণমাধ্যম নিয়ে মিডিয়া রিফর্ম কমিশন, এমআরডিআই, ইউএনডিপি ও ইউনেসকোর বিভিন্ন রিপোর্ট এবং বিশ্লেষণ হয়েছে। এখন সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।
বাংলাদেশের গণমাধ্যম এখন গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই মুহূর্তটিই পরিবর্তনের বড় সুযোগ। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রেকর্ড খুব ভালো না হলেও বর্তমান সময় দেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকতা এখন ঝুঁকির মুখে। গত এক দশকে সারা বিশ্বে অন্তত ৫০০ সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। ভারত, পাকিস্তান এমনকি বাংলাদেশেও দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রাণ দিতে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ গত ১৭ বছর, বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত কর্তৃত্ববাদী শাসনের মধ্যে ছিল। সে সময়ে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের দুটি শীর্ষ গণমাধ্যমে পরিকল্পিত হামলার ঘটনাও ঘটে। এ সময় সরকারের নীরব ভূমিকা সবাইকে আশাহত করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যদিও সম্মেলনের আলোচনার মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক হুমকি মোকাবিলায় কার্যকর দিকনির্দেশনা বেরিয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন ইফতেখারুজ্জামান।
বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস বলেন, বিশ্বজুড়ে তথ্য পরিবেশ গভীর সংকটে রয়েছে। মিথ্যা তথ্য এখন সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, মানুষের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা কমছে এবং সাংবাদিকেরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ডিজিটাল চাপের মুখে পড়ছেন। এ পরিস্থিতিতে সাংবাদিকতার ভূমিকা শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং অপরিহার্য।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত ছিলেন গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্ক (জিআইজেএন)-এর নির্বাহী পরিচালক এমিলিয়া দিয়াজ-স্ট্রাক। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে এবং বাংলাদেশে সাংবাদিকতার জন্য এটি অত্যন্ত সংকটময় সময়। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অর্ধেকের বেশি দেশ বর্তমানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিচারে ‘কঠিন’ বা ‘খুবই গুরুতর’ পরিস্থিতিতে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, গণতন্ত্রের অবক্ষয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত অপতথ্য আজ বিশ্বের নাগরিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই প্রেক্ষাপটে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা ও চ্যালেঞ্জ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে।
স্বাগত বক্তব্যে এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এটি বাইরের কারও দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে না। নিউজরুমের নিজস্ব নীতি ও নৈতিকতার ভিত্তিতে স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার একমাত্র পথ।
শক্তিশালী সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর জোর
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাবিষয়ক প্রথম অধিবেশনে দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পূর্বশর্ত হলো শক্তিশালী সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান। গণমাধ্যমের রাজনীতিকরণের কারণে দেশে এমন শক্তিশালী সম্পাদকীয় কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
তিনি আরও বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মধ্যেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিহিত। তবে অতীতে দেশে যথেষ্ট অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হয়নি, এখনও হচ্ছে না। ভবিষ্যতে হবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে সম্পাদকদের ভূমিকার ওপর।
এ অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন ডনের সম্পাদক জাফর আব্বাস, টরন্টো স্টারের সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক এবং যমুনা টেলিভিশনের সিও ফাহিম আহমেদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন বিবিসির সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার।
পরে আরও তিনটি অধিবেশনে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, নিউজরুমে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি এবং তথ্যের বিশুদ্ধতা রক্ষা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রথম দিনের সমাপনী অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, পরিবর্তিত ও রূপান্তরিত গণমাধ্যম ব্যবস্থায় নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। যারা প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও গণমুখী গণমাধ্যমের জন্য কাজ করতে চান, তাদের এসব চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানতে হবে।









