![]()
মন্তব্য প্রতিবেদন
সরকার এবং আইনমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। দেশে প্রথমবারের মতো লটারির মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রার বদলির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আইনমন্ত্রী। রবিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বদলি প্রক্রিয়ায় ‘স্বচ্ছতা নিশ্চিত’ করতে সাব-রেজিস্ট্রারদের লটারির মাধ্যমে বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে মঙ্গলবার সকাল ১০টায় এ লটারি অনুষ্ঠিত হবে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা জেলার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোর জন্য নির্ধারিত পদগুলোতে বিভিন্ন জেলার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত সাব-রেজিস্ট্রারদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হবে। লটারি কার্যক্রমে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান উপস্থিত থাকবেন।
বাংলাদেশে দুর্নীতির আঁতুড়ঘর হলো এই বদলি। এর মধ্যে ভূমি অফিসের পদায়ন হলো ঘুষের খনি। এখানে ঘুষ লেনদেন হয় মূলত সাব-রেজিস্ট্রার পদ ঘিরে। এই সাব-রেজিস্ট্রাররাই হলেন এই খাতের কালেক্টর। জনগণের কাছ থেকে তারাই সরাসরি অর্থ আদায় করেন। এই টাকা পদ অনুযায়ী সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত বণ্টন হয়। সাব-রেজিস্ট্রারেরও কিছু নির্দিষ্ট পদ আছে, যেসব পদ রীতিমতো নিলামে বিক্রি হয়। গুলশান, গাজীপুর, রূপগঞ্জ, কেরানীগঞ্জের মতো জায়গায় সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে পদায়নের জন্য লাগে কয়েক কোটি টাকা। এই বদলি লটারির মাধ্যমে করে আইনমন্ত্রী দুর্নীতি বন্ধে একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছেন।
শুধু সাব-রেজিস্ট্রার কেন, সব সরকারি কর্মচারীর বদলির ক্ষেত্রেই একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশে দুর্নীতির একটি বড় কারণ হলো এই বদলিবাণিজ্য। সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে একদম নিম্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পছন্দের জায়গায় বদলি হতে হলে টাকা গুনতে হয়। কিছু কিছু লাভজনক পদ কোটি কোটি টাকায় বিক্রি হয়। যে কর্মকর্তা বিপুল অঙ্কের অর্থ দিয়ে বদলি হন, তার প্রথম কাজ হয় বিনিয়োগের টাকা তোলা। এরপর তিনি ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত হন। সচিব থেকে শুরু করে একদম নিম্ন স্তরের কর্মকর্তাদের লাভজনক পদ পেতে ঘুষ দিতে হয়। কর্মচারীদেরও লোভনীয় পদে যেতে উৎকোচ দিতে হয়। সরকারি চাকরিতে কিছু চিহ্নিত পদ আছে, যেসব পদে টাকা ছাড়া পদায়ন অসম্ভব। আবার এলাকা ভেদে পদের দাম বাড়ে-কমে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এরকম অন্তত ২৫টি পদ আছে, যেখানে টাকা ছাড়া বদলি হওয়া সম্ভব নয়।
দেশের অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এখানে দুর্নীতি হয় প্রধানত থানাকেন্দ্রিক। অতীতে গুলশান, বনানী, ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকার থানায় ওসি পদে আসতে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা খরচ করতে হতো। এখনো পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু ওসি নন, এসব থানায় কনস্টেবল পদে আসতেও গুনতে হয় লাখ টাকা। একজন পুলিশ সদস্য যখন ঘুষ দিয়ে একটি পদে আসেন, তখন তিনি সৎ থাকবেন কীভাবে?
নিম্ন আদালতের বিচারকদের পদায়নেও হয় ঘুষ লেনদেন। সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিচারকদের বদলিতে ঘুষ নেওয়ার অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিলেন। এ সময়ে নিম্ন আদালতের বিচারক বদলিতে কোটি টাকার লেনদেন হয়। সবচেয়ে বেশি ঘুষ লাগে ঢাকা এবং তার আশপাশের এলাকায় পদায়নের জন্য। ইউনূস আমলে সচিব পর্যায়ে পদায়ন ও পদোন্নতির জন্য ঘুষ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে প্রকাশ্যে। ডিসি নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে জনপ্রশাসন সচিব বদলি হন। এ সময় বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর পদায়ন-বাণিজ্যের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। বন বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপদ বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ ইত্যাদি বিভাগে নিম্ন পদের চেয়ে উচ্চ পদ অনেক ব্যয়বহুল। ২০২৩ সালে একটি প্রধান প্রকৌশলীর পদ শতকোটি টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয়েছিল। এসব সরকারি দপ্তরে কিছু চিহ্নিত জেলা ও পদ আছে, যেসব পদে বদলি হওয়ার জন্য রীতিমতো নিলাম হয়।
ডাক্তারদের পদায়নেও বাণিজ্য হয়। একজন চিকিৎসককে ঢাকায় বদলি হতে লাখ টাকা গুনতে হয়। ঢাকার বাইরে কোনো চিকিৎসক থাকতে চান না। কারণ সবকিছু ঢাকামুখী, ঢাকা-কেন্দ্রিক। ইউনূস আমলে ৩ হাজার মেডিকেল অফিসার ও ৫০০ কর্মচারীর চেয়ার রদবদল করা হয়েছে। এত স্বল্প সময়ে অতীতে অধিদপ্তরে এমন বদলি হয়নি। বদলি হওয়া অনেক চিকিৎসক জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কর্মস্থলে যোগ দেননি। সরকারি চাকরি যারা করেন, তাদের একটি বড় অংশ যেকোনো উপায়ে ঢাকায় কর্মরত থাকতে চান। ১৮ কোটি মানুষের দেশে সবাই যদি ঢাকায় চাকরি করতে চান, তাহলে ঢাকার বাইরে যে জনগোষ্ঠী আছেন, তারা সেবা পাবেন কোথায়? বাস্তবেও আমাদের সব সেবা ঢাকা-কেন্দ্রিক। এর একটি বড় কারণ হলো বদলির বর্তমান ব্যবস্থা।
এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য আইনমন্ত্রী সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে প্রথমবারের মতো লটারি পদ্ধতি চালু করেছেন। এটি একটি অসাধারণ উদ্যোগ। এর ফলে দেশের অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত এই সেক্টরে দুর্নীতি অনেক কমে যাবে। যারা ঘুষ ছাড়া লটারির মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক এলাকায় সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পাবেন, তারা আগের মতো বুভুক্ষু থাকবেন না। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবেন এবং জনগণের সেবায় মনোযোগী হবেন বলে আশা করা যায়। পাশাপাশি আইনমন্ত্রী লটারির মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রার বদলির যে প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছেন, তা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ও অনুসরণ করতে পারে। এ উদ্যোগ হতে পারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর কৌশল। সরকারের সেবামূলক সব প্রতিষ্ঠান এ পদ্ধতি অনুসরণ করে বদলি ও পদায়ন করতে পারে। যেমন ধরা যাক, জেলা প্রশাসক পদায়ন নিয়ে প্রায়ই বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যদি ফিট লিস্টে থাকা যোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করে কোন জেলায় কে ডিসি পদে নিয়োগ পাবেন, তাহলে সহজেই বিতর্ক এড়ানো সম্ভব। একইভাবে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কিংবা চিকিৎসক পদে বদলির ক্ষেত্রেও এ পদ্ধতি একটি সহজ সমাধান। একজন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী যদি ঘুষ না দিয়ে একটি পদে বসেন, তাহলে একদিকে যেমন তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত হবেন না, অন্যদিকে তিনি জবাবদিহির আওতায় আসবেন। ভালো কাজ করে জনগণের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করবেন। এতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী আবহ সৃষ্টি হবে।









