স্কুল থেকে মাদ্রাসায় ঝোঁক: আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আয়নায় যে প্রশ্নগুলো

এস্ এম মেহেদী হাসান

স্কুল থেকে মাদ্রাসায় ঝোঁক: আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আয়নায় যে প্রশ্নগুলো

একটি জাতির ভবিষ্যৎ কোথায় তৈরি হয়? রাজনীতির মঞ্চে, নাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে? নিঃসন্দেহে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই। কারণ আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। সে শিক্ষক হবে, চিকিৎসক হবে, প্রকৌশলী হবে, প্রশাসক হবে, উদ্যোক্তা হবে। তাই কোনো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ. ন. ম. এহছানুল হক মিলনের বক্তব্যে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, তুলনামূলকভাবে স্কুল থেকে মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি স্কুলে ইসলামী শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন। অভিভাবকদের একটি অংশ মনে করছেন, সন্তানকে এমন পরিবেশে পড়ানো প্রয়োজন যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা ও মূল্যবোধও গুরুত্ব পায়।
মন্ত্রীর এই বক্তব্য শুধু একটি বক্তব্য নয়; এর ভেতরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন লুকিয়ে আছে।
বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিপুল। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬৫ হাজারের বেশি। এর বাইরে কিন্ডারগার্টেন, বেসরকারি ও অন্যান্য ধরনের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও রয়েছে কয়েক হাজার স্কুল ও কলেজ। অন্যদিকে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিয়া মাদ্রাসার সংখ্যাও কয়েক হাজার। এর বাইরে কওমি মাদ্রাসার বিশাল একটি শিক্ষা নেটওয়ার্ক রয়েছে, যার পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান সরকারি সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার মতো একক কাঠামোয় পাওয়া যায় না।
অর্থাৎ দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় স্কুল ও মাদ্রাসা—দুই ধারারই বড় উপস্থিতি রয়েছে। প্রশ্ন হলো, অভিভাবকরা কেন এক ধারা থেকে অন্য ধারায় সন্তানকে নিয়ে যেতে আগ্রহী হচ্ছেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে অভিভাবকদের মানসিকতা বুঝতে হবে। বাংলাদেশের সাধারণ পরিবার শুধু চাকরি পাওয়ার শিক্ষা চায় না। তারা চায় সন্তান ভালো মানুষ হোক, নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে বড় হোক, ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করুক। বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশে ইসলামী শিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের বিষয়টি অভিভাবকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সেই চাহিদাকে যদি সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে যথাযথভাবে জায়গা দেওয়া না হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই একটি অংশ বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকবে।
এখানেই শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যটি গুরুত্ব পায়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ধর্মীয় শিক্ষা এবং আধুনিক শিক্ষা পরস্পরের প্রতিপক্ষ হওয়ার কথা নয়। একজন শিক্ষার্থী একই সঙ্গে গণিত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ইংরেজি শিখতে পারে; পাশাপাশি নিজের ধর্ম, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সম্পর্কেও জ্ঞান অর্জন করতে পারে। বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত জ্ঞানী, দক্ষ ও নৈতিক মানুষ তৈরি করা।
কিন্তু গত কয়েক বছরে শিক্ষা নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। পাঠ্যক্রম পরিবর্তন হয়েছে, মূল্যায়ন পদ্ধতি বদলেছে, নতুন নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের কোনোটি প্রয়োজনীয় ছিল, কোনোটি হয়তো সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি থেকে গেছে—আমরা আসলে কেমন মানুষ তৈরি করতে চাই?
শুধু পরীক্ষার ফল, জিপিএ কিংবা সার্টিফিকেট দিয়ে একটি জাতির শিক্ষার মান নির্ধারণ করা যায় না। শিক্ষার্থীর নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম, ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধ—এসবও শিক্ষার অংশ।
এখানে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের সময়ে বিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছিল। কোথাও সাংস্কৃতিক বা সংগীত শিক্ষকের ব্যবস্থা করা হয়েছে, অথচ ধর্মীয় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা একই গুরুত্বে বিবেচিত হয়নি—এমন প্রশ্নও উঠেছে। বিষয়টি সত্য হলে তা অবশ্যই পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষাকে প্রান্তিক করে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। একইভাবে অন্য ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ ধর্মীয় শিক্ষা পাওয়ার সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার—ধর্মীয় শিক্ষার কথা বলার অর্থ অন্য কোনো ধর্ম বা মতের প্রতি বিদ্বেষ তৈরি করা নয়। বরং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সম্মান করে একটি সহনশীল, নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত লক্ষ্য।
একটি প্রচলিত কথা আছে—কোনো জাতিকে দুর্বল করতে চাইলে তার শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে হয়। কথাটি অতিরঞ্জিত মনে হলেও এর মধ্যে বাস্তবতা রয়েছে। কারণ শিক্ষার ভিত দুর্বল হলে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হয় না, গবেষণা থেমে যায়, প্রশাসনিক দক্ষতা কমে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের শিক্ষা খাত গত দেড় দশকে নানা সমালোচনার মুখে পড়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব, নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, অবকাঠামোগত বৈষম্য, শিক্ষক সংকট, মানসম্মত শিক্ষা না পাওয়া এবং শহর-গ্রামের শিক্ষার ব্যবধান—এসব সমস্যা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শিক্ষা খাতে বড় অঙ্কের ব্যয় ও বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও সেই ব্যয়ের সুফল সর্বত্র সমানভাবে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। দেশের হাসপাতাল, চিকিৎসক, ওষুধ এবং স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের অভিযোগ রয়েছে। চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতাও কমেনি। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের চিকিৎসা নিতে যাওয়ার বিষয়টি বাস্তবতা। তবে এর জন্য শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে দায়ী না করে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোও চিহ্নিত করতে হবে।
বর্তমান সরকারের সামনে তাই বড় চ্যালেঞ্জ দুটি—শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। এই দুই খাতকে দলীয় বা রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে এনে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার আওতায় নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ হতে হবে যোগ্যতার ভিত্তিতে। শিক্ষককে রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, তার দক্ষতা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি—সবকিছুর মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।
মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, গণিত, প্রযুক্তি, ইংরেজি ও অন্যান্য আধুনিক বিষয়ে দক্ষ হয়ে উঠবে—এমন ব্যবস্থা করতে হবে। একইভাবে সাধারণ স্কুলের শিক্ষার্থীরাও আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি পর্যাপ্ত ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা পাবে—এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের লক্ষ্য।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য তাই শুধু স্কুল থেকে মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী স্থানান্তরের প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার একটি সুযোগ। অভিভাবকরা কী চান, শিক্ষার্থীরা কী চায় এবং রাষ্ট্র কী ধরনের নাগরিক তৈরি করতে চায়—এই তিনটি বিষয়কে একই জায়গায় আনতে হবে।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ তার শ্রেণিকক্ষে তৈরি হয়। সেই শ্রেণিকক্ষ যদি দক্ষতা, জ্ঞান, নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিকতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে, তাহলে সেই জাতির ভবিষ্যৎও শক্তিশালী হবে। আর যদি শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো একটি দিককে গুরুত্ব দিতে গিয়ে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে বাদ দেওয়া হয়, তাহলে তার খেসারত দিতে হবে পুরো জাতিকেই।
তাই এখন সময় রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে প্রশ্ন করার—আমরা আমাদের সন্তানদের কী শিক্ষা দিচ্ছি, কেন দিচ্ছি এবং আগামী বাংলাদেশের জন্য কেমন মানুষ তৈরি করতে চাই?
এই প্রশ্নের সৎ উত্তরই হয়তো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার পরবর্তী পথ দেখাবে।

স্কুল থেকে মাদ্রাসায় ঝোঁক: আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আয়নায় যে প্রশ্নগুলো

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক

মুক্তিবাণী

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও