মাঠে বিনিয়োগ, ভবিষ্যতে বিনিয়োগ: ক্রীড়া অবকাঠামো ও তরুণ সমাজের রাষ্ট্রদর্শন

মাঠে বিনিয়োগ, ভবিষ্যতে বিনিয়োগ: ক্রীড়া অবকাঠামো ও তরুণ সমাজের রাষ্ট্রদর্শন
মাঠে বিনিয়োগ, ভবিষ্যতে বিনিয়োগ: ক্রীড়া অবকাঠামো ও তরুণ সমাজের রাষ্ট্রদর্শন
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মুক্ত লেখক ও সাংবাদিক।

একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সেতু, মহাসড়ক বা শিল্পকারখানার ওপর নির্ভর করে না। একটি জাতির প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে তার তরুণ জনগোষ্ঠীর ওপর। সেই তরুণ সমাজ যদি সুস্থ, শৃঙ্খলাবদ্ধ, আত্মবিশ্বাসী ও দক্ষ হয়ে ওঠে, তবে রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নও ত্বরান্বিত হয়। আর এই লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হলো খেলাধুলা।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো অনেক আগেই বুঝেছে, খেলাধুলা কেবল বিনোদন নয়; এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা, জনস্বাস্থ্য এবং জাতীয় পরিচয় নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাই উন্নত দেশগুলো ক্রীড়া অবকাঠামোকে বিলাসিতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে।

বাংলাদেশেও খেলাধুলা নিয়ে রাষ্ট্রের ভাবনা নতুন নয়। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে সরকারগুলো ক্রীড়া অবকাঠামো গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিভা বিকাশে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বাস্তবতায় খেলাধুলাকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তারও প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ক্রীড়া অবকাঠামোর ইতিহাস, জিয়া পরিবারের ক্রীড়াবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তরুণ সমাজ নিয়ে ঘোষিত নীতিগত অবস্থান নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

ক্রীড়া অবকাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা

বাংলাদেশে ক্রীড়াবিদ তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)। স্বাধীনতার পর প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্রীড়াবিদ তৈরির যে চিন্তা শুরু হয়, পরবর্তী সময়ে সেটি বাস্তব রূপ পায়। বর্তমানে দেশের আন্তর্জাতিক মানের অসংখ্য ক্রীড়াবিদ এই প্রতিষ্ঠান থেকে উঠে এসেছেন।

ক্রিকেটে সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, নাসির হোসেন, ফুটবল, অ্যাথলেটিকস, সাঁতার, শুটিং কিংবা জিমন্যাস্টিকসসহ বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে বিকেএসপির অবদান অনস্বীকার্য। এটি প্রমাণ করে, পরিকল্পিত অবকাঠামো থাকলে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি করা সম্ভব।

তবে শুধু একটি কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান দিয়ে একটি দেশের ক্রীড়া উন্নয়নের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়েও আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা, খেলার মাঠ এবং প্রশিক্ষক তৈরির সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

জিয়া পরিবারের ক্রীড়া ভাবনা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তরুণ সমাজকে রাষ্ট্রগঠনের অন্যতম শক্তি হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁর সময়ে যুব উন্নয়ন, খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহ দেওয়ার নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। গ্রামীণ পর্যায়ে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও যুব কার্যক্রম সম্প্রসারণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানোর চেষ্টা ছিল সেই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

পরবর্তী সময়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারগুলোর আমলেও ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং ক্রিকেট-ফুটবলের প্রসারে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সময়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন উচ্চতায় পৌঁছায় এবং দেশের ক্রীড়া অঙ্গন আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করে।

রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট, তরুণ সমাজকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখতে খেলাধুলার গুরুত্ব বিভিন্ন সময়েই আলোচিত হয়েছে।

নতুন প্রজন্ম নিয়ে নতুন বার্তা

সম্প্রতি “নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস”-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেখানে খেলাধুলাকে তিনি শুধু পদক জয়ের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং মানুষ গড়ার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরেছেন।

তিনি শিশুদের উদ্দেশে বলেছেন, “নিজেকে কখনো ছোট ভাববে না।”

এই একটি বাক্যের মধ্যেই আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা এবং আত্মনির্ভরশীল নাগরিক তৈরির একটি রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায়।

তিনি আরও বলেন, আজকের ক্ষুদে খেলোয়াড়দের মধ্য থেকেই আগামী দিনের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, শিক্ষক এবং আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ তৈরি হবে।

খেলাধুলাকে তিনি শিক্ষা, পরিবেশ সচেতনতা, সামাজিক দায়িত্ব এবং চরিত্র গঠনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। শিশুদের গাছ লাগানো, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং প্রাণীর প্রতি সহমর্মী হওয়ার আহ্বানও সেই বৃহত্তর রাষ্ট্রচিন্তার অংশ।

কেন খেলাধুলা অপরাধ কমায়

আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণ বেশি, সেখানে কিশোর অপরাধ, মাদকাসক্তি এবং সহিংসতার প্রবণতা তুলনামূলক কম।

খেলাধুলা একজন তরুণকে শিখিয়ে দেয় নিয়ম মানতে, দলগতভাবে কাজ করতে, নেতৃত্ব দিতে, পরাজয় মেনে নিতে এবং আবার নতুন করে লড়াই শুরু করতে।

বাংলাদেশেও কিশোর গ্যাং, মাদক এবং ডিজিটাল আসক্তি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই বাস্তবতায় মাঠে ফিরিয়ে আনা ছাড়া তরুণ সমাজকে সুস্থ বিকল্প দেওয়া কঠিন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণের চেয়ে একটি সক্রিয় খেলার মাঠ অনেক সময় বেশি সামাজিক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।

অবকাঠামোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে জেলা স্টেডিয়াম থাকলেও অধিকাংশ উপজেলা ও ইউনিয়নে মানসম্মত খেলার মাঠের সংকট রয়েছে। অনেক মাঠ দখল, বাণিজ্যিক ব্যবহার কিংবা অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে প্রশিক্ষকের অভাব, আধুনিক সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিযোগিতার অনিয়মিত আয়োজনও প্রতিভা বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে।

যদি প্রতিটি উপজেলায় বহুমুখী ক্রীড়া কমপ্লেক্স, ইনডোর সুবিধা এবং প্রশিক্ষণ একাডেমি গড়ে তোলা যায়, তাহলে দেশের ক্রীড়া মানে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

শুধু ক্রিকেট নয়

বাংলাদেশে ক্রীড়া আলোচনা অনেকাংশেই ক্রিকেটকেন্দ্রিক। অথচ ফুটবল, অ্যাথলেটিকস, সাঁতার, ভলিবল, কাবাডি, হ্যান্ডবল, আর্চারি কিংবা জিমন্যাস্টিকসেও আন্তর্জাতিক সাফল্যের সম্ভাবনা রয়েছে।

এ জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ এবং প্রতিটি খেলাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া।

ভবিষ্যতের পথ

খেলাধুলা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকার তখনই অর্থবহ হবে, যখন সেটি নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হবে।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক মাঠ নির্মাণ, স্কুলভিত্তিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা পুনরুজ্জীবন, বিকেএসপির আঞ্চলিক সম্প্রসারণ, স্পোর্টস সায়েন্সভিত্তিক প্রশিক্ষণ, নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য বিশেষ সুযোগ এবং করপোরেট বিনিয়োগ বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে জাতীয় ক্রীড়াকে শুধু আন্তর্জাতিক ম্যাচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে তৃণমূলের প্রতিভা ও উদ্যোগকে সামনে নিয়ে আসা।

উপসংহার

একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার এবং খেলার মাঠে। মাঠে বেড়ে ওঠা শিশুই ভবিষ্যতে নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ববোধ নিয়ে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

বাংলাদেশের সামনে এখন জনসংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগানোর একটি বড় সুযোগ রয়েছে। এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হলে খেলাধুলাকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

কারণ একটি আধুনিক রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনীতিতে নয়, তার মাঠে বেড়ে ওঠা আত্মবিশ্বাসী তরুণদের মধ্যেও নিহিত।

মুক্তিবাণী

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও