দীর্ঘ ২১ বছরের অপেক্ষা শেষে প্রধানমন্ত্রী এলেন, গেলেন—জেলাবাসীর ভাগ্যের কী পরিবর্তন হলো?

মনিরুজ্জামান মনির

দীর্ঘ একুশ বছর। এক প্রজন্মেরও বেশি সময়। এর মধ্যে মৌলভীবাজারবাসী দেখেছে অনেক সরকার, অনেক নেতা, অনেক প্রতিশ্রুতি। অবশেষে ১৭ জুন, ২০২৬—সে অপেক্ষার অবসান ঘটল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো মৌলভীবাজার সফরে এলেন। বৃষ্টি উপেক্ষা করে, সড়কপথে সিলেট থেকে এসে পৌঁছালেন জেলায়। উৎসাহ-উদ্দীপনায় মাতোয়ারা হয়ে উঠেছিল জেলা। প্রশাসনিক প্রস্তুতি, রাস্তাঘাট সংস্কার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ—সবই ছিল চোখে পড়ার মতো। নেতা-কর্মী থেকে সাধারণ মানুষ—সবার চোখে ছিল একটাই স্বপ্ন: উন্নয়ন।

কিন্তু সেই স্বপ্ন কি পূরণ হলো? প্রধানমন্ত্রী চলে গেলেন—এখনো কি জেলাবাসীর মুখে হাসি ফুটেছে? নাকি সফরটি ছিল কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা, একটি ফটোসেশন, একটি দিনের জন্য মঞ্চ সাজানো আর ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের নামে কিছু নিম্নআয়ের মানুষের হাতে কিছু কার্ড তুলে দেওয়ার পর্ব?

প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে জেলাবাসীর মধ্যে যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, তাতে নতুন করে পুরোনো সব দাবি ফিরে এসেছিল। মৌলভীবাজারে একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, প্রবাসীবহুল ও পর্যটন এলাকা হিসেবে শমসেরনগর বিমানবন্দর চালু করা, জেলার হাওরগুলোর উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণ, রাজনগর পৌরসভা ঘোষণা ও গ্যাস-সংযোগ—এসব দাবি বছরের পর বছর ধরে জেলাবাসীর মনে জমে আছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে জেলাবাসী মনে করেছিল, হয়তো এইবার সেই দাবিগুলোর প্রতি নজর দেবেন তিনি।

কিন্তু কী পেলেন জেলাবাসী?

সরকারি কর্মসূচির তালিকায় ছিল ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ—তৃতীয় পর্যায়ের। শ্রীমঙ্গলের ভিক্টোরিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে এবং পরে জেলা সদরের মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে দুটি অনুষ্ঠান। নিম্নআয়ের মানুষের হাতে কিছু কার্ড তুলে দেওয়া হলো। নিঃসন্দেহে এটি একটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, যা কিছু মানুষের জন্য সহায়ক। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এটাই কি মৌলভীবাজারবাসীর প্রত্যাশিত উন্নয়ন? একটি মেডিকেল কলেজের বদলে ফ্যামিলি কার্ড? একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বদলে কিছু কার্ড? একটি বিমানবন্দর চালুর বদলে মঞ্চে বক্তৃতা?

প্রধানমন্ত্রী রাজনগরের সমাবেশ সদরে স্থানান্তরিত করায় রাজনগরবাসী আশাহত হয়েছেন। তাঁদের দাবি—রাজনগর পৌরসভা ঘোষণা, গ্যাস-সংযোগ, মহিলা ডিগ্রি কলেজ সরকারিকরণ—অনালোচিতই থেকে গেল। একটি উপজেলাকে এড়িয়ে যাওয়ার অর্থ কি সেই উপজেলার উন্নয়ন এড়িয়ে যাওয়া?

মৌলভীবাজার একটি অনন্য জেলাচা-বাগানের সৌন্দর্য, হাওরের সম্পদ, পর্যটনের অপরিসীম সম্ভাবনা—এসব কিছুর মাঝেও জেলাটি উন্নয়নের দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে। হাওরে ফসলডুবির ক্ষতি হয়েছে ৮২ কোটি টাকার। এখানে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত, দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন প্রকল্প—যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, শিক্ষার সুযোগ প্রসারিত করবে, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে, এবং হাওরবাসীকে বন্যার ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করবে। ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ এই সমস্যার সমাধান নয়; এটি কেবল একটি ব্যান্ড-এইড।

শেষ কথা: প্রধানমন্ত্রী এসেছিলেন, দেখে গেলেন, কিছু কার্ড বিতরণ করলেন, চলে গেলেন। জেলাবাসী স্বপ্ন দেখেছিল—স্বপ্ন দেখেছিল মেডিকেল কলেজের, বিশ্ববিদ্যালয়ের, বিমানবন্দরের, হাওরের উন্নয়নের। সেই স্বপ্ন কি পূরণ হলো? জনগণ উত্তর চায়। সংশ্লিষ্ট মহলকে বলতে হবে—এই সফরের বাস্তব ফল কী? জেলার ভাগ্যের কী উন্নয়ন হলো? নাকি এটি ছিল কেবল আরেকটি আনুষ্ঠানিক সফর, আর জেলাবাসীকে আবারও অপেক্ষা করতে হবে আরও একুশ বছর? মৌলভীবাজারবাসী আর শুধু স্বপ্ন দেখতে চায় না—তারা চায় বাস্তবায়ন। তারা চায় কাজ, কথা নয়। প্রধানমন্ত্রীকে ফিরে যেতে হবে জনগণের কাছে—শুধু কার্ড নিয়ে নয়, উন্নয়নের নকশা নিয়ে। জেলাবাসী অপেক্ষা করছে। কিন্তু তারা আর অপেক্ষা করতে চায় না।

মুক্তিবাণী

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও