মশা মারার জন্য কমিটির অভাব নেই। অভাব মাঠে তার উপস্থিতির। কাগজে ৪৮ হাজারের বেশি কমিটি, অথচ ডেঙ্গু ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগের দেখা নেই। তাহলে প্রশ্ন শুধু কমিটি কাজ করছে কি না—প্রশ্ন হলো, কাজ না করলে দায় নেবে কে?
ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি আতঙ্কের নাম নয়। এটি বাংলাদেশের নিয়মিত জনস্বাস্থ্য সংকট। প্রতিবছর একই সময়ে প্রকোপ বাড়ে, হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ে, মৃত্যুর খবর আসে। এরপর শুরু হয় পরিচিত তৎপরতা—ফগিং, ওষুধ ছিটানো, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সভা-সেমিনার এবং জনগণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান।
কিন্তু বছর ঘুরে একই প্রশ্ন ফিরে আসে—আগের বছর থেকে আমরা কী শিখলাম? প্রথম আলোর এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ৪৮ হাজার ৫৫৯টি কমিটি থাকার কথা। সংখ্যাটি শুনলে মনে হতে পারে, মশার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বিশাল এক বাহিনী মাঠে কাজ করছে।
বাস্তব চিত্র ভিন্ন। প্রতিবেদনে বিভিন্ন এলাকার যে তথ্য এসেছে, তাতে অনেক জায়গায় এসব কমিটির অস্তিত্বই মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান নয়। কোথাও কমিটি নেই, কোথাও কমিটি থাকলেও সভা বা কার্যক্রমের খবর নেই। অথচ ডেঙ্গুর বিস্তার থেমে নেই। তাহলে প্রশ্নটা সরাসরি করা দরকার—এই ৪৮ হাজার কমিটির দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের জবাবদিহি কোথায়?
কমিটি কাজ না করলে দায় কার?
২০১৯ সালের জাতীয় নির্দেশিকায় কমিটি গঠনের পাশাপাশি তাদের দায়িত্বও নির্ধারণ করা হয়েছে। কোথাও নিয়মিত সভা করার কথা, কোথাও মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, কোথাও পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও সমন্বয়ের দায়িত্ব।
অর্থাৎ দায়িত্ব অস্পষ্ট নয়। তাহলে কোনো ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড কমিটি দায়িত্ব পালন না করলে দায় কার? কমিটির সভাপতি কি দায় নেবেন? সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কি দায় নেবে? উপজেলা প্রশাসন কি ব্যাখ্যা দেবে? জেলা পর্যায়ের তদারককারী কর্তৃপক্ষ কি জবাব দেবে? নাকি শেষ পর্যন্ত দায়টা গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর—‘আপনারা সচেতন ছিলেন না’?
এভাবে চলতে পারে না।
একটি সরকারি কমিটি যদি কাগজে থাকে কিন্তু নির্ধারিত কাজ না করে, সেটি নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি নয়। সরকারি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা।
আর সেই ব্যর্থতার জন্য কারও জবাবদিহি না থাকলে কমিটি গঠন নিজেই এক ধরনের দায়মুক্তির ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয় সরকার বিভাগের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই
ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা, স্থানীয় পর্যায়ে অভিযান, জনগণকে সম্পৃক্ত করা—এসবের বড় অংশ স্থানীয় সরকার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।
তাই ডেঙ্গু বাড়লে শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। স্থানীয় সরকার বিভাগকেও জবাব দিতে হবে।
কাগজে যদি হাজার হাজার কমিটি থাকে, তাহলে সেই কমিটিগুলো কোথায়, কার নেতৃত্বে, কতবার সভা করেছে এবং কী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে—এসব তথ্য স্থানীয় সরকার বিভাগের কাছে থাকার কথা।
থাকার কথা শুধু নয়, জনগণের জানার অধিকারও আছে। কোনো কমিটি তিন মাসে একবারও সভা করেনি? কারণ কী? কোনো কমিটি মাঠে যায়নি? কেন? কোনো এলাকায় বারবার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে? ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর যদি না থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে।
‘সভা হয়েছে’ আর ‘কাজ হয়েছে’ এক কথা নয়
আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় একটি পুরোনো প্রবণতা আছে—সভা হলেই যেন কাজ হয়ে গেল। কার্যবিবরণী লেখা হলো, ছবি তোলা হলো, সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলো; তারপর বিষয়টি হারিয়ে গেল। মশা কিন্তু এসব বোঝে না।
একটি কমিটি বছরে কয়েকটি সভা করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ হয় না। সভার সিদ্ধান্ত মাঠে বাস্তবায়ন হয়েছে কি না, সেটিই আসল প্রশ্ন।
কোথায় লার্ভা পাওয়া গেল, কোথায় তা ধ্বংস করা হলো, কোন বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা হলো, কোন সরকারি স্থাপনা পরিষ্কার করা হলো, পরবর্তী পরিদর্শনে পরিস্থিতি কেমন পাওয়া গেল—এসবের লিখিত ও যাচাইযোগ্য হিসাব থাকতে হবে। কমিটির সাফল্যের মাপকাঠি হবে না সভার সংখ্যা; মাপকাঠি হবে মশার প্রজননস্থল কমেছে কি না।
দায়িত্ব না নিলে কমিটি ভেঙে দিন
আরেকটি প্রশ্নও করা দরকার। যে কমিটি বাস্তবে কাজই করছে না, সেটি শুধু কাগজে রেখে লাভ কী?
কাজ না করা কমিটি শনাক্ত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে ব্যাখ্যা নিতে হবে। প্রয়োজনে কমিটি পুনর্গঠন করতে হবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলা থাকলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পথও খোলা রাখতে হবে।
কারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কোনো অলংকার নয়। কোনো জনপ্রতিনিধি বা কর্মকর্তা যদি একটি সরকারি কমিটির সভাপতি বা সদস্য হন, তাহলে সেটি শুধু নামের পদ নয়; এর সঙ্গে দায়িত্বও যুক্ত। দায়িত্ব থাকলে জবাবদিহিও থাকতে হবে।
নইলে ৪৮ হাজার কমিটি শুধু কাগজের সংখ্যা বাড়াবে, ডেঙ্গু কমাবে না।
জনগণকে সচেতন করুন, কিন্তু রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ঢাকবেন না
ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদের দায়িত্ব অবশ্যই আছে। বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, ছাদ পরিষ্কার রাখা, পরিত্যক্ত পাত্র সরিয়ে ফেলা—এসব মানুষকে করতে হবে।
কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা আড়াল করতে নাগরিক সচেতনতাকে ঢাল বানানো যাবে না।
একজন নাগরিক নিজের বাড়ি পরিষ্কার রাখলেন। কিন্তু পাশের সরকারি জমিতে পানি জমে রইল। নির্মাণাধীন ভবনে দিনের পর দিন পানি জমে থাকল। ড্রেন পরিষ্কার হলো না। খাল বা নালা আটকে থাকল।
তারপর তাকে বলা হলো, ‘সচেতন হন।’ এটি দায়িত্ব পালনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নাগরিকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জনপরিসরও নিরাপদ রাখা।
৪৮ হাজার কমিটির পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ হোক
এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হতে পারে এই ৪৮ হাজার ৫৫৯টি কমিটির একটি বাস্তব চিত্র প্রকাশ করা।
কতটি কমিটি সক্রিয়? কতটি নিষ্ক্রিয়? কতটি নিয়মিত সভা করেছে? কতটি মাঠপর্যায়ে অভিযান চালিয়েছে? কতটি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করেছে? কোন কমিটি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে? ব্যর্থতার জন্য কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? এই তথ্য জনগণের সামনে আসা উচিত।
প্রযুক্তির যুগে এটি কঠিন কোনো কাজ নয়। একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন ড্যাশবোর্ডে কমিটির নাম, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, সভার তারিখ, গৃহীত সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রকাশ করা যায়।
তাহলেই বোঝা যাবে—৪৮ হাজার কমিটি আসলে ৪৮ হাজার কার্যকর উদ্যোগ, নাকি ৪৮ হাজার কাগুজে অস্তিত্ব।
এখন দায় নির্ধারণের সময়
জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলেছেন, মাঠপর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ের কমিটিগুলো সক্রিয় করা গেলে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বড় আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব।
কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু কমিটি সক্রিয় করার আহ্বান যথেষ্ট নয়। কে সক্রিয় করবে, কে তদারক করবে, আর কে ব্যর্থতার দায় নেবে—সেটিও নির্ধারণ করতে হবে।
কারণ এত দিন আমরা কমিটি গঠনের কথা শুনেছি। এখন দরকার দায়িত্ব বণ্টন ও দায় নির্ধারণের সংস্কৃতি।
কোনো এলাকায় ডেঙ্গু বাড়লে শুধু রোগীর সংখ্যা গুনে লাভ নেই। দেখতে হবে, তার আগে সেখানে মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কমিটি কী করেছে। যদি তারা দায়িত্ব পালন করে থাকে, তার প্রমাণ কোথায়? আর যদি না করে থাকে, তাহলে ব্যবস্থা কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধের কোনো পরিকল্পনাই বিশ্বাসযোগ্য হবে না।
মশা কাউকে ভোট দেয় না, কোনো দপ্তরের অধীনও নয়। কিন্তু মশার বিস্তার ঠেকানোর দায়িত্ব যাদের হাতে, তাদের নাম-পরিচয়, দায়িত্ব এবং জবাবদিহি স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
৪৮ হাজার কমিটি যদি থাকে, তাহলে ৪৮ হাজার কমিটির কাজের হিসাবও থাকতে হবে।
কারণ ডেঙ্গুতে একজন মানুষ মারা গেলে সেটি শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়। আর যদি জানা যায়, প্রতিরোধের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় কাঠামোটি কাগজে ছিল কিন্তু মাঠে ছিল না, তাহলে সেই মৃত্যুর পর প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—ব্যর্থতার দায় নেবে কে?
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবা










পাঠকের মন্তব্য