অভিযুক্তের রাজনৈতিক পরিচয় কি আইনের চেয়ে বড়?

এস এম মেহেদী হাসান

অভিযুক্তের রাজনৈতিক পরিচয় কি আইনের চেয়ে বড়অভিযুক্তের রাজনৈতিক পরিচয় কি আইনের চেয়ে বড়অভিযুক্তের রাজনৈতিক পরিচয় কি আইনের চেয়ে বড়আইনের চোখে সবাই সমান—রাষ্ট্রের এই মৌলিক কথাটি শুনতে যত সহজ, বাস্তবে তা প্রতিষ্ঠা করা তত কঠিন। বিশেষ করে অভিযুক্ত ব্যক্তি যখন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত, কোনো প্রভাবশালী নেতার ঘনিষ্ঠ কিংবা কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিচয় বহন করেন, তখন আইন প্রয়োগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নানা প্রশ্নের মুখে পড়ে। চট্টগ্রাম নগরে কিশোর গ্যাং নেতা হিসেবে পুলিশের তালিকাভুক্ত ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে নগর ভবনে পুলিশ বাধার মুখে পড়া এবং এর পরদিনই খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিমের বদলি সেই পুরোনো প্রশ্নটিই সামনে এনেছে—আইনের চেয়ে কি রাজনৈতিক পরিচয় বড় হয়ে উঠছে?

ঘটনার সূত্রপাত ওয়াকিলকে গ্রেপ্তার করার একটি পুলিশি অভিযানকে কেন্দ্র করে। পুলিশ জানিয়েছিল, তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তাঁকে নগর ভবনে পাওয়া গেছে—এমন খবরের ভিত্তিতে খুলশী থানার পুলিশ সেখানে যায়। পুলিশ ভবনে ঢোকার চেষ্টা করলে মেয়র শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে অভিযানে যাওয়া কর্মকর্তাদের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা অবস্থান করেও পুলিশ ওয়াকিলকে পায়নি। পরে তারা ফিরে যায়।

এর পরদিন মেয়র সাংবাদিকদের কাছে ওয়াকিলকে ‘সন্ত্রাসী নয়’ এবং ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁকে দলের ত্যাগী নেতা বলেও দাবি করেন। একই সঙ্গে খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর পরদিনই ওই ওসিকে খুলশী থানা থেকে সরিয়ে নগর বিশেষ শাখায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

পুলিশ কমিশনার অবশ্য বলেছেন, এটি রুটিন বদলি। একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে এক থানা থেকে অন্যত্র বদলি করা প্রশাসনের স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত। তাই শুধু বদলি হয়েছে বলেই সেটিকে রাজনৈতিক চাপের ফল বলা যায় না। কিন্তু সময়ের হিসাবটি এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। মাত্র এক মাস ১০ দিন আগে খুলশী থানায় যোগ দেওয়া একজন ওসিকে একটি রাজনৈতিক নেতার প্রকাশ্য অভিযোগের পরদিনই সরিয়ে দেওয়া হলে প্রশ্ন উঠবেই। পুলিশের কর্মকর্তাদের মধ্যেও যদি এ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কারণ পুলিশ শুধু সরকারের একটি বাহিনী নয়; রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। একজন পুলিশ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন, আবার সেই অপরাধী কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হলে তাঁকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে পিছিয়ে যেতে হবে—এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ওয়াকিলের বিরুদ্ধে ২৩টি মামলা থাকার কথা পুলিশ জানিয়েছে। অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। একজন কলেজশিক্ষককে তুলে নিয়ে মারধরের অভিযোগে করা মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়েছে। তাঁকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলা এবং পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে কিশোর হৃদয় হত্যার মামলাতেও তাঁর নাম এসেছে। সর্বশেষ প্লট দখল, চাঁদাবাজি ও অপহরণের অভিযোগে করা মামলাতেও তিনি আসামি।

এসব অভিযোগের কোনোটিই তাঁকে আইনগতভাবে অপরাধী প্রমাণ করে না। অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হতে হবে, আদালতে বিচার হতে হবে। এটি যেমন মনে রাখা জরুরি, তেমনি এটাও মনে রাখা দরকার—মামলা আছে বলে কাউকে বিনা বিচারে অপরাধী বলা যাবে না, আবার রাজনৈতিক পরিচয় আছে বলে তাঁকে তদন্তের বাইরে রাখারও সুযোগ নেই।

এখানেই মেয়রের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে এতগুলো মামলা থাকলে তাঁর অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা অবশ্যই আলোচনার বিষয় হতে পারে, কিন্তু সেটি তাঁর বিরুদ্ধে চলমান অভিযোগের তদন্তের বিকল্প নয়। তিনি জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে অংশ নিয়ে থাকলে সেটি তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ। কিন্তু সেই পরিচয়ের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত বন্ধ হয়ে যাবে—এমন কোনো আইন নেই। একইভাবে কেউ কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনে ছিলেন না বলেও তাঁকে হয়রানি করা যাবে না।

‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়কে সম্মান করা আর সেই পরিচয়কে আইনি দায়মুক্তির ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা এক কথা নয়। জুলাইয়ের আন্দোলন যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছিল, তার অন্যতম দাবি ছিল বৈষম্য ও অন্যায়ের অবসান। সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রেও যদি অপরাধের অভিযোগ থাকে, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত তদন্ত হওয়াই বরং সেই আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অন্যদিকে মেয়র ওসি আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করেছেন, সেগুলোকেও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। তিনি অভিযোগ করেছেন, ওসি ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছেন এবং তাঁর আগের দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কিশোর হৃদয় হত্যা মামলায় আসামিকে মারধর করে ওয়াকিল ও তাঁর ভাইয়ের নাম বলানোর অভিযোগও করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি—এ কথাটিও প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে এসেছে। তাই মেয়রের অভিযোগকে সত্য ধরে নেওয়ার যেমন সুযোগ নেই, তেমনি রাজনৈতিক বক্তব্য বলে উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই। অভিযোগ যদি গুরুতর হয়, তদন্ত হোক। তদন্তে ওসি দোষী প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো হোক।

সমস্যা হচ্ছে, তদন্তের বদলে বদলি যদি প্রথম পদক্ষেপ হয়ে যায়, তাহলে ভুল বার্তা যেতে পারে। মাঠপর্যায়ের একজন পুলিশ কর্মকর্তা তখন ভাবতে পারেন, আইন প্রয়োগের আগে তাঁকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার কথাও বিবেচনা করতে হবে। এতে পুলিশের মনোবল কমবে এবং অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে উঠবে।

কিশোর গ্যাংয়ের ক্ষেত্রে এই আশঙ্কা আরও বেশি। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য, দলাদলি, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ওয়্যারলেস কলোনিতে কিশোর হৃদয়ের হত্যাকাণ্ড সেই বাস্তবতার ভয়াবহ দিকটি আবার সামনে এনেছে। একটি কিশোরের প্রাণ চলে গেছে দুটি গোষ্ঠীর বিরোধে—এটাই যদি বাস্তবতা হয়, তাহলে রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে এসব গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেওয়ার যেকোনো প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।

কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি শুধু পুলিশের মুখের কথা হলে চলবে না। রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজেদের ভেতর থেকে অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। কোনো নেতা বা কর্মী যদি অপরাধে জড়িত হন, তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীকে ‘আমাদের লোক’ আর প্রতিপক্ষকে ‘অপরাধী’ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি থেকে রাজনীতিকে বেরিয়ে আসতে হবে।

এই জায়গায় বর্তমান ঘটনার আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াকিলকে তিন মাস আগে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। যদি দল সত্যিই তাঁকে বহিষ্কার করে থাকে, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে দলের পক্ষ থেকে আইনকে সহযোগিতা করাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। রাজনৈতিক সম্পর্ক বা ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা যেন আইনের পথে বাধা না হয়, সেটিই হওয়া উচিত ন্যূনতম রাজনৈতিক দায়িত্ব।

একইভাবে পুলিশেরও আত্মসমালোচনার জায়গা আছে। কোনো অভিযানে যদি আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে, পুলিশের উচিত সেটির নিরপেক্ষ তদন্তে সহযোগিতা করা। অভিযুক্ত ব্যক্তি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের লোক—এই যুক্তিতে পুলিশ কোনো অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে না। আইন প্রয়োগ করতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।

চট্টগ্রামের নগর ভবনের ঘটনাটি তাই একটি বড় প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার মুহূর্ত। সেখানে কে ঠিক, কে ভুল—তা তদন্তেই নির্ধারিত হোক। পুলিশ কি বেআইনিভাবে অভিযান চালিয়েছিল? মেয়রের কার্যালয়ে কি পুলিশকে বাধা দেওয়া হয়েছিল? ওয়াকিল সেখানে ছিলেন কি না? তাঁকে কেন গ্রেপ্তার করা যায়নি? ওসির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কতটা সত্য? আর তাঁর বদলি কি সত্যিই রুটিন সিদ্ধান্ত, নাকি কোনো চাপের ফল? এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।

সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্ব এখন বিষয়টিকে আরও পরিষ্কার করা। একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত করুন, প্রয়োজন হলে ব্যবস্থা নিন। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক নেতার প্রকাশ্য বক্তব্যের পরপরই তাঁকে সরিয়ে দিয়ে যদি তদন্তের প্রয়োজনীয়তাই এড়িয়ে যাওয়া হয়, তাহলে মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হবে। আবার কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও শুধু তিনি অভিযান চালিয়েছেন বলে তাঁকে নির্দোষ ধরে নেওয়াও ঠিক হবে না।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মূল কথা খুব কঠিন কিছু নয়। অপরাধের অভিযোগ যার বিরুদ্ধেই থাকুক, তদন্ত হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে বিচার হবে। প্রমাণ না থাকলে তিনি মুক্ত থাকবেন। পুলিশ তার দায়িত্ব পালন করবে, আদালত তার দায়িত্ব পালন করবে, রাজনীতিকেরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করবেন। কেউ কারও জায়গা দখল করবেন না।

চট্টগ্রামের এই ঘটনায় সেটিই সবচেয়ে জরুরি। একজন ‘কিশোর গ্যাং নেতা’কে বাঁচাতে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক অভিযোগের কারণে সরিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়। উভয় ক্ষেত্রেই প্রয়োজন প্রমাণ, তদন্ত ও জবাবদিহি।

মানুষ শেষ পর্যন্ত খুব বেশি কিছু চায় না। তারা চায় অপরাধী যে দলেরই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হোক। পুলিশ যে দলেরই হোক বা যে সরকারের অধীনেই কাজ করুক, তারা যেন আইনের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করে। আর রাজনৈতিক নেতারা যেন নিজেদের প্রভাব ব্যবহার করে আইন প্রয়োগের পথে বাধা না হন।

‘জুলাই যোদ্ধা’ হোন কিংবা ‘কিশোর গ্যাং নেতা’—কোনো পরিচয়ই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আবার কোনো পুলিশ কর্মকর্তার পদ বা ক্ষমতাও তাঁকে জবাবদিহির বাইরে রাখে না। রাষ্ট্রের শক্তি এখানেই যে, ব্যক্তি নয়, আইনই শেষ কথা। চট্টগ্রামের এই ঘটনা যদি সেই সত্যটি আরও একবার প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ তৈরি করে, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক ফল।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক

মুক্তিবাণী

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও