চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু, ভিড় নিয়ন্ত্রণে গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন (ভিডিও সহ)

মুক্তিবাণী অনলাইন ডেক্স

চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু, ভিড় নিয়ন্ত্রণে গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন

অপরিসর রাস্তা, তার মধ্যেই থিমের ঝলকানি আর দর্শনার্থীদের ঢল। চোরবাগানে এর আগেও একাধিক বার ভিড় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে। বন্ধ রাখতে হয়েছে প্রতিমাদর্শন। তবে সে বার পুলিশের তৎপরতায় পরিস্থিতি সামাল দিয়ে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। এ বার আর তা হল না। পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ গেল ১৯ জনের।

কী ভাবে ঘটল দুর্ঘটনা? রবিবার ভবানীভবনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, শনিবার রাতে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তাঁর মনে হয়েছে, মণ্ডপের ভিতরে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। তা হলে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হত।

কলকাতা পুলিশের অনেক আধিকারিকই বিভিন্ন সময়ে চোরবাগানের ভিড় সামলেছেন। তাঁদের একাংশের মতে, উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি পুলিশের তরফেও গাফিলতি ছিল। এক পুলিশকর্তার এখনও মনে আছে ২০১৮ সালের কথা। সে বারও পূজা উদ্বোধনের পর থেকেই চোরবাগানে ভিড় বাড়তে শুরু করেছিল। তার সঙ্গে ছিল বৃষ্টি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ঠেকাতে দ্রুত মণ্ডপে প্রবেশের পথ বদলে দেয় পুলিশ।

সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের গিরিশ পার্কমুখী অংশ থেকে লাইন শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ, সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ও মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের সংযোগস্থলের (সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের পূর্ব দিকের অংশ) ঠিক বিপরীত দিক থেকে দর্শনার্থীদের লাইন শুরু হয়। সেখান থেকে তাঁদের সোজা নিয়ে যাওয়া হয় গিরিশ পার্ক মোড়ের দিকে। সেখানে রাস্তা পেরিয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের ধর্মতলাগামী অংশ ধরে পৌঁছনো যেত মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের সংযোগস্থলে।

দর্শনার্থীদের প্রায় এক কিলোমিটারের বেশি পথ ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, যাতে একসঙ্গে অনেক মানুষ মুক্তারামবাবু স্ট্রিট ও অমর বসু সরণির মতো গলিসদৃশ রাস্তায় ঢুকে না পড়েন। প্রবেশের পথ দীর্ঘ করার পাশাপাশি তিন থেকে চারটি জায়গায় লাইন আটকে রাখার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি মানুষ যাতে একসঙ্গে মণ্ডপে ঢুকতে না পারেন। বেরোনোর সময় দর্শনার্থীদের পার্বতী ঘোষ লেন দিয়ে বিধান সরণির দিকে পাঠানো হয়েছিল, যাতে মণ্ডপ থেকে বেরিয়ে আসা মানুষের ঢল প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা ভিড়ের সঙ্গে মিশে না যায়।

২০১৮ সালের পর ২০২২ সালেও ভিড় বাড়তে দেখে আশঙ্কা করেছিলেন চোরবাগানের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়। সে বার সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। জয়ন্তের অভিযোগ, রাজ্যে পালাবদলের পর তাঁকে সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু,

রবিবার টেলিফোনে গণমাধ্যম ডট কমকে জয়ন্ত বলেন, ‘‘আমি দায়িত্বে থাকাকালীন লাইনে বার বার দড়ি দিয়ে ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতাম, যাতে একসঙ্গে সবাই গলির মধ্যে পৌঁছোতে না পারে।’’ বর্তমান উদ্যোক্তারা সমস্ত সতর্কতা উপেক্ষা করেছেন বলেই এ বার এমন ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ তাঁর। এ জন্য শিল্পীকেও দায়ী করেছেন তিনি। জয়ন্তের মতে, চোরবাগানের মতো ছোট জায়গায় ৩৬০ ডিগ্রি ঘোরানো নকশা এবং মণ্ডপের মধ্যে উড়ালপথ তৈরি করা বিপজ্জনক। তাঁর অভিযোগ, এতে মণ্ডপ ভেঙে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারত।

জয়ন্তের দাবি, ‘‘মণ্ডপের মাঠের তলার মাটি ইঁদুর ফোঁপরা করে দিয়েছে। সেখানে সঠিক পদ্ধতি মেনে ইট দিয়ে ভরাট না করে কাঠের তক্তা পেতে মণ্ডপ খাড়া করা হয়েছে।’’ ভিড়ের চাপে মাটি বসে যাওয়ায় মণ্ডপও বসে গিয়েছিল বলে অভিযোগ তাঁর।

দুর্ঘটনা কী ভাবে ঘটল, তা নিয়ে রবিবার ভবানীভবনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, শনিবার রাতে দুর্ঘটনাস্থল দেখে তাঁর মনে হয়েছে, মণ্ডপের ভিতরে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। তা হলে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হত। শুভেন্দুর কথায়, ‘‘চোরবাগানের মণ্ডপে ঢোকা এবং বেরোনোর রাস্তা আলাদা নয়। প্রবেশ এবং প্রস্থান একই পথ দিয়ে কেবলমাত্র দড়ি দিয়ে রাস্তা দু’টো অংশে ভাগ করে করা হয়েছিল। যাদের দড়ি ধরে দাঁড়ানোর দায়িত্ব ছিল, সেই অস্থায়ী সিভিক ভলান্টিয়ারেরা বৃষ্টিতে দড়ি ফেলে চলে যায়।’’ প্রবেশ ও প্রস্থানের সময় দর্শনার্থীদের ভিড় এক হয়ে যাওয়াই বিপত্তির কারণ বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

চোরবাগানের থিমশিল্পী সুশান্ত পাল অবশ্য জয়ন্তের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘শিল্পী হিসেবে আমি প্রথমেই খেয়াল রাখি যে, স্ট্রাকচারে যেন কোনওরকম সমস্যা না হয়। কারণ, প্রচুর মানুষের সমাগম হয়। এয়ার সার্কুলেশনের দিকটা খেয়াল রাখতে হয়।’’ তাঁর দাবি, সমস্ত সুরক্ষাবিধি মেনেই মণ্ডপ তৈরি করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশ মেনে প্রবেশ, প্রস্থান ও আপৎকালীন পরিস্থিতির জন্য আলাদা দরজাও রাখা হয়েছিল বলে দাবি সুশান্তের।

কলকাতা পুলিশের অন্দরেই প্রশ্ন উঠেছে, চোরবাগানের মতো ছোট জায়গায় লোহার গ্রিলে ঘেরা উড়ালপথের মতো থিম বা মণ্ডপ কী ভাবে কলকাতা পুলিশ ও দমকলের ছাড়পত্র পেল। পুলিশের একাংশের আশঙ্কা, এমন কাঠামো যে কোনও সময় বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, দুর্ঘটনার সময় প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। সে কারণে অনেক দর্শনার্থী মণ্ডপ থেকে না-বেরিয়ে ভিতরেই দাঁড়িয়ে পড়েন। একই সময়ে যাঁরা মণ্ডপে ঢোকার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে তাঁরাও ভিতরে ঢুকে পড়েন। পর্যাপ্ত নিরাপত্তারক্ষী না থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই মণ্ডপের ভিতরে ভিড় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং দমবন্ধ করা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

স্থানীয়দের একাংশের দাবি, মণ্ডপে ঠেলাঠেলি শুরু হওয়ার পরেই মাইকে ঘোষণা করা হয়, ‘‘এগ্‌জ়িট গেট খুলে দাও, মানুষকে বেরোতে দাও। মণ্ডপ থেকে বেরিয়ে যান। মণ্ডপ ভেঙে গিয়েছে। অবস্থা খুব খারাপ। মণ্ডপের দিকে আসবেন না।’’

সমাজমাধ্যমে ওই ঘোষণার একটি ভিডিয়োও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ভিডিয়োটির সত্যতা যাচাই করেনি গণমাধ্যম ডট কম। ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, মাইকে ঘোষণা চলাকালীন হাতেগোনা দু’জন পুলিশকর্মী ক্রমাগত বাঁশি বাজিয়ে ভিড়ের মধ্যে থেকে মানুষকে বাইরে পাঠানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু প্রবেশ ও প্রস্থানের ভিড় তখন একাকার। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, এর পরেই ঠেলাঠেলি হুড়োহুড়িতে পরিণত হয়। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং একের পর এক মানুষ পদপিষ্ট হন।

ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও কে ওই ঘোষণা করে আতঙ্ক ছড়িয়েছিলেন, তার উত্তর মেলেনি। চোরবাগানের ঘটনায় ধৃত সাত জনকে আদালতে পেশ করার সময় সরকারি আইনজীবীও ওই ঘোষণার প্রসঙ্গ তোলেন।

দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজের সময় পুলিশ ছিল না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়দের একাংশ। তবে সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘আমি দু’জন আহতের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁরা জানিয়েছেন পুলিশ অ্যাপ ক্যাব জোগাড় করে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে।’’

রবিবার রাতে মুখ্যমন্ত্রী উদ্যোক্তাদের ত্রুটি ছিল বলে মন্তব্য করলেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে কোনও প্রশ্ন তোলেননি। তাঁর নিশানায় ছিল বিগত জমানায় নিযুক্ত অস্থায়ী হোমগার্ডেরা।

তবে মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন কলকাতা পুলিশের একাংশ। তাঁদের মতে, পুজোর ছাড়পত্র দেওয়া থেকে শুরু করে ভিড় বাড়লে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নির্ধারণের দায় পুলিশেরও। স্থানীয়দের দাবি, তৃতীয়া থেকেই চোরবাগানে উপচে পড়ছিল ভিড়। তার পরেও কেন পুলিশ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিল না? কেন ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা হল না? প্রবেশ ও প্রস্থানের ভিড় যাতে এক হয়ে না যায়, সেই ব্যবস্থা কেন করা হয়নি? অতিরিক্ত বাহিনীই বা কেন মোতায়েন করা হয়নি? পুলিশের অন্দরেই উঠছে এই প্রশ্নগুলি।

আলোচনা যত এগোচ্ছে, পূজা সামলানোর ক্ষেত্রে শীর্ষ আধিকারিকদের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার ঘাটতি ততই সামনে আসছে। কলকাতার একাধিক বড় পূজা সামলানো এক সহকারী কমিশনারের কথায়, ‘‘কলকাতা পুলিশের শীর্ষপদে এখন যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে একজন ছাড়া কারও মহানগরের পূজা সামলানোর অভিজ্ঞতা নেই।’’ তাঁর ইঙ্গিত, এই অনভিজ্ঞতারই প্রতিফলন ঘটেছে চোরবাগানের ঘটনায়।

রাজ্যে পালাবদলের পর থানার স্তরে ব্যাপক রদবদল করা হয়েছিল। পুলিশের একাংশের মতে, বর্তমানে বিভিন্ন থানায় এমন আধিকারিক রয়েছেন, যাঁদের কলকাতার পূজা সামলানোর অভিজ্ঞতা সীমিত।

রাজ্যে পালাবদলের পর চোরবাগান ক্লাবের অন্দরেও একাধিক পরিবর্তন হয়েছে। পুজোর চেয়ারম্যান হয়েছেন জোড়াসাঁকোর বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা। মুখ্য পরামর্শদাতার দায়িত্বে রয়েছেন উত্তর কলকাতার বিজেপি নেতা তমোঘ্ন ঘোষ। প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নাম রয়েছে দেবদীপ অধিকারীর। কালীঘাটপন্থী তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর এক্স পোস্টে দেবদীপকে মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো বলে দাবি করেছেন। অন্য দিকে, রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের কথায়, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো নাবালক।’’

কলকাতা পুলিশের একাধিক আধিকারিক এই নামগুলির দিকে ইঙ্গিত করে জানিয়েছেন, বিভিন্ন জমানাতেই রাজনৈতিক প্রভাবে পূজা কমিটিগুলি নিয়ম ভেঙে ছাড় পেয়ে যায়। তবে তাঁদের মতে, তার পরেও পুলিশের আরও তৎপর হওয়া প্রয়োজন ছিল।

চোরবাগানের ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি পুলিশকে দোষারোপ করেননি। তবে কলকাতায় দীর্ঘদিন সাফল্যের সঙ্গে কাজ করা দুই আইপিএস আধিকারিককে স্বাধীন ভাবে, পুলিশ কমিশনারকে রিপোর্ট না করে, শহরের বিভিন্ন পূজা ঘুরে নিরাপত্তা-সহ সব দিক খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর এই নির্দেশ থেকে পুলিশের গাফিলতি ছিল বলে ইঙ্গিত মিলছে বলে মনে করা হচ্ছে।

অন্য দিকে, কলকাতার পূজা সামলানোর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ন’জন আইপিএস আধিকারিককে অস্থায়ী ভাবে লালবাজারে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। গিরিশ পার্কের অফিসার-ইন-চার্জের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই লালবাজারের কন্ট্রোল রুমে হাজির হন। তার আগে দুপুরে তিনি বলেছিলেন, ‘‘শহরের অবস্থা চোখ দিয়ে দেখা উচিত, কান দিয়ে নয়।’’

monir
Admin

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও