জনপ্রতিনিধির পদ কোনো ঢাল নয়, দলীয় পরিচয় যেন অপরাধের লাইসেন্স না হয়

ছবি মুক্তিবাণী
ছবি মুক্তিবাণী
এস এম মেহেদী হাসান

রাজনীতিতে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি হলো নিজের দলের লোকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। ক্ষমতায় থাকা কোনো দলের জন্য তো আরও বেশি। কারণ, রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় সম্পর্ক কিংবা জনপ্রতিনিধির অবস্থান অনেক সময় অভিযোগের বিষয়কে জটিল করে তোলে। সেখানে কোনো দলের একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়।

ছবি মুক্তিবাণী

মিরপুরের রাড্ডা মা ও শিশুস্বাস্থ্যকেন্দ্রের হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ সেই কারণেই শুধু একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগের ঘটনা নয়। এর একটি বড় রাজনৈতিক তাৎপর্যও আছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বুধবার রাতে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ফেরদৌসী আহমেদকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। এর পরদিন তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ও তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে অপরাধী হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেছেন, তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে এবং সে অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি আইনের নিজস্ব প্রক্রিয়াটিও চলবে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এটাই স্বাভাবিক হওয়া উচিত।

তবে রাজনৈতিক দায়ের প্রশ্নটি আলাদা।

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের নাম সামনে এসেছে। তাঁদের মধ্যে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের নামও এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা কতটা, কার কী ভূমিকা ছিল, তা তদন্তেই পরিষ্কার হবে। কিন্তু একজন জনপ্রতিনিধির ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তাঁর রাজনৈতিক দায় ও অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।

ফেরদৌসী আহমেদের পদত্যাগের সবচেয়ে বড় দিকটি এখানেই।

একজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত বা মনোনীত হওয়ার পর তাঁর দায়িত্ব শুধু সংসদে বসা নয়। তাঁর সঙ্গে একটি দলের ভাবমূর্তি, সরকারের গ্রহণযোগ্যতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থার বিষয়টিও জড়িত। তাঁর আশপাশের কেউ অপরাধে জড়িত হলে তিনি সরাসরি অপরাধী হয়ে যান না। কিন্তু অভিযোগ গুরুতর হলে এবং তদন্তে তাঁর রাজনৈতিক বা অন্য কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে দায় এড়ানোর সুযোগও থাকা উচিত নয়।

বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একটি বিষয় দেখতে চেয়েছে—আইন সবার জন্য সমান কি না। সাধারণ একজন মানুষ অপরাধ করলে যদি মামলা, গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কেউ একই ধরনের অভিযোগে পড়লে তাঁর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম কার্যকর হবে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সেই জায়গা থেকে মিষ্টির পদত্যাগ একটি বার্তা বহন করে। সেই বার্তাটি শুধু ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির জন্য নয়। এটি বিএনপির সব সংসদ সদস্য এবং দলের সব পর্যায়ের জনপ্রতিনিধির জন্যও প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

বার্তাটি খুব সহজ—জনপ্রতিনিধির পদ কোনো ঢাল নয়।

কেউ এমপি হলেই তাঁর চারপাশের মানুষ অপরাধ করলে সেটি উপেক্ষা করা হবে না। কেউ দলীয় নেতা হলেই তদন্তের বাইরে থাকবেন না। আবার কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে অপরাধীও বানানো যাবে না। তদন্ত হবে, প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে। এই দুই বিষয় একই সঙ্গে নিশ্চিত করাই একটি দায়িত্বশীল সরকারের কাজ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন, এই সরকারের সময়ে কোনো অপরাধী ছাড় পাবে না। অপরাধ প্রমাণিত হলে সবার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে। কথাটির বাস্তব মূল্য তখনই তৈরি হবে, যখন এর প্রয়োগ দল-মত, পদ-পদবি ও রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে দেখা যাবে।

কারণ, মানুষের প্রত্যাশা এখন অনেক পরিষ্কার। তারা শুধু উন্নয়ন বা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা জবাবদিহিও দেখতে চায়। ক্ষমতায় থাকা দলের একজন কর্মী বা নেতা অন্যায় করলে তাঁর বিরুদ্ধে দল কী করছে, সরকার কী করছে এবং আইন কী করছে—এসবও মানুষ দেখতে চায়।

বিএনপির জন্য এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দলটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে। এখন তাদের সামনে শুধু দেশ পরিচালনার চ্যালেঞ্জ নেই, নিজেদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি করার সুযোগ আছে।

ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতা-কর্মী বা জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে দল যদি তদন্তের পথ খোলা রাখে, প্রয়োজন হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয় এবং একই সঙ্গে আইনের নিজস্ব প্রক্রিয়াকে স্বাধীনভাবে চলতে দেয়, তাহলে সেটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে পারে।

অন্যদিকে দলীয় পরিচয়ের কারণে অভিযোগ চাপা দেওয়া হলে তার ক্ষতি শুধু একজন ব্যক্তির নয়, পুরো দলের। কারণ, একজন জনপ্রতিনিধির আচরণের দায় শেষ পর্যন্ত দলের ওপরও এসে পড়ে।

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনাটিও তাই শুধু একটি ভবন ভাঙচুর বা জমি নিয়ে বিরোধের ঘটনা হিসেবে দেখলে বিষয়টি ছোট করে দেখা হবে। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত। সেখানে হামলা, লুটপাট বা ভাঙচুরের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। কারা এ ঘটনায় জড়িত, কেন ঘটনা ঘটেছে, এর পেছনে কারা ছিলেন এবং কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে সরকারকে একটি বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যেন তদন্তের বিকল্প না হয়ে যায়। ফেরদৌসী আহমেদের পদত্যাগ রাজনৈতিকভাবে একটি বার্তা দিতে পারে, কিন্তু অপরাধের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়া। এ দুটিকে আলাদা রাখাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে জরুরি।

একইভাবে তদন্তের নামে কাউকে হয়রানি করাও কাম্য নয়। আবার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে ছাড় দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।

এই ভারসাম্যই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন।

ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের ঘটনা তাই বিএনপির জন্য একটি পরীক্ষাও বটে। এই সিদ্ধান্ত যদি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এর রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে যাবে। কিন্তু যদি এখান থেকে একটি পরিষ্কার নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়—দলের যে-ই হোক, জনপ্রতিনিধি যে-ই হোক, অন্যায় বা অপরাধের অভিযোগ উঠলে তদন্ত হবে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে—তাহলে এর প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে।

বাংলাদেশের মানুষ এমন রাজনীতিই দেখতে চায়, যেখানে ক্ষমতা মানুষকে আইনের ঊর্ধ্বে তুলে দেয় না। এমপি, মন্ত্রী, নেতা কিংবা কর্মী—কেউই যেন নিজের পরিচয়কে অন্যায় করার লাইসেন্স মনে না করেন।

একজন মিষ্টির পদত্যাগ তাই এখানেই শেষ হওয়ার কথা নয়। এটি যদি সত্যিই একটি রাজনৈতিক বার্তা হয়ে থাকে, তাহলে সেই বার্তা বিএনপির প্রতিটি সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি ও নেতা-কর্মীর কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন।

রাজনীতিতে ক্ষমতা পাওয়া বড় বিষয়। কিন্তু ক্ষমতায় থেকেও নিজের দলের অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেওয়া আরও বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।

শেষ পর্যন্ত মানুষের চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়—যে অন্যায় করবে, তার পরিচয় নয়, অন্যায়টাই যেন বিবেচনায় নেওয়া হয়। আর অপরাধ প্রমাণিত হলে যেন কাউকে ছাড় দেওয়া না হয়।

ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ যদি শুধু একটি ঘটনা হয়, তাহলে কাল তা ভুলে যাবে। কিন্তু এটি যদি বিএনপির রাজনীতিতে একটি স্থায়ী নীতিতে পরিণত হয়—যে-ই হোক, যে দলেরই হোক, অভিযোগ হলে তদন্ত হবে, অপরাধ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা হবে—তবেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রকৃত পরিবর্তন শুরু হবে। জনগণ এখন শুধু উন্নয়নের হিসাব চায় না, জবাবদিহির হিসাবও চায়। অপরাধীর পরিচয় বড় নয়, অপরাধটাই বড়। আর আইন যদি সবার জন্য সমান না হয়, তবে ক্ষমতার প্রতি জনগণের আস্থাও কোনোদিন টিকবে না। তাই মিষ্টির পদত্যাগ যেন শেষ না হয় একটি খবরে; শুরু হয় একটি নীতিতে—জনপ্রতিনিধির পদ কোনো ঢাল নয়, দলীয় পরিচয় কখনোই অপরাধের লাইসেন্স নয়।

মুক্তিবাণী

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও