গুগল ফরমে জীবনসঙ্গী খুঁজছেন অ্যারিন, আবেদন ২৪০ পুরুষের

এস এম মেহেদী হাসান

গুগল ফরমে জীবনসঙ্গী খুঁজছেন অ্যারিন, আবেদন ২৪০ পুরুষের

স্বামী হতে চান? আত্মীয়ের হাতে বায়োডাটা পাঠানো বা ডেটিং অ্যাপে ঘোরার দরকার নেই। একটি গুগল ফরম পূরণ করলেই হবে। এরপর আপনার আবেদন বিবেচনা করা হবে!

শুনতে চাকরির আবেদনপত্রের মতো লাগলেও ঘটনাটি সত্যি। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনার শার্লটের ৩৬ বছর বয়সী অ্যারিন প্যাটারসন জীবনসঙ্গী খুঁজতে এমনই অভিনব পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। তিনি তৈরি করেছেন ‘হাজব্যান্ড অ্যাপ্লিকেশন’ বা ‘স্বামীর আবেদনপত্র’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফরমটির লিংক শেয়ার করার পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত ২৪০ জনের বেশি পুরুষ সেখানে আবেদন করেছেন।

গুগল ফরমে জীবনসঙ্গী খুঁজছেন অ্যারিন, আবেদন ২৪০ পুরুষের

প্যাটারসন অবিবাহিত। প্রচলিত ডেটিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের অভিজ্ঞতায় তাঁর মনে হয়েছে, এসব প্ল্যাটফর্মে অনেক সময় নষ্ট হয়। অনেকের সঙ্গে কথা বলার পরও বোঝা যায়, সম্পর্ক নিয়ে তাঁদের উদ্দেশ্য বা প্রত্যাশা এক নয়। তাই সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী সম্পর্কে শুরুতেই কিছু তথ্য জানার জন্য নিজের মতো করে প্রশ্ন সাজিয়ে গুগল ফরমটি তৈরি করেছেন তিনি।

ফরমটিতে পেশাগত লক্ষ্য, দৈনন্দিন জীবনযাপন, ব্যক্তিগত অভ্যাস, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, বিয়ে ও পারিবারিক জীবন সম্পর্কে ধারণা জানতে চাওয়া হয়েছে। আবেদনকারীরা নিজেদের প্রত্যাশার পাশাপাশি কোন বিষয়গুলো তাঁরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারবেন না, সেটিও জানাতে পারেন।

প্যাটারসন জানিয়েছেন, তিনি এমন একজন সুদর্শন, বুদ্ধিমান, দয়ালু, বিশ্বস্ত ও উদার পুরুষের সঙ্গে পরিচিত হতে চান, যিনি কফি বা রাতের খাবারের জন্য দেখা করতে এবং মন খুলে কথা বলতে আগ্রহী। এরপর সম্পর্ক কোন দিকে যায়, তা সময়ের ওপর ছেড়ে দিতে চান।

ঘটনাটি মজার হলেও এতে আধুনিক সম্পর্কের একটি বাস্তব চিত্র দেখা যায়। প্রযুক্তি মানুষের জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ঢুকে পড়েছে। বিয়ে ও জীবনসঙ্গী খোঁজার ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়বে, সেটাই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশেও বিয়ে নিয়ে মানুষের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন এসেছে। তবে পরিবার ও অভিভাবকের মাধ্যমে বিয়ের প্রচলন এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী। এর বড় একটি কারণ হলো, বিয়ে শুধু দুজন মানুষের সম্পর্ক নয়; অনেক সময় এটি দুটি পরিবারেরও সম্পর্ক।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার হিসাবেও নারী-পুরুষের মধ্যে খুব বড় পার্থক্য নেই। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি ৯৮ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ প্রায় ৮ কোটি ৪১ লাখ এবং নারী প্রায় ৮ কোটি ৫৬ লাখ। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ পুরুষ এবং ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ নারী। এই সংখ্যাগত ভারসাম্যের মধ্যেও জীবনসঙ্গী নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে সমাজে নানা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

বিশেষ করে শহুরে তরুণদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডেটিং প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বেড়েছে। এতে কিছু সুবিধা আছে: নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া সহজ হয় এবং নিজের পছন্দের মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়। তবে ঝুঁকিও কম নয়।

ডেটিং প্ল্যাটফর্মে পরিচয় যাচাই বড় একটি সমস্যা হতে পারে। অনলাইনে একজন মানুষ নিজের সম্পর্কে যা বলছেন, তার সবকিছু সত্যি কি না, তা বোঝা সব সময় সহজ নয়। ছবি অন্য কারও হতে পারে, চাকরি বা শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়া হতে পারে। এমনকি কেউ নিজের বৈবাহিক অবস্থাও গোপন করতে পারেন।

এর সঙ্গে আছে প্রতারণার ঝুঁকি। অনলাইনে পরিচয়ের পর আবেগের সম্পর্ক তৈরি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে। ব্যক্তিগত ছবি, ফোন নম্বর বা অন্য তথ্য শেয়ার করার পর সেগুলোর অপব্যবহারের আশঙ্কাও থাকে।

আরেকটি সমস্যা হলো, ডেটিং প্ল্যাটফর্মে মানুষ অনেক সময় নিজের পছন্দমতো একটি ‘প্রোফাইল’ তৈরি করেন। বাস্তবের মানুষ আর অনলাইনের প্রোফাইল সব সময় এক হয় না। ফলে শুরুতে তৈরি হওয়া প্রত্যাশার সঙ্গে পরে বাস্তবতার বড় পার্থক্য দেখা দিতে পারে।

তাহলে কি প্রেমের বিয়ে খারাপ?

এমন সরল সিদ্ধান্তে যাওয়া অবশ্যই ঠিক হবে না। ভালোবাসা থেকে তৈরি হওয়া সম্পর্কও সফল হতে পারে। তবে বিয়ের মতো দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তে শুধু আবেগের ওপর নির্ভর না করে বাস্তব বিষয়গুলোও বিবেচনা করা জরুরি।

এখানেই পারিবারিকভাবে বিয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। পরিবার থেকে প্রস্তাব এলে সাধারণত দুই পক্ষের পরিবার, শিক্ষা, পেশা, সামাজিক পরিবেশ ও পারিবারিক সম্পর্কসহ নানা বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার সুযোগ থাকে। ছেলে বা মেয়ে সম্পর্কে শুধু তাঁর নিজের বক্তব্য নয়, তাঁর পরিবার ও পরিচিতজনদের কাছ থেকেও কিছু তথ্য পাওয়া যায়।

অভিভাবকদের মতামতও তাই একেবারে উপেক্ষা করা উচিত নয়। তাঁরা সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত দেবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তাঁরা অনেক কিছু বুঝতে পারেন, যা আবেগের সময় একজন তরুণ-তরুণীর চোখ এড়িয়ে যেতে পারে।

বিয়ের সিদ্ধান্তে ছেলে-মেয়ের পছন্দের সঙ্গে পরিবারের মতামতের সমন্বয় থাকলে সবচেয়ে ভালো হয়। পছন্দের মানুষকে বিয়ে করতে চাইলে তাঁর পরিবার, চরিত্র, দায়িত্ববোধ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সামাজিক আচরণ সম্পর্কে যথেষ্ট খোঁজ নেওয়া দরকার। একইভাবে, পারিবারিকভাবে বিয়ের ক্ষেত্রেও ছেলে-মেয়ের সম্মতি ও পছন্দকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বিয়ে কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। আবার কয়েক মাসের পরিচয় বা অনলাইনে কথাবার্তার ওপর ভিত্তি করে জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

অ্যারিন প্যাটারসনের গুগল ফরমের ঘটনাটি তাই শুধু হাসির গল্প নয়। এটি দেখায়, মানুষ জীবনসঙ্গী খোঁজার ক্ষেত্রেও এখন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। তবে প্রযুক্তি পরিচয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে, মানুষের চরিত্রের নিশ্চয়তা দিতে পারে না।

গুগল ফরমে ২৪০ জন পুরুষ আবেদন করেছেন—সংখ্যাটি হয়তো কৌতূহল তৈরি করেছে। কিন্তু জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর সংখ্যা নয়, মানুষটি কেমন, সেটিই শেষ কথা।

বিয়ে কোনো চাকরি নয় যে সিভি দেখে নিয়োগ দেওয়া হবে। আবার এমন সম্পর্কও নয়, যার ভবিষ্যৎ শুধু আবেগ দিয়ে গড়ে তোলা যায়।

প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে, পরিচয় হতে পারে, ভালোবাসাও হতে পারে। তবে বিয়ের আগে মানুষটিকে জানার পাশাপাশি পরিবার, অভিভাবক এবং বাস্তব জীবনের পরিচিতির বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

শেষ পর্যন্ত জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার সবচেয়ে নিরাপদ পথ হয়তো কোনো একটি পদ্ধতির মধ্যে নেই। প্রয়োজন পছন্দ, পারস্পরিক সম্মতি, সময় নিয়ে পরিচিত হওয়া এবং পরিবারের অভিজ্ঞ মতামতের সমন্বয়।

কারণ গুগল ফরমে স্বামী হওয়ার আবেদন করা যায়, কিন্তু একজন ভালো জীবনসঙ্গী কেমন হবেন, তা কোনো ফরমের উত্তরে নিশ্চিত করা যায় না।

মুক্তিবাণী

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও