যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলে ভারত সাধারণত খুব বেশি প্রকাশ্যে কথা বলে না। মতবিরোধ থাকলেও কূটনীতির ভাষায় তা সামলানোর চেষ্টা করে। বিশেষ করে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরেই হিসাবি অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু সেই ভারতই এখন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির সমালোচনা করছে প্রকাশ্যে।
প্রশ্ন হচ্ছে, হঠাৎ কেন এই পরিবর্তন?
![]()
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে এর কিছুটা উত্তর পাওয়া যায়। নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি, পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক এবং সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যে এমন একটি বার্তা স্পষ্ট—দুই দেশের সম্পর্ক আগের মতো মসৃণ নেই।
এটি নিছক কূটনৈতিক কথার পরিবর্তন নয়। এর পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে।
প্রথম কারণ বাণিজ্য।
যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদারদের একটি। ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ হাজার ৯১০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ভারতের পক্ষে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ৫ হাজার ৮৪০ কোটি ডলার। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি ভারতের জন্য সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ধরনের নীতির সঙ্গে ভারতের স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়াটা তাই অস্বাভাবিক নয়। যুক্তরাষ্ট্র যখন শুল্ক বাড়ায় বা ভারতীয় পণ্যের বাজারে প্রবেশ কঠিন করে, তখন তার প্রভাব শুধু ব্যবসায়ীদের ওপর পড়ে না; ভারতের উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি আয়েও চাপ তৈরি হয়।
ভারতের জন্য আরও কঠিন বিষয় হলো কৃষি।
কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার কথা বলে ভারত বহু বছর ধরে কৃষি খাতকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত রেখেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারত তার বাজার আরও উন্মুক্ত করুক। বিশেষ করে কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্যের বাজারে শুল্ক কমানোর চাপ রয়েছে। ভারতের জন্য এটি সহজ সিদ্ধান্ত নয়। কারণ দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা কৃষির সঙ্গে যুক্ত।
তাই নয়াদিল্লির কাছে বিষয়টি শুধু একটি বাণিজ্যচুক্তির হিসাব নয়। এর সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও জড়িয়ে আছে।
আরেকটি বড় বিষয় রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক।
রাশিয়া থেকে ভারত দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি কিনছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পরও এই নীতি পুরোপুরি বদলায়নি। কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়াতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপ ভারতের জন্য নতুন অস্বস্তি তৈরি করেছে। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপের হুমকি বা ব্যবস্থা নয়াদিল্লির কাছে শুধু অর্থনৈতিক চাপ নয়, কৌশলগত চাপও।
এখানে ভারতের পুরোনো পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টিও মনে রাখা দরকার। ভারত ঐতিহাসিকভাবেই কোনো একটি শক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে চায় না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাশিয়া, ইউরোপ, ইরান, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গেও সম্পর্ক ধরে রাখতে চায় ভারত।
অর্থাৎ দিল্লি এখন হয়তো ওয়াশিংটনকে বোঝাতে চাইছে—বন্ধুত্ব থাকবে, সহযোগিতাও থাকবে, কিন্তু ভারতের নিজস্ব স্বার্থও আছে।
পাকিস্তান প্রসঙ্গটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানকে নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখে। বিশেষ করে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ নিয়ে নয়াদিল্লির অবস্থান কঠোর। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যখন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করে, তখন ভারত স্বস্তিতে থাকে না।
জয়শঙ্করের বক্তব্যে এই অস্বস্তির কথাই প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট সংবেদনশীলতা দেখাচ্ছে না।
তবে এর পেছনে শুধু পররাষ্ট্রনীতি দেখলে পুরো ছবিটা পাওয়া যাবে না। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে দেশে এমন অভিযোগ রয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে ভারত অনেক ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে। বিরোধী দলগুলোও বিষয়টি নিয়ে মোদি সরকারের সমালোচনা করছে।
ফলে মোদি সরকারের জন্য এখন একটি ভারসাম্য তৈরি করা জরুরি। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা যাবে না। অন্যদিকে দেশের মানুষের কাছেও দেখাতে হবে যে ভারত তার জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে নিজের অবস্থানে অটল।
এই জায়গাতেই জয়শঙ্করের বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।
এত দিন ভারত যদি নীরবে কূটনৈতিক পথে বিষয়গুলো সামলে থাকে, এখন প্রকাশ্যে কথা বলার অর্থ হতে পারে—দিল্লি ওয়াশিংটনকে কিছু বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে। বিশেষ করে যখন শুল্ক, রাশিয়ার তেল এবং পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে ভারতের উদ্বেগ বাড়ছে।
তবে এটাকে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার লক্ষণ বলার সুযোগ নেই।
বরং বাস্তবতা হলো, দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ এতটাই বড় যে মতবিরোধ থাকলেও সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা কম। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারত গুরুত্বপূর্ণ একটি বাজার ও কৌশলগত অংশীদার। অন্যদিকে চীনকে মোকাবিলা, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতেরও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজন।
সমস্যা হচ্ছে, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক মানেই সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়। বরং বড় দেশগুলোর সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত থাকবেই। প্রশ্ন হলো, সেই সংঘাত কীভাবে সামলানো হচ্ছে।
ভারতের বর্তমান অবস্থান থেকে মনে হচ্ছে, নয়াদিল্লি এখন আগের চেয়ে একটু বেশি স্পষ্টভাবে নিজের স্বার্থের কথা বলতে চাইছে।
মোদির জন্যও এটি একটি কঠিন সময়। ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের উষ্ণতা থাকলেও রাষ্ট্রের স্বার্থ ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে বড়। একজন নেতার সঙ্গে আরেকজন নেতার বন্ধুত্ব বাণিজ্যঘাটতি, শুল্ক, জ্বালানি কিংবা নিরাপত্তার প্রশ্ন মিটিয়ে দিতে পারে না।
গত বুধবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপের পর মোদি সেটিকে ‘ফলপ্রসূ’ বলেছেন। কিন্তু আগের সময়ের মতো ট্রাম্পকে ‘ভালো বন্ধু’ হিসেবে তুলে ধরার উষ্ণতা সেখানে ছিল না। এটিও পরিবর্তিত বাস্তবতার একটি ইঙ্গিত হতে পারে।
সব মিলিয়ে ভারতের সাম্প্রতিক অবস্থানকে এক ধরনের কূটনৈতিক সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা যায়। নয়াদিল্লি হয়তো বলতে চাইছে—যুক্তরাষ্ট্র ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, কিন্তু ভারত তার জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে রাজি নয়।
এই পরিবর্তনের শেষ ফল কী হবে, তা নির্ভর করবে বাণিজ্য আলোচনা, শুল্কনীতি, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এবং পাকিস্তান ইস্যুতে ওয়াশিংটনের অবস্থানের ওপর।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখন আগের সেই একমুখী উষ্ণতার জায়গায় নেই। বন্ধুত্ব আছে, প্রয়োজনও আছে; কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চাপ, দরকষাকষি এবং স্বার্থের সংঘাত।
আর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত বন্ধুত্বের চেয়ে জাতীয় স্বার্থই বড়। মোদি সরকার এখন সম্ভবত সেটিই আরও জোর দিয়ে মনে করিয়ে দিতে চাইছে।










পাঠকের মন্তব্য