সাংবাদিকদের ওপর হামলা: বিশ্ববিদ্যালয় কি নীরব দর্শক থাকবে?

এস এম মেহেদী হাসান

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন মারামারির ঘটনা নয়। এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি সাংবাদিকতা বিভাগ এবং সর্বোপরি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।

সাংবাদিকদের ওপর হামলা

ঘটনাটি আরও বেশি গুরুতর হওয়ার কারণ হলো, হামলার শিকার ব্যক্তিরা কোনো ‘ফেসবুক সাংবাদিক’ নন। তাঁরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধি। তাঁদের কেউ দৈনিক পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি, কেউ অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি। সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের কাজ করতে গিয়ে তাঁদের ওপর হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সাংবাদিকদের ওপর হামলা

একটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে না পারে, তাহলে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা শিক্ষা, মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।

ঘটনার বিবরণ আরও উদ্বেগজনক।

অভিযোগ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করা হয়। এতে চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। আহত সাংবাদিকদের মধ্যে রয়েছেন দৈনিক আগামীর সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম, দ্য ডেইলি স্টারের নূর আহসান, বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমের আরিফ উজ্জামান এবং দৈনিক সমকালের মাঈনুল ইসলাম।

আহতদের প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। পরে তাঁদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ঘটনার পর সাংবাদিকেরা প্রতিবাদে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। তাঁদের দাবি ছিল পরিষ্কার: হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে, গ্রেপ্তার করতে হবে এবং যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা করার আশ্বাস পাওয়ার পর তাঁরা সাময়িকভাবে কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন।

এখানেই মূল প্রশ্ন।

মামলা হবে, তদন্ত হবে, কমিটি হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিচার হবে তো?

বাংলাদেশে আমরা বহুবার দেখেছি, কোনো ঘটনার পর তীব্র নিন্দা হয়, তদন্ত কমিটি হয়, মামলা হয়। কিছুদিন সংবাদমাধ্যমে আলোচনা চলে। এরপর ধীরে ধীরে সবকিছু স্তিমিত হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায়। আর ভুক্তভোগীরা থেকে যান আতঙ্ক ও হতাশা নিয়ে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনায় এমন কোনো পরিণতি আমরা দেখতে চাই না।

কারণ সাংবাদিকদের ওপর হামলা কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। একজন সাংবাদিক যখন সংবাদ সংগ্রহ করতে মাঠে যান, তখন তাঁর হাতে অস্ত্র থাকে না। তাঁর শক্তি হলো তথ্য, প্রশ্ন এবং সত্য প্রকাশের দায়িত্ব।

কোনো সাংবাদিকের প্রতিবেদন কারও পছন্দ নাও হতে পারে। কোনো সংবাদে কেউ ক্ষুব্ধ হতে পারেন। কোনো রাজনৈতিক সংগঠন মনে করতে পারে, সংবাদটি তাদের বিরুদ্ধে গেছে। কিন্তু তার প্রতিকার হামলা নয়। প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে বক্তব্য, প্রতিবাদলিপি, আইনি ব্যবস্থা কিংবা তথ্য দিয়ে ভুল প্রমাণ করা। কখনোই লাঠি, ঘুষি, হুমকি কিংবা দলীয় প্রভাব নয়।

আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে তো কোনোভাবেই নয়।

বিশ্ববিদ্যালয় হলো যুক্তি ও বিতর্কের জায়গা। এখানে মতের সঙ্গে মতের সংঘাত হবে, প্রশ্ন হবে, সমালোচনা হবে। কিন্তু মতের জবাব যদি হামলা দিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতির জন্য ভয়ংকর সংকেত।

বিশেষ করে সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। আজ তাঁরা শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি। আগামীকাল তাঁদের কেউ জাতীয় গণমাধ্যমে কাজ করবেন, কেউ সম্পাদক হবেন, কেউ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করবেন। তাঁদের ছাত্রজীবনেই যদি শেখানো হয় যে শক্তিশালী কারও বিরুদ্ধে প্রশ্ন করলে হামলার শিকার হতে হবে, তাহলে আমরা কেমন সাংবাদিকতা তৈরি করছি?

আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযোগ উঠেছে, হামলায় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা জড়িত ছিলেন। এই অভিযোগ সত্য কি না, তা তদন্ত করে নির্ধারণ করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের নাম এসেছে বলেই পুরো সংগঠনকে দায়ী করা যাবে না। একইভাবে রাজনৈতিক পরিচয় থাকার কারণে কাউকে দায়মুক্তিও দেওয়া যাবে না।

অভিযুক্তের পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণই হবে বিচারের ভিত্তি।

এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ, দ্রুত ও স্বচ্ছ। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, আহতদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রমাণ যথাযথভাবে সংগ্রহ করতে হবে। কারা হামলায় অংশ নিয়েছে, কারা নেতৃত্ব দিয়েছে, কারা উসকানি দিয়েছে, তা স্পষ্ট করতে হবে।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কেউ বর্তমান শিক্ষার্থী হলে তার ছাত্রত্বের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর কেউ সাবেক শিক্ষার্থী বা বহিরাগত হলে ক্যাম্পাসে তাঁর প্রবেশ ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

শুধু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নয়, রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলোরও এখানে বড় দায়িত্ব আছে।

ছাত্রদল ইতিমধ্যে অভিযোগ তদন্তে দুই সদস্যের কমিটি গঠন করেছে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছে। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু তদন্ত কমিটি গঠনই শেষ কথা নয়। তদন্তে যদি সংগঠনের কোনো নেতা-কর্মীর সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়, তাহলে দলীয়ভাবেও দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

কারণ রাজনৈতিক সংগঠনের জনপ্রিয়তা শুধু মিছিল, স্লোগান বা সাংগঠনিক শক্তিতে তৈরি হয় না। জবাবদিহি করার সক্ষমতাও রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ।

কোনো নেতা-কর্মী অপরাধ করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দুর্বলতার পরিচয় নয়। বরং সেটিই সংগঠনের দায়িত্বশীলতার প্রমাণ।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতিও একটি কথা পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন।

শুধু সাংবাদিকদের আন্দোলনের চাপে মামলা করা যথেষ্ট নয়। মামলা হওয়ার পর তদন্ত কতদূর এগোল, আসামিদের শনাক্ত করা হলো কি না, গ্রেপ্তার হলো কি না, তদন্ত প্রতিবেদন কী বলছে, বিশ্ববিদ্যালয় কী ব্যবস্থা নিল, এসব বিষয়েও প্রশাসনকে জবাবদিহি করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী আহত হলে প্রশাসনের দায়িত্ব। একজন সাংবাদিক আহত হলেও একই দায়িত্ব। কারণ সাংবাদিকও এই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারেরই অংশ, বিশেষ করে যখন তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ক্যাম্পাসে সংবাদ সংগ্রহ করেন।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো বিচারহীনতা।

আজ যদি হামলার ঘটনা ঘটে এবং অপরাধীরা কোনোভাবে পার পেয়ে যায়, তাহলে আগামীকাল অন্য কেউ আরও বড় হামলা করতে সাহস পাবে। কারণ অপরাধীরা তখন একটি বার্তা পাবে: হামলা করলেও শেষ পর্যন্ত কিছু হয় না।

এই সংস্কৃতি বন্ধ করতেই হবে।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সাংবাদিকদের দাবি নয়। এটি সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার সঙ্গেও জড়িত। কারণ একজন সাংবাদিক যখন কোনো অনিয়মের খবর প্রকাশ করেন, তখন তিনি শুধু নিজের জন্য কাজ করেন না। তিনি সমাজের মানুষের সামনে তথ্য তুলে ধরেন।

সাংবাদিককে ভয় দেখানো মানে অনেক সময় জনগণের জানার অধিকারকে ভয় দেখানো।

তাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় দ্রুত মামলা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয়, পদ-পদবি কিংবা প্রভাব কোনো কিছুই যেন বিচারের পথে বাধা না হয়।

একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে, ভবিষ্যতে কোনো সাংবাদিক যেন সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার না হন।

আমরা কোনো পক্ষের অন্ধ সমর্থন চাই না। আমরা চাই সত্য উদঘাটিত হোক। অপরাধী যে পক্ষেরই হোক, তার বিচার হোক।

কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে সাংবাদিকের কলম থামিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু সাংবাদিক হারবেন না, হারবে পুরো সমাজ।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা তাই দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া দরকার। মামলা হতে হবে, তদন্ত হতে হবে, অপরাধীদের শনাক্ত করতে হবে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

আজ যদি বিচার নিশ্চিত করা যায়, তাহলে একটি শক্ত বার্তা যাবে: বিশ্ববিদ্যালয়ে মতের পার্থক্য থাকতে পারে, রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে, বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু হামলা করে কাউকে চুপ করিয়ে দেওয়ার অধিকার কারও নেই।

আর যদি বিচার না হয়, তাহলে আগামী দিনের হামলার জন্য আমরাই যেন পথ তৈরি করে দেব।

সাংবাদিকতা অপরাধ নয়। প্রশ্ন করা অপরাধ নয়। সংবাদ প্রকাশ অপরাধ নয়।

অপরাধ হলো হামলা করা। আর সেই অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক

মুক্তিবাণী

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও