এম সাইফুর রহমান স্টেডিয়ামের উন্নয়ন, সাত উপজেলায় স্টেডিয়াম ও প্রতিটি ইউনিয়নে খেলার মাঠের আশ্বাস; তৃণমূল থেকে প্রতিভা তুলে আনার উদ্যোগে আশাবাদী ক্রীড়াঙ্গন
একটি বল, একটি ব্যাট কিংবা একটি জার্সি—একজন কিশোরের কাছে এগুলোই কখনো কখনো হয়ে ওঠে বড় স্বপ্নের শুরু। কিন্তু স্বপ্ন থাকলেই তো হয় না। দরকার মাঠ, প্রশিক্ষণ আর সুযোগ। মৌলভীবাজারের অনেক তরুণের সেই সুযোগের অপেক্ষা দীর্ঘদিনের।
কেউ উপজেলা পর্যায়ে ভালো খেলেও পরের ধাপে যেতে পারেনি। কেউ ভালো প্রশিক্ষণের অভাবে থেমে গেছে। আবার কেউ নিয়মিত খেলার মাঠ না পেয়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে খেলাধুলা থেকে। জেলার ক্রীড়াঙ্গনের এই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন আশার কথা শোনা গেল শ্রীমঙ্গলে আয়োজিত এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে।
সেখানে ক্রীড়াবিদদের সামনে সরকারের নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। তাঁর ঘোষণায় উঠে এসেছে মৌলভীবাজারের এম সাইফুর রহমান স্টেডিয়ামের উন্নয়ন, জেলার সাত উপজেলায় স্টেডিয়াম নির্মাণ এবং প্রতিটি ইউনিয়নে খেলার মাঠ তৈরির উদ্যোগের কথা।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টায় শ্রীমঙ্গলের গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফের হলরুমে সম্মিলিত ক্রীড়া পরিষদ, মৌলভীবাজারের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় জেলার ক্রীড়াবিদদের নিয়ে এই মতবিনিময় সভা। এতে অংশ নেন জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় পাঁচ শতাধিক ক্রীড়াবিদ।
মাঠের অভাব, স্বপ্নের পথে বড় বাধা মৌলভীবাজারে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ কম নয়। ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিক্স, সাঁতারসহ বিভিন্ন খেলায় প্রতিভাবান তরুণ রয়েছে। কিন্তু প্রতিভা বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুযোগ সব জায়গায় নেই।
শহরের বাইরে গেলে সমস্যাটা আরও প্রকট। অনেক এলাকায় মাঠ থাকলেও তা নিয়মিত খেলার উপযোগী নয়। কোথাও মাঠ নেই, কোথাও মাঠ দখল হয়ে গেছে অন্য কাজে। ফলে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ কমছে।
এই বাস্তবতায় প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে খেলার মাঠ তৈরির উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ক্রীড়ামন্ত্রী আমিনুল হক জানিয়েছেন, দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে খেলার মাঠ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশের ৪৯৫টি উপজেলায় একটি করে স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মৌলভীবাজারের জন্য আরও নির্দিষ্ট ঘোষণা এসেছে। জেলার সাতটি উপজেলায় স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগের পাশাপাশি মৌলভীবাজারের এম সাইফুর রহমান স্টেডিয়ামের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
কাগজে-কলমের পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা দ্রুত রূপ নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। কারণ মাঠের অপেক্ষায় থাকা ক্রীড়াবিদদের কাছে প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব মাঠই বেশি জরুরি।
তৃণমূলেই লুকিয়ে আছে প্রতিভা দেশের ক্রীড়াঙ্গনে বড় একটি সমস্যা হলো—প্রতিভা খুঁজে বের করার কাজটি অনেক সময় শহরকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। অথচ গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায়ও অনেক শিশু-কিশোর রয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছে অসাধারণ সম্ভাবনা।
‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সেই তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিভা খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলা ও জেলা পর্যায় থেকে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৫৬ জন শিশু-কিশোর।
জাতীয় পর্যায়ে পারফরম্যান্স ও দক্ষতা যাচাইয়ের পর তাদের মধ্য থেকে ৩৪৭ জন উদীয়মান অ্যাথলেটকে বিকেএসপিতে দীর্ঘমেয়াদি ও নিবিড় প্রশিক্ষণের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচন ও সুপারিশ করা হয়েছে।
ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, সাঁতার, অ্যাথলেটিক্স, ব্যাডমিন্টন, দাবা, টেবিল টেনিস ও মার্শাল আর্টসহ বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে তাদের সাত মাসের বিশেষ আবাসিক প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
এ উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রতিভাবান শিশু-কিশোরদের শুধু একবারের প্রতিযোগিতায় এনে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে না। তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এবার ১৬ লাখের বেশি শিশু-কিশোর নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের দ্বিতীয় আসরে অংশ নেওয়ার আগ্রহ আরও বড়। ২০২৬-২৭ মৌসুমের জন্য অনলাইনে নিবন্ধন করেছে ১৬ লাখ ২৩ হাজার ২১৮ জন শিশু-কিশোর।
এর মধ্যে ৯ লাখের বেশি ছেলে এবং ৬ লাখের বেশি মেয়ে। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি বলে দেয়, সুযোগ পেলে দেশের শিশুরা মাঠে আসতে চায়।
বিশেষ করে মেয়েদের অংশগ্রহণের বিষয়টি আলাদা করে গুরুত্ব পাওয়ার মতো। দীর্ঘদিন ধরে নানা সামাজিক ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এখন তাদের বড় সংখ্যায় অংশগ্রহণ নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মাদক থেকে দূরে রাখতে মাঠ ক্রীড়ামন্ত্রী আমিনুল হক বলেছেন, শিশু-কিশোরদের মাদক থেকে দূরে রাখতে হলে তাদের খেলাধুলার প্রতি মনোযোগী করতে হবে। এর সঙ্গে দ্বিমত করার সুযোগ কম।
কারণ একটি মাঠ শুধু খেলোয়াড় তৈরি করে না। মাঠ একজন শিশুকে নিয়ম মেনে চলতে শেখায়, হার মেনে আবার ঘুরে দাঁড়াতে শেখায়, অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে শেখায়। সবচেয়ে বড় কথা, মাঠে থাকার সময় একজন কিশোর অনেক নেতিবাচক পরিবেশ থেকে দূরে থাকে।
এই জায়গা থেকেই ইউনিয়ন পর্যায়ে মাঠ তৈরির উদ্যোগকে দেখতে হবে। এটি শুধু ক্রীড়া অবকাঠামো তৈরির প্রকল্প নয়; এটি নতুন প্রজন্মকে সুস্থ ও ইতিবাচক জীবনের সঙ্গে যুক্ত করারও একটি পথ।
এখন দরকার বাস্তবায়ন মতবিনিময় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সম্মিলিত ক্রীড়া পরিষদ, মৌলভীবাজারের সভাপতি মাহবুব ইজদানী ইমরান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল, পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম, জেলা পরিষদের প্রশাসক মিজানুর রহমান মিজান, মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফয়জুল করিম ময়ূন, সদস্যসচিব আব্দুল রহিম রিপন, সদস্য আব্দুল মুকিত, জেলা যুবদলের সভাপতি জাকির হোসেন উজ্জ্বল, ক্রীড়া সংগঠক ও সাবেক ক্রীড়াবিদ হাসান আহমেদ জাবেদ, বিসিবির পরিচালক সরফরাজ আহমেদ সরফুসহ অনেকে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক হাফেজ আহমদ মাহফুজ।
তবে ক্রীড়াবিদদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ঘোষণাগুলো বাস্তবায়ন হবে কবে?
এম সাইফুর রহমান স্টেডিয়ামের উন্নয়ন, সাত উপজেলায় স্টেডিয়াম এবং ইউনিয়নে ইউনিয়নে মাঠ তৈরি হলে মৌলভীবাজারের ক্রীড়াঙ্গনের চেহারা বদলে যেতে পারে। শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই অবশ্য কাজ শেষ হবে না। মাঠগুলো নিয়মিত ব্যবহার, প্রশিক্ষক নিয়োগ, প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের ধারাবাহিকভাবে পরিচর্যার ব্যবস্থাও করতে হবে।
কারণ প্রতিভা একদিনে তৈরি হয় না। একজন ভালো খেলোয়াড়ের পেছনে থাকে বছরের পর বছর অনুশীলন, পরিশ্রম এবং সঠিক দিকনির্দেশনা।
মৌলভীবাজারের ক্রীড়াবিদদের সেই সুযোগটাই এখন সবচেয়ে বেশি দরকার।
শ্রীমঙ্গলের মতবিনিময় সভায় তাই শুধু বক্তৃতা হয়নি; উঠে এসেছে মাঠের দাবি, সুযোগের দাবি এবং নতুন প্রজন্মের স্বপ্নের কথা। প্রায় পাঁচ শতাধিক ক্রীড়াবিদের উপস্থিতি সেই প্রত্যাশারই প্রতিচ্ছবি।
একদিন হয়তো এই মাঠ থেকেই উঠে আসবে জাতীয় দলের কোনো খেলোয়াড়, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের হয়ে লড়বে কোনো তরুণ। সেই সম্ভাবনা মৌলভীবাজারের মাটিতে আছে। এখন প্রয়োজন শুধু সেই সম্ভাবনাকে ধরে রাখার মতো মাঠ, প্রশিক্ষণ ও সুযোগ তৈরি করা। স্বপ্ন আছে। প্রতিভাও আছে। এখন মাঠটা দরকার।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক










পাঠকের মন্তব্য