কুদালীছড়ার পানিপ্রবাহ, দুই তীরের ওয়াকওয়ে ও স্টিলের রেলিং: সম্ভাবনার পথে থমকে আছে উন্নয়ন

এস এম মেহেদী হাসান

মৌলভীবাজার শহরের বুক চিরে বয়ে চলেছে কুদালীছড়া। একসময় এই ছড়াকে ঘিরে ছিল শহরের প্রকৃতি, পানিপ্রবাহ ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা স্মৃতি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছড়ার বিভিন্ন অংশে পানিপ্রবাহের প্রতিবন্ধকতা, পলি ও ময়লা জমে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং নাগরিকদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে কুদালীছড়ার খনন, দুই তীরে ওয়াকওয়ে নির্মাণ এবং স্টিলের রেলিং স্থাপন ছিল গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে সেই উন্নয়নকাজের ধারাবাহিকতা এখন নানা প্রশ্নের মুখে।

ছবি মুক্তিবাণী

মৌলভীবাজার শহরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কুদালীছড়ার দৈর্ঘ্য প্রায় ছয় কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার অংশের খননকাজ ২০২৪ সালের আগে সম্পন্ন হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট উদ্যোগের সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। পরিকল্পনা ছিল, পর্যায়ক্রমে বাকি অংশের খননকাজও শেষ করা হবে। কিন্তু ২০২৪ সালে পৌর পরিষদ ভেঙে দেওয়ার পর সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও কুদালীছড়ার বাকি অংশ খননের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে স্থানীয়দের বক্তব্য।

ছবি মুক্তিবাণী

ফলে ছড়ার অসম্পূর্ণ খননকাজ এখন শহরবাসীর উদ্বেগের একটি বিষয়। নাগরিকদের প্রত্যাশা, কুদালীছড়ার পুরো অংশের অবস্থা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় খনন ও সংস্কারকাজ দ্রুত শুরু করা হবে। কারণ, একটি শহরের ছড়া কেবল পানি প্রবাহিত হওয়ার পথ নয়; এটি নগরের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, পরিবেশ এবং জনজীবনের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

পানিপ্রবাহ সচল রাখা কেন জরুরি বর্ষা মৌসুমে শহরের পানি দ্রুত নিষ্কাশন করতে ছড়ার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোথাও পলি জমে ছড়ার গভীরতা কমে গেলে, কোথাও ময়লা-আবর্জনা পানির চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে কিংবা ছড়ার তীর সংকুচিত হলে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে আশপাশের সড়ক, বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর।

ছবি মুক্তিবাণী

তবে জলাবদ্ধতার কারণ সব সময় এককভাবে ছড়ার খননের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। ড্রেনেজব্যবস্থার সক্ষমতা, নালা-নর্দমার সংযোগ, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং ছড়ায় পানি প্রবেশ ও বের হওয়ার পথও গুরুত্বপূর্ণ। তাই কুদালীছড়ার উন্নয়নকে একটি সমন্বিত পানি নিষ্কাশন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও কারিগরি সমীক্ষার ভিত্তিতে ছড়ার কোথায় কতটুকু খনন দরকার, কোথায় পলি বা বর্জ্য সরাতে হবে এবং কোন অংশে তীর সংরক্ষণ জরুরি—এসব নির্ধারণ করা উচিত। শুধু একাংশ খনন করে থেমে গেলে পুরো ব্যবস্থার সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। এ কারণে প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ কুদালীছড়ার বাকি অংশের কাজও পরিকল্পিতভাবে সম্পন্ন করার দাবি তুলছেন স্থানীয়রা।

দুই তীরের ওয়াকওয়ে: নাগরিক জীবনে নতুন সম্ভাবনা কুদালীছড়ার দুই তীর ঘেঁষে ওয়াকওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ শহরের নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। পরিকল্পিতভাবে তৈরি হাঁটার পথ মানুষকে নিরাপদে চলাচলের সুযোগ দেয়। একই সঙ্গে সকালে ও বিকেলে হাঁটা, হালকা ব্যায়াম এবং অবসর সময় কাটানোর জন্য তৈরি হয় উন্মুক্ত পরিসর।

শহরের ব্যস্ত সড়কে যানবাহনের চাপের মধ্যে হাঁটাচলা অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সে ক্ষেত্রে ছড়ার দুই তীরের ওয়াকওয়ে পথচারীদের জন্য বিকল্প সুযোগ তৈরি করতে পারে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে এ ধরনের পথ শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি নাগরিকদের শারীরিক সুস্থতা ও সামাজিক যোগাযোগেও ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে ওয়াকওয়ে নির্মাণই শেষ কথা নয়। পথের পৃষ্ঠ সমতল রাখা, ভাঙা অংশ দ্রুত মেরামত করা, পানি জমে থাকার সমস্যা দূর করা এবং রাতের বেলায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ছড়ার তীরের মাটি যেন ক্ষয়ে না যায়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। পাশাপাশি ওয়াকওয়েতে ময়লা ফেলা বন্ধ এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালু রাখা জরুরি।

স্টিলের রেলিং: নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ কুদালীছড়ার দুই তীরের ওয়াকওয়ের পাশে স্টিলের রেলিং স্থাপন পথচারীদের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ছড়ার পাশ দিয়ে হাঁটার সময় অসতর্কতা, ভিড় কিংবা শিশুদের দৌড়াদৌড়ির কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। রেলিং থাকলে পথচারীদের জন্য একটি সুরক্ষাবেষ্টনী তৈরি হয়, যা বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক মানুষের চলাচলে সহায়ক হতে পারে।

তবে রেলিং স্থাপন করে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। কোথাও রেলিং ঢিলা হয়ে গেছে কি না, সংযোগস্থল ভেঙেছে কি না, ধাতব অংশে ক্ষয় ধরেছে কি না—এসব নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার। দুর্ঘটনাপ্রবণ অংশে রেলিংয়ের উচ্চতা, স্থায়িত্ব এবং নির্মাণমানও কারিগরি মানদণ্ড অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত মেরামত করা না হলে নিরাপত্তাব্যবস্থাই উল্টো ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এ ছাড়া ওয়াকওয়ের পাশে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, সতর্কতামূলক চিহ্ন এবং প্রয়োজনীয় স্থানে পথচারীদের জন্য নিরাপদ প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার। উন্নয়নকাজের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—ছড়াকে সচল রাখা, পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশবান্ধব নগরপরিসর গড়ে তোলা।

পৌরসভার কাজের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন কুদালীছড়ার খননকাজের পাশাপাশি মৌলভীবাজার পৌরসভার সড়ক ও ড্রেন নির্মাণকাজ নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। নাগরিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক বছর আগে পৌরসভার ১৯টি সড়ক ও ড্রেন পূর্ণাঙ্গভাবে নির্মাণের কাজ শুরু করে ঢাকাভিত্তিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরএফএল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কাজের অগ্রগতি প্রত্যাশিত নয় বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে কাজের পরিমাণ ১০ শতাংশও অতিক্রম করেনি। একই সঙ্গে নির্মাণের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।

এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রকল্পভিত্তিক অগ্রগতি, চুক্তির শর্ত, নির্ধারিত সময়সীমা, ব্যয়ের হিসাব এবং নির্মাণের গুণগত মান যাচাই করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কাজ কতটুকু সম্পন্ন হয়েছে, বিল পরিশোধের অবস্থা কী এবং কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময়সীমা কত—এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে নাগরিকদের মধ্যে স্বচ্ছতা বাড়বে।

নির্মাণকাজে তদারকির অভাব থাকলে নিম্নমানের কাজের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত পরিদর্শন, নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষা এবং ত্রুটি পাওয়া গেলে তা সংশোধনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চুক্তি অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করতে হবে; একই সঙ্গে কাজের মান নিশ্চিত করা পৌর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

প্রশাসকের ওপর বাড়তি দায়িত্ব, নাগরিকদের প্রত্যাশা নির্বাচন বর্তমানে মৌলভীবাজার পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)—এমন তথ্য স্থানীয়ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর মূল দায়িত্বের পাশাপাশি পৌরসভার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করাও বাড়তি দায়িত্ব। ফলে সীমিত সময় ও জনবল নিয়ে সব প্রকল্পের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে তদারকি করা কঠিন হতে পারে বলে নাগরিকদের একাংশ মনে করেন।

তবে প্রশাসনিক চাপ থাকলেও নাগরিক সেবা, চলমান উন্নয়নকাজের মান এবং প্রকল্পের অগ্রগতি নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়, প্রকৌশল বিভাগের নিয়মিত তদারকি, প্রকল্পের অগ্রগতি প্রকাশ এবং অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। প্রশাসক একা সব কাজ সম্পন্ন করবেন—এমন প্রত্যাশার পরিবর্তে দায়িত্ব বণ্টন ও জবাবদিহির কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, পৌর পরিষদ না থাকায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নাগরিকদের দাবি তুলে ধরার স্বাভাবিক সুযোগ সীমিত হয়েছে বলে অনেকের মত। সড়ক, ড্রেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ছড়ার খননের মতো বিষয়গুলো সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে। তাই স্থানীয়দের একাংশ যত দ্রুত সম্ভব পৌরসভা নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানাচ্ছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, নির্বাচিত পরিষদ দায়িত্ব গ্রহণ করলে উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেটের অগ্রাধিকার এবং নাগরিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।

কুদালীছড়াকে ঘিরে পরিকল্পিত নগরায়ণের প্রত্যাশা কুদালীছড়ার খনন, দুই তীরের ওয়াকওয়ে এবং স্টিলের রেলিং—এই তিনটি উদ্যোগকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। ছড়ার পানিপ্রবাহ সচল না থাকলে পরিবেশ ও পানি নিষ্কাশনের সমস্যা থেকে যেতে পারে; ওয়াকওয়ের নিয়মিত পরিচর্যা না হলে নাগরিক সুবিধা কমে যায়; আর রেলিংয়ের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না থাকলে পথচারীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।

তাই প্রয়োজন একটি সমন্বিত পরিকল্পনা—যেখানে ছড়ার বাকি অংশের খনন, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন, দুই তীরের স্থায়িত্ব রক্ষা, ওয়াকওয়ের পরিচ্ছন্নতা, স্টিলের রেলিংয়ের নিরাপত্তা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে চলমান সড়ক ও ড্রেন নির্মাণকাজের অগ্রগতি এবং মান সম্পর্কে জনসাধারণকে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানাতে হবে।

মৌলভীবাজার শহরকে আরও বাসযোগ্য করে তুলতে কুদালীছড়া হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করা, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্মাণমান নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

শহরবাসীর প্রত্যাশা স্পষ্ট—কুদালীছড়ার পানিপ্রবাহ সচল হোক, দুই তীরের ওয়াকওয়ে হোক পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ, স্টিলের রেলিং থাকুক মজবুত, আর সড়ক ও ড্রেন নির্মাণকাজ শেষ হোক মান বজায় রেখে। উন্নয়ন শুধু প্রকল্প শুরু করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তার সুফল মানুষের জীবনে পৌঁছানোই আসল সাফল্য। সেই সাফল্যের জন্য প্রয়োজন কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক

monir
Admin

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও