মৌলভীবাজারে ১৩৯ শতক পৈত্রিক সম্পত্তি দখলমুক্ত; বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো অবৈধ স্থাপনা

বিশেষ প্রতিনিধি

ছবি মুক্তিবাণী

দীর্ঘ ১৭ বছর মামলা চালানোর পর অবশেষে ন্যায়বিচার পেলেন তালাত রিজওয়ানা। গত ১৩ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে মৌলভীবাজারের প্রথম যুগ্ম জজ আদালত এক রায়ের মাধ্যমে তাঁর পৈত্রিক সম্পত্তি বিবাদী আকলিস মিয়া গংদের কাছ থেকে উদ্ধার করে দেন। স্থানীয় মহলে এই রায়কে একটি যুগান্তকারী রায় হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। কারণ, এত দীর্ঘ সময় ধরে জবরদখলকারীরা ওই জমিতে কয়েকটি পরিবার নিয়ে বসবাস করছিল এবং বড় বড় পাকা ঘর, দরজা ও স্থাপনা নির্মাণ করে ভোগদখল করে আসছিল।

ছবি মুক্তিবাণী

আদালত সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ৭নং চাঁদনিঘাট ইউনিয়নের বর্সিজোড়া মৌজায় অবস্থিত জমিটির জেএল নং-১০৫, এসএ নামজারি খতিয়ান নং-৮৯৩, এসএ দাগ নং-১৫২৪ এবং আরএস দাগ নং-৮২১২। জমির পরিমাণ ১৩৯ শতক, অর্থাৎ এক একর ৩৯ শতাংশ। এই জমি তালাত রিজওয়ানার পৈত্রিক সম্পত্তি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিবাদী আকলিস মিয়া ও তার সহযোগীরা জমিটি জবরদখল করে রেখেছিল। তারা শুধু জমি দখলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সেখানে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলে এবং একাধিক পাকা স্থাপনা নির্মাণ করে।

ছবি মুক্তিবাণী

জানা যায়, পৈত্রিক সম্পত্তি ফিরে পেতে তালাত রিজওয়ানা দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে যান। এত দীর্ঘ সময় ধরে মামলা চলার কারণে তাঁকে নানা হয়রানি, অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক বাধার মুখে পড়তে হয়। তবে তিনি হাল ছাড়েননি। আদালতে দলিল-দস্তাবেজ, সাক্ষী ও জরিপ সংক্রান্ত তথ্য উপস্থাপন করেন। অবশেষে আদালত তাঁর পক্ষে রায় দেন এবং জমি উদ্ধার করে বাদিকে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেন।

ছবি মুক্তিবাণী

রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রশাসনের সহায়তায় জমিটি দখলমুক্ত করা হয়। এ সময় অবৈধভাবে নির্মিত স্থাপনাগুলো বুলডোজার দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। জমি দখলমুক্ত করার কাজে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয় উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও শত শত সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

ছবি মুক্তিবাণী

গ্রামের শত শত মানুষের সামনে বাদি তালাত রিজওয়ানাকে জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত লোকজন আদালতের রায়কে স্বাগত জানান। অনেকেই বলছেন, এত দীর্ঘ সময় পর পৈত্রিক সম্পত্তি ফিরে পাওয়া কেবল একজন ব্যক্তির বিজয় নয়; এটি আইনের শাসনেরও বিজয়। কারণ, জবরদখলকারীরা যখন প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষ অনেক সময় ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু এই রায় প্রমাণ করেছে, আইনি লড়াই চালিয়ে গেলে শেষ বিচারে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব।

ছবি মুক্তিবাণী

স্থানীয়দের অনেকে মনে করছেন, এই রায় ভূমি-দখল ও জবরদখলের বিরুদ্ধে একটি বড় বার্তা বহন করে। দীর্ঘসূত্রতা, হয়রানি ও নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আদালতের চূড়ান্ত রায় এবং প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা বাড়াবে। বিশেষ করে যারা জমি-জমা সংক্রান্ত মামলায় বছরের পর বছর ঘুরছেন, তাদের জন্য এই রায় সাহস ও অনুপ্রেরণার বিষয় হয়ে থাকবে।

ছবি মুক্তিবাণী

আইনজীবীরা বলছেন, ভূমি মামলায় দীর্ঘসূত্রতা একটি পুরোনো সমস্যা। অনেক সময় প্রভাবশালী মহল আদালতের রায় এলেও তা কার্যকর হতে দেয় না। কিন্তু এই ঘটনায় আদালতের রায়ের পর প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় বাদি প্রকৃত ন্যায়বিচার পেয়েছেন। এটি ভবিষ্যতে অন্য মামলার জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।

ছবি মুক্তিবাণী

এদিকে জমি ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তালাত রিজওয়ানা। তিনি আদালত, প্রশাসন ও সহযোগীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ১৭ বছরের লড়াই সহজ ছিল না; কিন্তু সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকলে একদিন বিজয় আসে। তাঁর পরিবারের সদস্যরাও এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

ছবি মুক্তিবাণী

এই রায় কেবল তালাত রিজওয়ানার ১৭ বছরের আইনি লড়াইয়ের সমাপ্তি নয়; এটি জবরদখল ও ভূমি-দখলের বিরুদ্ধে অন্যায়ের শিকার সাধারণ মানুষের জন্য এক বড় সাহসের গল্প। এই রায় বার্তা দেয়—যত শক্তিশালী দখলদারই হোক, যত পাকা দালানই থাকুক, আইনের চোখে সবাই সমান। দখল নয়, আইনের শাসনই শেষ কথা। আর এই যুগান্তকারী রায় প্রমাণ করে দিল, ন্যায়বিচার দেরিতে আসতে পারে, কিন্তু প্রতারণা ও দখলের পাহাড় ডিঙিয়ে একদিন তা আসেই; আর সেই ন্যায়বিচারের সামনে কোনো অবৈধ দখলদারির রাজত্বই চিরদিন টিকতে পারে না।

monir
Admin

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও