ক্ষমতা যত বড়, দায়িত্বও তত বেশি। কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্ববোধের ভারসাম্য হারালে সেই ক্ষমতাই একসময় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিএনপি সরকারের দুই ঘটনাকে ঘিরে এখন এই প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রথমে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ, এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের মন্ত্রিসভা থেকে বিদায়—দুটি ঘটনাই ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হতে পারে।
![]()
রাজনীতি শুধু ক্ষমতায় যাওয়া কিংবা ক্ষমতা ধরে রাখার নাম নয়। রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের প্রত্যাশা, আইনের শাসন, জবাবদিহি ও জনসেবার অঙ্গীকার। নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করার পর সেই দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ, তখন একজন জনপ্রতিনিধির প্রতিটি কথা, কাজ ও আচরণ শুধু তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় বহন করে না; তার প্রভাব পড়ে দল ও সরকারের ভাবমূর্তির ওপরও।
কিন্তু ক্ষমতার কাছাকাছি গেলে অনেকের মধ্যে ভিন্ন এক মানসিকতা তৈরি হয়। কেউ কেউ মনে করতে শুরু করেন, দলের সরকার ক্ষমতায় আছে, ফলে তাঁরা যা করবেন, তা সহজেই মেনে নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে শুরু করে প্রশাসন—সবাই তাঁদের কথায় চলবে। বিরোধিতা করলে ভয় দেখানো যাবে, প্রশ্ন তুললে চাপে রাখা যাবে। অথচ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনপ্রতিনিধি কিংবা দলীয় পদ কোনো ব্যক্তিকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দেয় না।
বিএনপি সরকারের সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা সেই বাস্তবতাই নতুন করে সামনে এনেছে।
মিষ্টির পদত্যাগ থেকে ইশরাকের বিদায়
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১ অক্টোবর ২০২৬ বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেন। এর আগে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘটনা সামনে আসে।
ইশরাকের ঘটনাটি বিশেষভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘরে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে তাঁর আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে একজন প্রতিমন্ত্রীর হাতে অস্ত্র দেখা যাওয়ায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একজন জনপ্রতিনিধি মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন, সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই অবস্থান কীভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে, তা-ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মাদক একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা। এর বিরুদ্ধে অভিযান, জনসচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ প্রয়োজন। তবে এসব উদ্যোগ পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর ভূমিকার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা জরুরি। জনপ্রতিনিধির হাতে অস্ত্র দেখে মানুষ আশ্বস্ত হবে, নাকি আইন প্রয়োগের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলবে—সেই বিবেচনাও গুরুত্বপূর্ণ।
ঘটনার পর ইশরাক হোসেন সংবাদ সম্মেলনে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, মাদকবিরোধী কর্মসূচিতে অংশ নিতে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে গিয়েছিলেন এবং থানাকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। নিজের লাইসেন্স করা অস্ত্র আত্মরক্ষার জন্য হাতে নিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
ইশরাক বলেন, ‘যদি আমার দ্বারা কোনো ভুল হয়ে থাকে, আমি কাউকে আঘাতপ্রাপ্ত করে থাকি এই অভিযানের মাধ্যমে, সেটার জন্য আগে আমি দুঃখ প্রকাশ করে নিচ্ছি। কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমি কোনো ভুল সেদিন করিনি।’
অর্থাৎ, তিনি দুঃখ প্রকাশের কথা বললেও নিজের কর্মকাণ্ডকে ভুল বলে স্বীকার করেননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাও রয়েছে।
তবে সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া ব্যাখ্যা ও নিজের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার পরও রাজনৈতিকভাবে ঘটনাটির প্রভাব এড়ানো যায়নি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী তাঁকে সেই সুযোগ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, সরকারসংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের সূত্রের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, আগের দিন মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে ডেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফলে পদত্যাগের সিদ্ধান্তের পেছনে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব ছাড়ার বক্তব্যের পাশাপাশি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
মাদকবিরোধী অবস্থানই কি যথেষ্ট?
ইশরাক হোসেনের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার বিষয়টিকে সামনে এনেছেন। কিন্তু একটি ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের প্রতিটি পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না।
মাদক নির্মূলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা থাকতে পারে। জনপ্রতিনিধিরা স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিত করবেন, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করবেন, তরুণদের সচেতন করবেন এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সক্রিয় করবেন—এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু কোনো অভিযানে অস্ত্র প্রদর্শন বা ক্ষমতার পরিচয় সামনে চলে এলে মূল উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে যেতে পারে।
এখানে প্রশ্নটি শুধু একজন প্রতিমন্ত্রীর হাতে অস্ত্র থাকার বিষয় নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি কীভাবে নিজের ক্ষমতা ও দায়িত্বের ব্যবহার করবেন। যে সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, সেই সরকারের প্রতিনিধিদের আচরণেও সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।
প্রতিমন্ত্রীর পদে থাকা একজন ব্যক্তির আচরণ সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। কারণ, তাঁর হাতে রাজনৈতিক দায়িত্বের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও থাকে। তাঁর কোনো কাজ বিতর্ক তৈরি করলে সেটি ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না; সরকারের জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে আসে।
ক্ষমতার দাপটের মূল্য দিতে হতে পারে যে কাউকে
ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘটনা বিএনপির মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতা-কর্মীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে এই বার্তার গুরুত্ব শুধু একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের জন্যই এটি প্রযোজ্য।
দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে জমি দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সাধারণ মানুষকে হয়রানি, প্রভাব খাটিয়ে অন্যায় সুবিধা আদায় কিংবা বিশৃঙ্খল আচরণের অভিযোগ প্রায়ই আলোচনায় আসে। এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা প্রমাণিত নয়, আবার অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী বলার সুযোগও নেই। কিন্তু অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
কেউ ক্ষমতাসীন দলের নেতা, জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ—এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উপেক্ষা করা হলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়। একইভাবে, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি মনে করেন যে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস কারও নেই, তবে সেটি গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য বিপজ্জনক মানসিকতা।
জমি দখল কিংবা হুমকির মতো অভিযোগের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিচয় নয়, প্রমাণ ও আইনই হওয়া উচিত সিদ্ধান্তের ভিত্তি। অপরাধের অভিযোগ উঠলে তদন্ত হবে, প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হবে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক পরিচয় যেন শাস্তি এড়ানোর ঢাল না হয়।
সরকারের দায়িত্ব শুধু অপরাধ দমন করা নয়; নিজের দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের সুযোগ তৈরি করা। বরং ক্ষমতাসীন দলের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দলের লোকজন অন্যায় করলে সরকার নীরব থাকে কি না, মানুষ তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে।
সরকার বদলালেও দায়িত্ববোধ বদলানো উচিত নয়
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে জনগণের ভোটে। এই সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে শুধু নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়। মন্ত্রী থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের আচরণেও তার প্রতিফলন থাকতে হবে। একজন মন্ত্রী যদি মনে করেন তাঁর পদ তাঁকে সব ধরনের সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখে, একজন সংসদ সদস্য যদি মনে করেন দলীয় পরিচয়ের কারণে তাঁকে কোনো প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে না, কিংবা স্থানীয় কোনো নেতা যদি মনে করেন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমি দখল বা মানুষকে ভয় দেখানো যাবে—তাহলে সেই মানসিকতা পরিবর্তন করা জরুরি।
সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বেরও এখানে বড় ভূমিকা রয়েছে। অন্যায় বা দায়িত্বহীন আচরণের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নেওয়া গেলে নেতা-কর্মীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছায় যে ক্ষমতা কোনো ব্যক্তিগত ছাড়পত্র নয়। অন্যদিকে, অভিযোগ উপেক্ষা করা হলে বা প্রভাবশালীদের রক্ষা করা হলে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বার্তা দুর্বল হয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের মূল্যায়ন শুধু নির্বাচনে জয় কিংবা বড় পদ পাওয়ার মাধ্যমে হয় না। সংকটের সময় কে কতটা দায়িত্বশীল আচরণ করেন, সমালোচনার মুখে কে কতটা জবাবদিহি করেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকার কতটা আন্তরিক—এসব বিষয়ও নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করে।
শেষ কথা
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ এবং ইশরাক হোসেনের মন্ত্রিসভা থেকে বিদায়ের ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না। দুটি ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের জন্য একটি সাধারণ শিক্ষা রয়েছে: পদ ও প্রভাব সাময়িক, কিন্তু দায়িত্বহীন আচরণের পরিণতি রাজনৈতিক জীবনে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
ইশরাক হোসেনের ঘটনা দেখিয়েছে, একজন প্রতিমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডও সরকারের জন্য অস্বস্তি তৈরি করতে পারে এবং তার রাজনৈতিক পরিণতি হতে পারে। তবে এই ঘটনাকে সত্যিকার অর্থে সতর্কবার্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু পদত্যাগেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আইনের শাসন, দলীয় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির চর্চা সর্বস্তরে নিশ্চিত করতে হবে।
মন্ত্রী, সংসদ সদস্য কিংবা ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা—কারও ক্ষমতাই জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন করার অনুমতি দেয় না। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অন্যায় করলে তাঁর বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, সরকার কোনো দলের হলেও রাষ্ট্র সবার।
ক্ষমতা মানুষের সেবা করার সুযোগ, দাপট দেখানোর হাতিয়ার নয়। এই সহজ সত্যটি যারা ভুলে যান, তাঁদের জন্য সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে: ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাময়িক সুবিধা পাওয়া গেলেও, তার জবাবদিহি এড়ানো সব সময় সম্ভব নয়।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক










পাঠকের মন্তব্য