ভূমিকা: রাজধানীর ব্যস্ততম সড়ক কিংবা জেলা-উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে হঠাৎ রাস্তা বন্ধ। মাইকে চিৎকার, পুলিশের ব্যারিকেড, আর যানজটে আটকে থাকা হাজারো মানুষ। স্কুল-কলেজের ছাত্র, অফিসগামী মানুষ, জরুরি রোগী, এমনকি বিদেশ যাত্রীরাও পড়েন চরম দুর্ভোগে। এই দৃশ্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখন নিয়মিত ঘটনা। কিন্তু কে শুরু করেছিল এই ‘অসভ্য ঐতিহ্য’? কেনই বা রাজনীতিবিদরা জনগণের চলাচলের অধিকার কেড়ে নেওয়াকে ‘প্রতিবাদের হাতিয়ার’ বানিয়েছে? বিশেষজ্ঞদের মতামত ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এই ফিচার।
![]()
রাস্তা অবরোধের ইতিহাস: কখন থেকে শুরু? রাজনৈতিক সমাবেশ বা মিছিলের জন্য রাস্তা বন্ধ করার সংস্কৃতি বাংলাদেশে নতুন নয়, তবে এর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ শুরু হয় ১৯৯০-এর দশকের গণআন্দোলনে। বিশেষ করে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের পালাবদলের সময় বিএনপি-আওয়ামী লীগ উভয়ই রাস্তা অবরোধকে ‘প্রতিবাদের ভাষা’ হিসেবে ব্যবহার করে ।
- ২০১৩-২০১৪ সালে চূড়ান্ত রূপ: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপির টানা অবরোধে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, পুড়িয়ে দেওয়া হয় বাস, নিহত হন নিরীহ মানুষ ।
- ২০১৮-এর রূপান্তর: শিক্ষার্থীদের রাস্তা নিরাপত্তা আন্দোলনে দেখা যায় একটি ব্যতিক্রমী মডেল—তারা রাস্তা বন্ধ না করে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা শৃঙ্খলার সাথে করেছিলেন, এমনকি জরুরি গাড়ির জন্য লেন খালি রেখেছিলেন ।
- ২০২৩-২০২৪ সংকট: কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে, যেখানে রেললাইন অবরোধ থেকে শুরু করে মহাসড়ক বন্ধ হয়ে যায় দেশজুড়ে ।
জনদুর্ভোগের মূর্তিমূখ: স্কুল-কলেজ থেকে এম্বুলেন্স পর্যন্ত
১. শিক্ষা ব্যাবস্থা বিনাশ :
- পরীক্ষার দিন রাস্তা বন্ধ হলে ছাত্রদের পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয় হেঁটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা আন্দোলনের সময় ৪-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও যোগাযোগ ব্যাহত হয় ।
- ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শাহবাগ অবরোধের সময় শিক্ষার্থীরা ক্লাসে উপস্থিত হতে পারেনি, ফলে সেমিস্টার জট বাড়ে ।
২. জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নে উপহাস :
- এম্বুলেন্স আটকে গেলে রোগীর মৃত্যু নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। বরিশালে একটি শিশুকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মিছিলে আটকে গেলে শিশুটির মৃত্যু হয়।
- ২০২৪ সালের আগস্টে ঢাকা মেডিকেলে আহত আন্দোলনকারীদের চিকিৎসা ব্যাহত হয় রাস্তা অবরোধের কারণে।
৩. অর্থনীতির অচল অবস্থা :
- ইসলামিক গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান এম এ আউয়ালের মতে, “রাজপথ দখলে তীব্র যানজটে মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, জাতীয় অর্থনীতিতে পড়ে ধ্বংসাত্মক প্রভাব”।
- পরিসংখ্যান: ঢাকায় গড়ে দৈনিক ৫ মিলিয়ন কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় যানজটে, যার বার্ষিক ক্ষতি ৩ বিলিয়ন ডলার ।
কে দায়ী? রাজনীতিবিদ, প্রশাসন নাকি আইনের ফাঁক?
রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিচারিতা
- ক্ষমতাসীন দল বিরোধী আন্দোলনে রাস্তা অবরোধকে “সন্ত্রাস” বলে নিন্দা করে, কিন্তু নিজেদের সমাবেশের জন্য একই কৌশলকে বলে “গণতান্ত্রিক অধিকার” ।
- হেফাজতে ইসলাম (২০১৩) ও গণজাগরণ মঞ্চ -ও (২০১৩) একই পথ অনুসরণ করে—শাপলা চত্বর ও শাহবাগে অবরোধে নিহত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ ।
প্রশাসনের দায়ভার :
- পুলিশের দ্বৈত নীতি : ক্ষমতাসীন দলের কর্মসূচি সহজেই অনুমোদিত হয়, বিরোধীদের প্রতি কঠোর হয় ।
- ২০২৪ কোটা আন্দোলনে ছাত্রলীগের হামলায় আহত শিক্ষার্থীদের বিচার না করে বরং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয় ।
উত্তরণের পথ: বিশেষজ্ঞদের ৬টি প্রস্তাব
১. বিকল্প স্থান ব্যবস্থাপনা :
- রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য শহরের প্রান্তে নির্দিষ্ট মাঠ (যেমন: সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, পল্টন ময়দান) বরাদ্দ।
- ২০১৮ শিক্ষা আন্দোলনের মডেল অনুসরণ: সমাবেশ স্থানে ট্রাফিক পুলিশিং জোরদার ।
২. কঠোর আইনি প্রয়োগ : - রাস্তা অবরোধ করলে দলীয় নেতাদের ব্যক্তিগত অর্থদণ্ড ও মামলা (সংশোধিত সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ধারা ১১) ।
৩. প্রযুক্তির ব্যবহার :
- গুগল ম্যাপ/ওলা -এর মাধ্যমে রিয়েল-টাইম ট্রাফিক আপডেট।
- সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তি: ২০১৮ রোড সেফটি মুভমেন্টে ফেসবুক/টুইটার ব্যবহার করে সংগঠিত হয়েছিল লক্ষ মানুষ ।
৪. রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদল : - ইসলামিক গণতান্ত্রিক পার্টির আহ্বান: “জনজীবনে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী কর্মসূচি কোনো সচেতন মানুষের কাম্য নয়”।
৫. সাংবিধানিক সংস্কার : - নির্বাচনকালীন সরকার গঠন (১৯৯৬-এর মডেল), যাতে দলগুলো রাস্তায় না নামে ।
৬. জনসচেতনতা ক্যাম্পেইন : - মিডিয়ার মাধ্যমে গণদুর্ভোগের চিত্র প্রকাশ: ২০২৩ সালে ডিএমপি’র ট্রাফিক আলোচনায় জনমত গঠন।
সমাপ্তি: এই ‘বর্বর ঐতিহ্য’ কি আমাদের উত্তরাধিকার হবে?
> “রাজনীতি যেন জনসেবার হাতিয়ার হয়, জনশত্রুর অস্ত্র না” — এই দাবি আজ শুধু রাস্তায় আটকে পড়া মানুষের নয়, বাংলাদেশের সংবিধানেরও। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত রাষ্ট্রের মূলনীতি ছিল ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার’ । রাস্তা অবরোধের নামে জনগণকে জিম্মি করার এই সংস্কৃতি সেই আদর্শের সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্নের মুখোমুখি আমরা: - “কেন রোগীর এম্বুলেন্স থামিয়ে দিলে তোমাদের ‘সংগ্রাম’?”
- “কোন অধিকারে স্কুলগামী শিশুর শিক্ষা কেড়ে নিলে?”
- “এই অসভ্যতা কি আমাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার?”
উত্তরটি লেখা থাকবে ইতিহাসের পাতায়—আমরা আজ যা চর্চা করি, তা-ই।













পাঠকের মন্তব্য