মৌলভীবাজার জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও শিশু একাডেমির প্রাণবন্ত ও প্রতিভাবান নৃত্য প্রশিক্ষক নাজিয়া আক্তার চৌধুরী (টুনি) ইতালি অভিমুখে পাড়ি দিতে চলেছেন। তাঁর এই বিদেশযাত্রা উপলক্ষে মৌলভীবাজার জেলা জাসাস (জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্হা) এক মনোজ্ঞ ও আবেগঘন বিদায়ী সংবর্ধনার আয়োজন করে। শনিবার (১৩ জুন) সন্ধ্যা ৭টায় শহরের জেলা শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলার বিভিন্ন স্তরের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, জাসাস নেতৃবৃন্দ এবং টুনির অসংখ্য গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ী।
![]()
অনুষ্ঠানের শুরুতে বাতাসে ছিল এক মিশ্র আবহ—কৌতূহল ও গর্বের পাশাপাশি নিবিড় মানবিক টান। জেলা জাসাসের আহ্বায়ক মো. সামশুল ইসলাম রাসেলের সভাপতিত্বে এই আয়োজনটি স্থানীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। সভাপতি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “নাজিয়া আক্তার চৌধুরী টুনি মৌলভীবাজারের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর নৃত্যচর্চা ও শিক্ষকতা জেলার তরুণ প্রজন্মকে সঠিক পথ দেখিয়েছে। ইতালিতে গিয়েও তিনি আমাদের মাথা উঁচু করে রাখবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।”
![]()
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন জেলা জাসাসের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। তাঁরা টুনির দীর্ঘদিনের নিষ্ঠাবান সাংস্কৃতিক চর্চা, নৃত্যের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা এবং নতুন প্রজন্মকে সাংস্কৃতিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধকরণে অনুকরণীয় ভূমিকার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। বক্তারা একবাক্যে টুনির ইতালি যাত্রাকে সফল ও কল্যাণময় কামনা করে বলেন, “বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়েও যেন তিনি বাঙালির প্রাণের ছন্দ ও লয়কে বাঁচিয়ে রাখেন এবং দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন রচনা করেন।”
![]()
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে টুনির হাতে ফুলেল শুভেচ্ছা ও সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। উপস্থিত শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও জাসাস নেতারা দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। চোখের কোণে জড়ো হওয়া আবেগ আর হাসির মধুর মেলবন্ধন ছিল চোখে পড়ার মতো। এরপর শুরু হয় এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। স্থানীয় শিল্পীরা একে একে পরিবেশন করেন দেশের গান, লোকসঙ্গীত ও নৃত্য। অনুষ্ঠানে বারবার ফুটে ওঠে টুনির ছাত্র-ছাত্রীদের ভালোবাসা—যাঁদের অনেকেই নিজেদের নৃত্যগুরুর বিদেশযাত্রায় আবেগাপ্লুত হয়ে পরিবেশনায় তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
![]()
বিদায়ী বক্তব্যে নাজিয়া আক্তার চৌধুরী টুনি তাঁর কণ্ঠে নিঃসংকোচ কৃতজ্ঞতা ও অঙ্গীকারের সুর তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমি ছোটবেলা থেকে নৃত্যের তালে তালে বেড়ে উঠেছি। আজ মৌলভীবাজারের মাটি, এই জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও শিশু একাডেমি আমাকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছে, সেই স্বপ্নের বীজ এখন ইতালির মাটিতে ছড়িয়ে দিতে চাই। জেলা জাসাসের নেতৃবৃন্দ ও আমার শুভাকাঙ্ক্ষীরা আমাকে যে অসাধারণ সম্মানে ভূষিত করেছেন, তা চিরকাল মনে রাখব।” তিনি আরও বলেন, “দেশের মাটি ছেড়ে যাচ্ছি, কিন্তু দেশের সংস্কৃতি ছেড়ে যাব না। বরং বিদেশের মাটিতে বাঙালির নৃত্য, ছন্দ ও ঐতিহ্যকে এক নতুন ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলাই এখন আমার ব্রত। বাংলার মুখরিত গ্রামীণ উৎসব থেকে শুরু করে পরিশীলিত শাস্ত্রীয় নৃত্যের ধারা—সবকিছু ইতালির মঞ্চে মেলে ধরার প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।” তাঁর কণ্ঠে যখন ওঠে “মৌলভীবাজার ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পতাকাকে আমি ইতালির আকাশে সমুন্নত রাখব”—সমগ্র মিলনায়তন করতালিতে ফেটে পড়ে।
![]()
প্রতিবেদনের শেষাংশে বলা যায়, নাজিয়া আক্তার চৌধুরী টুনির ইতালি যাত্রা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; বরং এটি গোটা জেলা ও দেশের জন্য এক গর্বের মুহূর্ত। এমন একজন নৃত্য প্রশিক্ষক, যিনি নিজের শিকড়ের টান বুকে ধরে বিদেশের মাটিতে বাঙালিয়ানার ছন্দ ছড়িয়ে দিতে যাচ্ছেন—এর চেয়ে প্রেরণার আর কী থাকতে পারে! জেলা জাসাসের এই আয়োজন প্রমাণ করে, সমাজের সংস্কৃতিকর্মীরা কতটা শ্রদ্ধা ও যত্নের পাত্র। শেষ কথা—ইতালি থেকে হয়তো একদিন ফিরবেন টুনি, কিন্তু তাঁর এই প্রস্থান যেন এক যুগের সূচনা। সাংস্কৃতিক দূত হয়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়া এই কৃতী নৃত্যশিল্পীর হাত ধরে মৌলভীবাজারের ছন্দ পৌঁছুক বিশ্বের নানা প্রান্তে—এই প্রত্যাশাই আজ প্রতিটি শ্রদ্ধাভরা করতালির মধ্যে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
![]()
![]()
![]()
![]()











পাঠকের মন্তব্য