![]()
সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই পেশায় ছিলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী। প্রায় সাড়ে তিন দশকের কর্মজীবনে দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্র, বিবিসি ও টেলিভিশনে সাংবাদিকতা করেছেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়ার সময়ই জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (নিপোর্ট) গবেষক হিসেবে কাজ করেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। পরে সেভ দ্য চিলড্রেনের একটি গবেষণা প্রকল্পে টিম লিডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
![]()
১৯৮৯ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত সানডে এক্সপ্রেস পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতায় আসেন তিনি। প্রায় দুই বছর সেখানে কাজ করার পর ১৯৯১ সালে এস এম আলী সম্পাদিত ডেইলি স্টারে কূটনৈতিক প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে ১৯৯৩ সালের মার্চ পর্যন্ত কাজ করেন।
১৯৯৩ সালের অক্টোবরে ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেন তৌফিক খালিদী। ১৯৯৫ সালের মার্চ পর্যন্ত সেখানে কাজ করার সময় কূটনীতি, রাজনীতি ও জাতীয় সংসদ কাভার করার পাশাপাশি তেল-গ্যাসের নেগোসিয়েশন, অর্থনৈতিক অবকাঠামো ও বাণিজ্য চুক্তিতে দুর্নীতির অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন।
১৯৯৫ সালের মার্চে ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি উপসম্পাদকীয় লেখা শুরু করেন। সেখানে কাজ করেন ১৯৯৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত।
এরপর সাংবাদিকতা থেকে পাঁচ মাসের বিরতি নিয়ে নদীভাঙন নিয়ে কাজ করা একটি নেতৃস্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় আর্থ-সামাজিক ও যোগাযোগ পরামর্শক হিসেবে যুক্ত হন। ওই সময় বিশ্ব ব্যাংকের একটি পরিদর্শন প্যানেলের প্রতিবেদনে সহলেখক ছিলেন তিনি। বিশ্ব ব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে নির্মিত যমুনা সেতু প্রকল্পের কারণে কয়েক লাখ মানুষের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছিল।
১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্যারিসভিত্তিক ইউরোপ ফাউন্ডেশনের ফেলো হিসেবে ‘ইউরোপ’ নামের ত্রৈমাসিক জার্নালের মাধ্যমে আবার সাংবাদিকতায় ফেরেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত সেখানে ইউরোপীয় বিভিন্ন বিষয়ে লিখেছেন।
১৯৯৭ সালের আগস্টে ডেইলি স্টারে ফিরে বাণিজ্য ও অর্থনীতি ডেস্কের প্রধান হন। ১৯৯৮ সালের জুলাই পর্যন্ত পত্রিকার অর্থ-বাণিজ্যবিষয়ক খবর ও বিশ্লেষণের সমন্বয় ছিল তার দায়িত্বে।
১৯৯৮ সালের আগস্টে ডেইলি স্টারের যুগ্ম বার্তা সম্পাদক হন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। ২০০০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দৈনন্দিন খবরের পরিকল্পনা, সম্পাদনা ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
এর মধ্যে ১৯৯৯ সালের মার্চে ডেইলি স্টারের ‘উইকেন্ড এডিশন’-এর বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বও নেন। ২০০০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিশেষ সংস্করণটির পরিকল্পনা ও সম্পাদনার পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে সাম্প্রতিক ঘটনাবিষয়ক বড় সাক্ষাৎকারও করতেন।
২০০০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে যোগ দেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। ২০০৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সেখানে সংবাদ ও কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স অনুষ্ঠান প্রযোজনা ও উপস্থাপনা করেন।
বিবিসিতে বড় আন্তর্জাতিক ঘটনাবলিতে বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি ও উপস্থাপনার পাশাপাশি ফিচার, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সাময়িকী অনুষ্ঠান করতেন তিনি। বহুল আলোচিত ‘ডিবেট’ অনুষ্ঠানও সঞ্চালনা করতেন।
২০০৫ সালের জুলাই থেকে এক বছর বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
এরপর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পাশাপাশি ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের সঙ্গেও যুক্ত হন তিনি। ২০১০ সালের শেষ দিক থেকে ২০১১ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বেসরকারি এই টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক ছিলেন। ওই সময় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।
সহপাঠীর চোখে তৌফিক
সাংবাদিকতাই যে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর ধ্যানজ্ঞান ছিল, সে কথা বলেন তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা।
তিনি বলেন, ‘সে আমার ক্লাসমেট ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা একই ক্লাসে পড়তাম। তৌফিক অত্যন্ত ট্যালেন্টেড ছিল। সেই ট্যালেন্টটা তার ছাত্রজীবনেই বোঝা যেত। এ রকম ট্যালেন্টেড ছিল যে আমার মনে হয়েছে, সে এক সময় কোথাও একটা যাবে, খুব ভালো একটা জায়গায়।’
তৌফিকের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করে মাহবুবা ফারজানা বলেন, ‘আমরা খুব ভালো ব্যাচমেট ছিলাম। ইংরেজিতে পড়ার সময় ও পড়াশোনা করে পরীক্ষাটা দিত ঠিকঠাক মতো। অনেক সময় দেখা যেত, একসঙ্গে আলোচনা করে পরীক্ষা দিতাম, পড়াশোনা করতাম। তাকে পড়তে বলতাম। অনেক সময় বলতাম যে, তুমি বইটা নিয়ে বসো।’
তৌফিক বিবিসি ছেড়ে দেশে ফিরে নতুন কাজে যুক্ত হওয়ার সময়ের কথাও স্মরণ করেন তিনি। মাহবুবা ফারজানা বলেন, ‘তখন আমি বলতাম, তুমি যে বিবিসি থেকে চলে তুমি আসলে, এখন কী করবা? তোমার তো একটা জায়গায় যাওয়া উচিত। তো বলে, ‘আমি জানি না কী করব’। তো যাই হোক, সে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম যখন করল, তখন আমার খুব ভালো লেগেছে। সে একটা জায়গায় গেল। মানে আমার খুব তখন ভালো লাগত।’
তথ্য সচিব হওয়ার পর যোগাযোগ বাড়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রত্যেক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যাই, সে আমাকে অত্যন্ত সম্মান করত। বন্ধু হিসেবে খুব ভালো একটা বন্ধু ছিল। একটা বন্ধু হারালাম এবং আসলে খুব ট্যালেন্টেড একজন সাংবাদিক হারালাম।’
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সাংবাদিক হিসেবে কাজ ও বিভিন্ন সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
২০১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত সাউথ-টু-সাউথ মিডিয়া ডায়ালগে এশিয়া-প্যাসিফিক, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের ‘১৪ জন শীর্ষস্থানীয় ডিজিটাল মিডিয়া উদ্ভাবক’-এর একজন হিসেবে স্বীকৃতি পান তিনি।
২০১০, ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৯ সালে জার্মানির বনে গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামে অংশ নেন। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ রাইজিং’ শীর্ষক সম্মেলনে প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন।
২০১৬ সালে ইউনেস্কো আয়োজিত বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে পর্যবেক্ষক হিসেবেও অংশ নেন তিনি।
সাংবাদিকতার বাইরে বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা প্রণয়ন ও পর্যালোচনার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটির ২০১২ ও ২০১৫ সালের কমিটিতে মনোনীত সদস্য ছিলেন তিনি।
এ ছাড়া, ২০০৮ সালে বার্তা সংস্থাগুলোর নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি এবং ২০০৭ সালে ঢাকার নদী রক্ষার জন্য গঠিত জাতীয় টাস্কফোর্সের সদস্য হিসেবেও কাজ করেছেন।
সাংবাদিকতার দীর্ঘ কর্মজীবনে সংবাদপত্র, আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম, টেলিভিশন ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার বিভিন্ন পরিসরে কাজ করে নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
উল্লেখ্য, ব্যক্তিগত সফরে লন্ডনে থাকা তৌফিক ইমরোজ খালিদী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) রাতে তাকে লন্ডনের সেইন্ট বার্থোলমিউ’স হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে স্থানীয় সময় শুক্রবার (২ অক্টোবর) দুপুর ২টা ২৩ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর।









