কিস্তির প্রলোভনে নারীদের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ, হাতেনাতে আটক পরিমলকে ৪০ হাজার টাকায় ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ; ক্ষোভে উত্তাল শ্রীমঙ্গল
![]()
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল পৌর শহরের চৌমুহনা এলাকায় কিস্তিতে সহজ শর্তে মোবাইল ফোন দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক মুসলিম তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে পরিমল দেবনাথ নামে এক স্থানীয় ব্যবসায়ীকে আটক করেছে জনতা। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৮ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৭টার দিকে চৌমুহনা এলাকার ‘টি টাউন গেস্ট হাউজ’-এ ওই তরুণীসহ অবস্থানকালে স্থানীয় জনতা তাকে হাতেনাতে আটক করেন।
![]()
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিমল দীর্ঘদিন ধরে সহজ শর্তে ও কিস্তিতে মোবাইল ফোন বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে অসচ্ছল তরুণীদের ফাঁদে ফেলে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন। অভিযুক্ত পরিমল দেবনাথ উত্তর সুর লামাপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং মক্কা মার্কেটের গীতা টেলিকমের মোবাইল শোরুমের মালিক।
![]()
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, জনতার হাতে আটক হওয়ার পর কয়েকজন যুবক নাটক সাজিয়ে পরিমলকে থানায় নেওয়ার কথা বলে কলেজ রোডে নিয়ে যায় এবং সেখানে ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাকে ছেড়ে দেয় নয়াগাঁও এলাকার মৃত কাচন মিয়ার ছেলে রাজন ও তার সঙ্গীরা।
এদিকে ঘটনার পরপরই রুমে অবরুদ্ধ পরিমলের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হলে মক্কা মার্কেটের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক নারী মন্তব্য করে দাবি করেছেন, পরিমল বহু মুসলিম নারীর জীবন নষ্ট করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিমলের টার্গেট ছিলেন স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা পড়ুয়া শিক্ষার্থী এবং প্রবাসীদের স্ত্রীরা। গীতা টেলিকম চালু করার পর থেকে তিনি এখন পর্যন্ত বহু নারীকে ভোগ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিমলের এসব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক কামাল হোসেন ও সদস্য আমজাদ হোসেন বাচ্চু অবগত আছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
জানা যায়, পরিমলের পৃষ্ঠপোষকতা করেন সদর ইউনিয়নের একজন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী, যিনি পরিমলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে পরিচিত। ওই চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারণা ও ঈদ শুভেচ্ছার ব্যানারে শহরজুড়ে পরিমলের সঙ্গে তার ছবি দেখা যায়। ২০২৩ সালের ২০ অক্টোবর মক্কা মার্কেটের মালিক শামীর মিয়ার গায়ে হাত তোলার অপরাধে পরিমলের পক্ষে এসে ওই চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীকে জেলে যেতে হয়েছিল বলেও জানা যায়।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে প্রায় ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে আপস-মীমাংসার চেষ্টা চলছে। তবে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি রফা করার এই চেষ্টার সত্যতা নিরপেক্ষ কোনো সূত্র থেকে এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক হাজী কামাল হোসেন বলেন, “পরিমলের বিরুদ্ধে আগেও এমন অভিযোগ আসছে। গতকালের বিষয়ে বিভিন্ন জন আমাকে জানিয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও দেখেছি। আমরা মার্কেট কমিটি ও মার্কেটের মালিক পক্ষের সাথে আলোচনা করবো কী করা যায়। এমন ঘটনা সমাজের জন্য ক্ষতিকর।”
মক্কা মার্কেটের একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জানিয়েছেন, পরিমলের নামে এমন অভিযোগ নতুন নয়। তিনি মুসলিম নারী ও প্রবাসীদের স্ত্রীদের মোবাইল ফোন বাকিতে ও কিস্তিতে দিয়ে ট্র্যাপে ফেলে হোটেলে নেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সত্য। যতবারই তিনি বিপদে পড়েন, তাকে নয়াগাঁও এলাকার শহরের কিছুজন বাঁচিয়ে নেয়।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও যুবসমাজের প্রতিনিধিরা ঘটনাটির তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, “কোনো ধরনের প্রভাব, অর্থ বা সামাজিক পরিচয়ের তোয়াক্কা না করে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কোনো অপরাধী যেন পার পেয়ে না যায় এবং অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”
এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ ও জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন শ্রীমঙ্গলের সাধারণ মানুষ।
শ্রীমঙ্গল শহর এখন ক্ষোভে ফুটছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এক প্রশ্নে সরব: একজন ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে দীর্ঘদিন ধরে যিনি মোবাইলের প্রলোভনে অসহায় মুসলিম নারীদের জীবন ধ্বংস করে আসছেন এবং প্রভাবশালী চক্রের ছায়ায় বারবার রক্ষা পেয়েছেন—তার বিরুদ্ধে কেন এখনো গ্রেপ্তারি নেই? প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি এখনই নিরপেক্ষ তদন্ত করে অভিযুক্তকে আইনের আওতায় না আনে এবং প্রভাবশালী চক্রের প্রভাব থেকে সরে এসে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করে, তবে শ্রীমঙ্গলের সাধারণ মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধ্য হবে—আর তার দায়ভার সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকেই নিতে হবে।










পাঠকের মন্তব্য