![]()
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। সোমবার এশিয়ার বাজারে লেনদেনের শুরুতেই অপরিশোধিত তেলের দুই প্রধান মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে ইরান ও কাতারের সরকারি কর্মকর্তারা টানা তৃতীয় দিনের মতো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই আলোচনায় অগ্রগতির সম্ভাবনাই তেলের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সোমবার দুপুর ১২টার দিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৯ ডলার ৮০ সেন্টে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম কমে দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ৫০ সেন্টে। অয়েলপ্রাইস ডটকম ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এর আগে গত অক্টোবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। মাসের শেষ কার্যদিবস ৩০ অক্টোবর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৮ ডলারে ওঠে। ওই মাসে ব্রেন্টের দাম বেড়েছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে ডব্লিউটিআইয়ের দাম বৃদ্ধি পেয়েছিল ১৫ দশমিক ২ শতাংশ।
আগামীকাল ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে ইরানের সঙ্গে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এতে তেলের বাজারে বাড়তি চাপ পড়ে। নির্বাচন শেষে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক পদক্ষেপ আরও জোরালো হতে পারে—এমন আশঙ্কায় তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন ব্যবসায়ীরা।
তবে গত সপ্তাহে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার পর কূটনৈতিক আলোচনার খবর বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়েছে। বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার রয়টার্সকে বলেন, গত সপ্তাহে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির পর বাজারে কিছুটা সংশোধন হয়েছে।
তবে ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য ও অবস্থান আরও কঠোর হলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ওয়াটারার।
বিশ্লেষকদের মতে, এবার তেলের দাম আগের মতো বেশি না বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ চীনের চাহিদা কমে যাওয়া। দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ। পাশাপাশি চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বেড়েছে। আরও অনেক দেশও চীনের পথ অনুসরণ করে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি গতকাল রোববার বলেছেন, কাতারের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতেই এই আলোচনা চলছে। এতে অগ্রগতিও হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি জানান, ইরান প্রতিরক্ষা ও কূটনীতি—উভয় পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত বন্ধে কাতার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। তবে আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত মিললেও যুদ্ধের অবসান নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সমঝোতা হয়নি। ফলে তেলের বাজারে দুই ধরনের পরিস্থিতিই বিবেচনায় রয়েছে। একদিকে কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা, অন্যদিকে সংঘাত আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
তেলের দাম বাড়া-কমার ক্ষেত্রে ওপেক ও সহযোগী দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সাধারণত এই জোট উৎপাদন বাড়ালে তেলের দাম কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বিপরীতে উৎপাদন কমালে দাম বাড়তে পারে। তবে তেলের দাম শুধু উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না। চাহিদা, মজুত, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি, পরিবহন ব্যয় এবং ডলারের বিনিময়মূল্যও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চলমান অনিশ্চয়তার মধ্যেও ডিসেম্বর মাসে তেল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অপরিবর্তিত রেখেছে ওপেক প্লাস। গতকাল সৌদি আরব, রাশিয়াসহ জোটের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদেশের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন বাড়ানো বা কমানোর বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে জোটটি। আগামী ২৯ নভেম্বর ওপেক প্লাসের পরবর্তী বৈঠকে ২০২৭ সালের উৎপাদন নিয়ে আলোচনা হতে পারে।










