শ্রমিক দিবসে সাংবাদিকদের প্রশ্ন: আমরা কি সত্যিই শ্রমিক?

ছবি মুক্তিবাণী
ছবি মুক্তিবাণী
এস এম মেহেদী হাসান

আজ ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। শ্রমের মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের স্মারক এই দিন। ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিকদের ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে সংঘটিত আন্দোলনের রক্তাক্ত ইতিহাস থেকেই দিবসটির সূচনা। পরবর্তীতে সেকেন্ড ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বব্যাপী শ্রমিক সংহতির প্রতীক হিসেবে ১ মে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

শ্রমিক দিবস এলেই শ্রমিক অধিকার, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মস্থলের মর্যাদা নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন প্রায় অনুচ্চারিত থেকে যায়—বাংলাদেশের সাংবাদিকরা কি সত্যিই শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি ও অধিকার পাচ্ছেন?

সাংবাদিকতা: পেশা না পরিচয়?

বাংলাদেশে সাংবাদিকতা আইনগতভাবে শ্রমঘন পেশা হিসেবে বিবেচিত। সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন শ্রম অধিদপ্তরের আওতায় নিবন্ধিত। জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে), ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা সাংবাদিক ইউনিয়ন বিদ্যমান।

কাগজে-কলমে কাঠামো শক্তিশালী হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। নবম, অষ্টম, সপ্তম কিংবা ষষ্ঠ ওয়েজবোর্ড থাকলেও দেশের অধিকাংশ সাংবাদিক নিয়মিত বেতন-ভাতা পান না। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ সাংবাদিক মাসিক বেতন ছাড়াই কাজ করছেন। তাদের আয়ের প্রধান উৎস বিজ্ঞাপনের কমিশন—যা শ্রমিক অধিকার নয়, বরং অনিশ্চিত নির্ভরতা

হাতে গোনা কয়েকটি জাতীয় পত্রিকায় ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়িত হলেও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তা কার্যত অকার্যকর।

ইউনিয়ন আছে, শ্রম অধিকার নেই

সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষার জন্য অসংখ্য সংগঠন থাকলেও তাদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক জেলার সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক নিজেরাই নিয়মিত বেতন পান না—এমন তথ্য বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, সংগঠনের পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি দপ্তর থেকে বিজ্ঞাপন সংগ্রহ বা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ নিশ্চিত করাই যেন প্রধান কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে। অথচ সাংবাদিক ইউনিয়নের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত সদস্যদের চাকরির নিরাপত্তা, ন্যায্য বেতন কাঠামো এবং পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা।

পেশাদার সাংবাদিকতার সংকট

বর্তমান বাস্তবতায় সাংবাদিক পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে পেশাগত পরিচয়ের পাশাপাশি সামাজিক প্রভাব অর্জনের মাধ্যমেও পরিণত হয়েছে। ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায়ী, আইনজীবী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক, ব্যাংকার কিংবা বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও সাংবাদিক পরিচয়ে যুক্ত হচ্ছেন।

গণমাধ্যম অঙ্গনের ভেতরেই প্রায়শই অভিযোগ শোনা যায়—কিছু প্রতিষ্ঠানে অর্থের বিনিময়ে প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিকতা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি জবাবদিহিতাও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বিভিন্ন সময়ে কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকারি অফিস, বালুমহাল বা অন্যান্য খাত থেকে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব ঘটনা পুরো সাংবাদিক সমাজকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

মফস্বল পর্যায়ের কিছু গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে আরও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন রিপোর্টারের নামে ব্যাংক হিসাবে বেতন জমা দেখানো হলেও বাস্তবে তারা সেই অর্থ পান না। কখনও কখনও ব্যাংক হিসাবের নিয়ন্ত্রণও প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকে। ফলে সাংবাদিকতা পেশা অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক চাকরি নয়, বরং অনিশ্চিত শ্রমে পরিণত হচ্ছে।

নীরবতার সংস্কৃতি

সাংবাদিক সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও নিজেদের শ্রম অধিকার প্রশ্নে এক ধরনের নীরবতা লক্ষ করা যায়। রাজপথে নানা ইস্যুতে আন্দোলন থাকলেও সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন, ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন ও পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন তুলনামূলকভাবে কম।

শ্রমিক দিবস তাই আমাদের সামনে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে ধরে—যারা সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেন, তারা নিজেরাই কি শ্রমিক হিসেবে ন্যায্য অধিকার পাচ্ছেন?

যদি সাংবাদিক নিরাপদ না হন, যদি তার শ্রমের মূল্য নিশ্চিত না হয়, তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়বে।

শ্রমিক দিবসের শিক্ষা স্পষ্ট—শ্রমের মর্যাদা নিশ্চিত না হলে কোনো পেশাই টেকসই হয় না। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার সুযোগ নেই।

মুক্তিবাণী

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও