সন্ত্রাসীর নামে শতকোটি টাকার জমি, প্রশাসন কি কিছুই জানত না?

ফাইল ছবি
ফাইল ছবি
এস এম মেহেদী হাসান

“জঙ্গল সলিমপুরের ঘটনা শুধু জমি রেজিস্ট্রির অনিয়ম নয়, এটি রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব, প্রশাসনের দায়িত্ব এবং আইনের শাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন”

ফাইল ছবি

বাংলাদেশের প্রশাসন কোথায়? আইন কি শুধু সাধারণ মানুষের জন্য? একজন সাধারণ মানুষ জমির কাগজে সামান্য ভুল করলে তাকে দিনের পর দিন ভূমি অফিস, সাবরেজিস্ট্রি অফিস কিংবা আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হয়। অথচ একজন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, যার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা হত্যার অভিযোগ রয়েছে, তার নামে থাকা শতকোটি টাকার জমি মাত্র এক দিনে রেজিস্ট্রি হয়ে যায়—এমন খবর যখন সামনে আসে, তখন এসব প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের ঘটনা আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভেতরের দুর্বলতা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। সংবাদে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিনের নামে থাকা ৬৫টি জমির দলিল মাত্র এক দিনের ব্যবধানে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন সীতাকুণ্ডের সাবরেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব। বাজারমূল্য অনুযায়ী এসব জমির দাম প্রায় ১০০ কোটি টাকা। অভিযোগ উঠেছে, প্রায় দুই কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে এই দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করছে আইন মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগ প্রমাণের আগে কাউকে অপরাধী বলা যায় না। সাবরেজিস্ট্রারের বক্তব্যও তদন্তে বিবেচনায় নিতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যেসব জমি নিয়ে সরকারি মালিকানার অভিযোগ রয়েছে, যাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি মামলার অভিযোগ এবং যিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পলাতক হিসেবে পরিচিত, তাঁর এত বিপুল সম্পত্তি হঠাৎ এক দিনে বিক্রির দলিল কীভাবে সম্পন্ন হলো? সংশ্লিষ্ট অফিস কি বিষয়টি যাচাই করার প্রয়োজন মনে করেনি?

এটি কোনো সাধারণ জমি কেনাবেচার ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরকারি খাসজমি, জমির মালিকানা, সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রভাব এবং প্রশাসনের দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন।

জঙ্গল সলিমপুরে রাষ্ট্রের উপস্থিতি কোথায়?

জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী তৎপরতা ও ভূমি দখলের অভিযোগে আলোচিত। সংবাদে বলা হয়েছে, ইয়াসিন বাহিনী ও রুকন মেম্বারের প্রভাবের কারণে এলাকার সাধারণ মানুষ আতঙ্কে থাকেন। সেখানে একাধিক উপদলও সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশ্ন হলো, একটি এলাকার সাধারণ মানুষ যদি নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকেন, তাহলে সেই এলাকার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?

রাষ্ট্রের কাজ শুধু অপরাধ ঘটার পর মামলা করা নয়। অপরাধের পরিবেশ তৈরি হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা। কোনো এলাকায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বছরের পর বছর প্রভাব বিস্তার করলে, সরকারি জমি দখলের অভিযোগ উঠলে, সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়লে প্রশাসনের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়।

গত ১৯ জানুয়ারি এক আসামিকে গ্রেপ্তারের অভিযানে গিয়ে র‌্যাবের এক কর্মকর্তা নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া হামলার শিকার হয়ে নিহত হন বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ইয়াসিনসহ তার বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আবার গত ২৪ মে গভীর রাতে রাস্তা কেটে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনা দেখায়, জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা গুরুতর।

একজন র‌্যাব কর্মকর্তা নিহত হলেন, যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা হলো, শত শত মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হলো—তারপরও প্রধান অভিযুক্ত ইয়াসিন অধরা। এর মধ্যে তাঁর নামে থাকা বিপুল সম্পত্তি বিক্রির দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ভূমি প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় কোথায়? একজন গুরুতর মামলার আসামির সম্পত্তি নিয়ে এমন ঘটনা ঘটার আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাছে কোনো তথ্য ছিল না?

খাসজমি ব্যক্তির সম্পত্তি হলো কীভাবে?

এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক জমির মালিকানা। সংবাদে বলা হয়েছে, ইয়াসিন জঙ্গল সলিমপুরের বিপুল পরিমাণ সরকারি খাসজমি বিভিন্ন কৌশলে নিজের নামে বিএস রেকর্ড করিয়ে নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব জমি পরে বিক্রির চেষ্টা চলছিল।

এখানে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। সরকারি খাসজমি কীভাবে ব্যক্তির নামে রেকর্ড হলো? কোন নথির ভিত্তিতে নামজারি করা হলো? ভূমি অফিসের কোন কর্মকর্তা এসব কাগজ যাচাই করেছেন? জমির খাজনা পরিশোধ করা থাকলেই কি জমির মালিকানা বৈধ হয়ে যায়? সরকারি জমি ভুলভাবে ব্যক্তির নামে রেকর্ড হয়ে থাকলে সেই ভুল সংশোধনের দায়িত্ব কার?

ভূমি প্রশাসনের একটি বড় সমস্যা হলো, কাগজে-কলমে মালিকানা তৈরি হয়ে গেলে অনেক সময় সেটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ কোনো জমির খতিয়ান, নামজারি বা খাজনা পরিশোধের কাগজ থাকলেই সব ক্ষেত্রে মালিকানা বৈধ হয়ে যায় না। জমির প্রকৃত মালিকানা এবং সরকারি স্বার্থ আছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।

সাবরেজিস্ট্রি অফিসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জমিগুলো ব্যক্তি মালিকানাধীন ছিল এবং ভূমি অফিসের কাগজপত্র অনুযায়ী ইয়াসিনের নামে নামজারি করা ছিল। এই বক্তব্যও তদন্তে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তবে কাগজপত্র ঠিক দেখালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে জমি নিয়ে বিরোধ, সরকারি মালিকানার অভিযোগ কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতা থাকলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে তথ্য যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার।

দুই কোটি টাকা ঘুষের অভিযোগ, তদন্ত কোথায়?

সাবরেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে প্রায় দুই কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। অভিযোগটি সত্য হলে এটি শুধু একজন কর্মকর্তার দুর্নীতি নয়; সরকারি দায়িত্বকে ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত করার ভয়াবহ উদাহরণ। আর অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া উচিত।

আরও একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। সংবাদ অনুযায়ী, রায়হান হাবীবের বদলির আদেশ হওয়ার পর নতুন কর্মস্থলে যোগদানের আগের দিন দলিলগুলো রেজিস্ট্রি করা হয়। এত অল্প সময়ে ৬৫টি দলিল সম্পন্ন করার প্রয়োজন কেন হলো? জমির মালিকানা, দলিলের বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় যাচাই করা হয়েছিল কি না? দলিলগুলো কার নামে হস্তান্তর করা হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু মৌখিক বক্তব্যে পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন নথি, রেজিস্ট্রি বই, অর্থ লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্তের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ জানানোর পর বদলির আদেশ সাত দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বলে সংবাদে উল্লেখ রয়েছে। এটি তদন্তের একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। কিন্তু জনগণ শুধু বদলি স্থগিতের খবর জানতে চায় না। তারা জানতে চায়, অভিযোগের সত্যতা কী? সরকারি জমি থাকলে তা উদ্ধারের ব্যবস্থা কী? দলিলগুলো বাতিল বা স্থগিত করার আইনগত ভিত্তি আছে কি না? অভিযুক্ত কর্মকর্তা বা অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?

প্রশাসনের ভেতরে যোগসাজশ থাকলে আইন চলবে কীভাবে?

আমাদের দেশে অনেক সময় অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়, কিন্তু তার সম্পদ, ব্যবসা ও প্রভাব ঠিকই চলতে থাকে। সন্ত্রাসী বাহিনী এলাকায় ভয় দেখায়, জমি দখলের অভিযোগ ওঠে, সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। অথচ এসব সম্পত্তির কাগজ তৈরি, নামজারি কিংবা দলিল রেজিস্ট্রির মতো কাজে সরকারি দপ্তরের ভূমিকা থাকে।

কোনো কর্মকর্তা যদি জেনেশুনে অবৈধ সম্পত্তির লেনদেনে সহযোগিতা করেন, তাহলে অপরাধী শুধু নিজের শক্তিতে এগোতে পারেন না; রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কোনো অংশও তাঁকে সুযোগ করে দেয়। আবার প্রশাসনের কেউ দায়িত্বে অবহেলা করলেও তার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। তাই শুধু একজন সাবরেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে তদন্ত করলেই হবে না। জমির রেকর্ড, নামজারি, খাজনা, দলিল প্রস্তুত এবং রেজিস্ট্রির প্রতিটি ধাপ পরীক্ষা করতে হবে।

একটি প্রশ্ন এখানে খুবই জরুরি: ইয়াসিনের বিরুদ্ধে এত গুরুতর অভিযোগ থাকার পরও তাঁর সম্পত্তি কেন নজরদারির বাইরে ছিল? তাঁর নামে থাকা সম্পত্তির প্রকৃত উৎস কী? সেগুলোর কোনো অংশ সরকারি জমি কি না? এসব বিষয় আগেই যাচাই করা হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো কি?

আইনের শাসন কি শুধু বক্তৃতায় থাকবে?

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অর্থ হলো—আইন সবার জন্য সমান হবে। একজন দরিদ্র মানুষ জমির কাগজে ভুল করলে যেমন জবাবদিহি করতে হয়, তেমনি শতকোটি টাকার সম্পত্তির মালিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তিকেও আইনের মুখোমুখি হতে হবে। একজন সরকারি কর্মচারী সাধারণ মানুষের কাছে ঘুষ চাইলে যেমন শাস্তি পাওয়ার কথা, তেমনি বড় অঙ্কের দুর্নীতির অভিযোগে জড়িত কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিতে হবে।

জঙ্গল সলিমপুরের ঘটনা তাই শুধু চট্টগ্রামের স্থানীয় সমস্যা নয়। এটি দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য একটি পরীক্ষা। তদন্ত যদি প্রভাবমুক্ত হয়, সরকারি জমি উদ্ধারের ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হয়, তাহলে মানুষের আস্থা ফিরতে পারে। কিন্তু তদন্ত যদি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে, কিছুদিন পর বিষয়টি চাপা পড়ে যায়, তাহলে সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজদের কাছে ভুল বার্তা যাবে।

প্রশাসনের দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা এবং আইনের প্রয়োগে নিরপেক্ষ থাকা। কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যদি একটি এলাকার জমি, মানুষের জীবন ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাহলে সেটি প্রশাসনের জন্য বড় ব্যর্থতা। আর সেই গোষ্ঠীর সম্পত্তি হস্তান্তরে সরকারি দপ্তরের কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলে বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের মানুষ আর শুধু তদন্ত কমিটি গঠনের খবর শুনতে চায় না। তারা দেখতে চায়, অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সরকারি জমি দখল হয়ে থাকলে তা উদ্ধার করা হচ্ছে। প্রশাসনের কেউ সহযোগিতা করলে তাঁরও বিচার হচ্ছে।

রাষ্ট্রের ক্ষমতা সন্ত্রাসী বা প্রভাবশালীদের সম্পদ রক্ষার জন্য নয়; রাষ্ট্রের ক্ষমতা সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য। জঙ্গল সলিমপুরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে শুধু একটি এলাকার মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, দেশের অন্যান্য এলাকার অপরাধী গোষ্ঠীও উৎসাহ পাবে। তাই এখন আর প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—বাংলাদেশের প্রশাসন কোথায়? আইনের শাসন কি আদৌ প্রতিষ্ঠিত হবে? সূত্র: দৈনিক যুগান্তর।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক

monir
Admin

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও