![]()
দিনের বেলায় যে কাশি সহনীয় মনে হয়, রাতে তা আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি থাকলে এ সমস্যা বাড়তে পারে। দূষিত বাতাস শ্বাসতন্ত্রে অস্বস্তি সৃষ্টি করে, শ্লেষ্মা বা মিউকাসের উৎপাদন বাড়ায় এবং শ্বাসনালিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। এর সঙ্গে অ্যালার্জি, হাঁপানি (অ্যাজমা) বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের মতো সমস্যা যুক্ত হলে রাতে নির্বিঘ্নে ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়ে।
দূষণজনিত কাশি রাতে কেন বাড়ে, তা জানা থাকলে শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়।
বায়ুদূষণ কীভাবে কাশির উদ্রেক করে?
বায়ুদূষণে বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস ও ক্ষুদ্র কণা থাকে, যা শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে পিএম২.৫ (PM2.5) বা সূক্ষ্ম বস্তুকণা ফুসফুসের গভীরে পৌঁছে অস্বস্তি ও প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে।
দূষিত বাতাস গলা ও ফুসফুসে অস্বস্তি তৈরি করে। এর ফলে শরীরে শ্লেষ্মার উৎপাদন বাড়ে এবং শ্বাসনালি পরিষ্কার করার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে কাশি দেখা দেয়।
যাদের হাঁপানি, অ্যালার্জি, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস বা শ্বাসতন্ত্রের অন্য কোনো সমস্যা রয়েছে, তারা এসব দূষকের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হতে পারেন। তবে আগে থেকে ফুসফুসের সমস্যা না থাকলেও দূষণের মাত্রা বেড়ে গেলে গলাব্যথা, কাশি ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
রাতে কাশি কেন বেড়ে যায়?
বিভিন্ন কারণে রাতে দূষণজনিত কাশি আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
গলার পেছনে শ্লেষ্মা জমা হওয়া
শুয়ে পড়লে নাক ও সাইনাস থেকে শ্লেষ্মা গলার পেছনের দিকে নেমে আসতে পারে। এ অবস্থাকে বলা হয় পোস্ট-নাসাল ড্রিপ। এটি বারবার কাশির উদ্রেক করতে পারে। অ্যালার্জি, সাইনাসের সমস্যা বা শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ থাকলে এমনটা বেশি দেখা যায়।
হাঁপানির উপসর্গ বেড়ে যাওয়া
দ্য টোকাই জার্নাল অফ এক্সপেরিমেন্টাল অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল মেডিসিনে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, হাঁপানিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের উপসর্গ রাতে আরও তীব্র হতে পারে। কারণ, ঘুমের সময় শ্বাসনালি বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। দিনের বেলায় দূষণের কারণে শ্বাসতন্ত্রে অস্বস্তি তৈরি হলে রাতে তা কাশি, শ্বাসকষ্ট বা বুকে অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
অ্যাসিড রিফ্লাক্সে গলায় অস্বস্তি
শুয়ে পড়লে পাকস্থলীর উপাদান খাদ্যনালি ও গলার দিকে উঠে আসার প্রবণতা বাড়ে। অ্যাসিড রিফ্লাক্স (acid reflux) নামে পরিচিত এ অবস্থায় গলায় অস্বস্তি তৈরি হতে পারে এবং কাশি হতে পারে। বিশেষ করে রাতে দেরি করে বা অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার পর এ সমস্যা বাড়তে পারে।
ঘরের ভেতরের দূষকেও বাড়তে পারে অস্বস্তি
বাইরের দূষণ এড়াতে ঘরে ফিরলেও ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না। সিগারেটের ধোঁয়া, ধূপ, মশার কয়েল, রান্নার ধোঁয়া ও ধূলিকণা শ্বাসতন্ত্রে আরও অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে। বাইরের দূষণের কারণে শ্বাসনালিতে আগে থেকেই প্রদাহ থাকলে ঘরের ভেতরের এসব উপাদান কাশি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
অতিরিক্ত দূষণের দিনে রাতে কাশি কমানোর উপায়
কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে দূষকের সংস্পর্শ কমানো এবং গলার অস্বস্তি থেকে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া সম্ভব।
স্থানীয় এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) বা বায়ুমান সূচক পরীক্ষা করুন। দূষণের মাত্রা বেশি থাকলে বাইরে ব্যায়াম করা এবং দীর্ঘ সময় বাইরে থাকা এড়িয়ে চলুন। সম্ভব হলে ঘরের ভেতরে অপেক্ষাকৃত নির্মল পরিবেশে ব্যায়াম করুন।
ঘরের ভেতরের বাতাসের মান উন্নত করুন। বাইরে দূষণ বেশি থাকলে এবং ঘরের বাতাস বাইরের তুলনায় পরিষ্কার হলে জানালা বন্ধ রাখুন। সম্ভব হলে HEPA ফিল্টারযুক্ত উপযুক্ত এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করুন।
ঘরের ভেতরে অস্বস্তি বাড়ায় এমন উপাদান এড়িয়ে চলুন। ঘরের মধ্যে ধূমপান করবেন না। পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা নেই, এমন কক্ষে ধূপ বা মশার কয়েল জ্বালানো থেকে বিরত থাকুন। ধুলাবালি কমানোর চেষ্টা করুন এবং রান্নার ধোঁয়ার সংস্পর্শ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন। এতে গলার অস্বস্তি কমতে পারে এবং শ্লেষ্মা বা কফ অতিরিক্ত ঘন হয়ে যাওয়া রোধ করা সম্ভব।
শোয়ার ভঙ্গিতে পরিবর্তন আনুন। পোস্ট-নাসাল ড্রিপ (নাক থেকে গলার পেছনে শ্লেষ্মা নেমে আসা) বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের কারণে কাশি হলে মাথা কিছুটা উঁচুতে রেখে ঘুমালে আরাম পাওয়া যেতে পারে।
বিদ্যমান শারীরিক সমস্যার যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করুন। হাঁপানি (অ্যাজমা) থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা মেনে চলুন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ হাতের কাছে রাখুন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বন্ধ করবেন না বা পরিবর্তন করবেন না।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে আসার পর সাময়িক কাশি হতে পারে, যা অস্বস্তি কমে গেলে সাধারণত সেরে যায়। তবে দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার ফিরে আসা কাশির কারণ যে শুধু বায়ুদূষণ, তা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
কাশি তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে, বারবার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটালে অথবা ঘন ঘন ফিরে এলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এ ছাড়া তীব্র শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, কাশির সঙ্গে রক্ত পড়া বা ঠোঁট নীল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিন।









