![]()
কার্তিক মাস এলেই গ্রিন লিফহপারের আনাগোনা বেড়ে যায়। স্থানীয়ভাবে অনেকেই এই পোকাকে শ্যামা পোকা বলে চেনেন। ইংরেজিতে এর নাম গ্রিন লিফহপার, বাংলায় বলা হয় সবুজ পাতা ফড়িং।
গ্রিন লিফহপার ছোট আকারের সবুজ রঙের একধরনের পোকা। এর শরীর সাধারণত সরু ও কিছুটা ত্রিকোণাকৃতির। গাছের পাতা ও কাণ্ডে বসে এরা খাবার সংগ্রহ করে। মুখের অংশ অনেকটা সরু সুচের মতো। এই অংশ দিয়ে গাছের কোষ ছিদ্র করে ভেতর থেকে রস শুষে নেয়। তবে গ্রিন লিফহপার বলতে একটি নির্দিষ্ট প্রজাতিকে বোঝায় না। কাছাকাছি বৈশিষ্ট্যের একাধিক প্রজাতির পোকা এই নামে পরিচিত।
বাংলাদেশেও ধানখেতের পোকামাকড় নিয়ে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত এক গবেষণায় ১০ প্রজাতির লিফহপার ও পাঁচ প্রজাতির প্ল্যান্টহপারের সন্ধান পাওয়া গেছে। ফলে শুধু রং বা আকার দেখে কোনো পোকাকে নির্দিষ্ট প্রজাতির বলে শনাক্ত করা কঠিন। গ্রিন লিফহপার ধানের ক্ষতিকর পোকা হিসেবে পরিচিত। ধানগাছের রস শুষে খাওয়ার পাশাপাশি কিছু প্রজাতি ধানে টুংরো ভাইরাস ছড়াতেও ভূমিকা রাখে। এতে আক্রান্ত গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে এবং ফলন কমে যেতে পারে।
গ্রিন লিফহপারসহ অনেক উড়ন্ত পোকাকে রাতে কৃত্রিম আলোর আশপাশে উড়তে দেখা যায়। ঘরের বাতি, রাস্তার বাতি কিংবা দোকানের উজ্জ্বল আলো তাদের স্বাভাবিক চলাচলে প্রভাব ফেলে। তবে পোকাগুলো সব সময় সরাসরি আলোর দিকে ছুটে আসে না।
২০২৪ সালে ‘নেচার কমিউনিকেশন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা উচ্চগতির ক্যামেরা ও ত্রিমাত্রিক গতিপথ বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিভিন্ন পোকাকে কৃত্রিম আলোর আশপাশে উড়তে পর্যবেক্ষণ করেন। এতে দেখা যায়, অনেক পোকা আলোর দিকে পিঠ ফিরিয়ে রাখার চেষ্টা করে।
প্রাকৃতিক পরিবেশে আকাশ সাধারণত চারপাশের তুলনায় বেশি উজ্জ্বল থাকে। অনেক উড়ন্ত পোকা আকাশের উজ্জ্বল অংশকে ওপরের দিক নির্ধারণের সংকেত হিসেবে ব্যবহার করে। এর ফলে উড়ার সময় শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হয়। বিজ্ঞানীরা এই আচরণকে বলেন ‘ডরসাল লাইট রেসপন্স’।
সহজভাবে বললে, পোকাগুলোর শরীরের পিঠ সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকের দিকে রাখার প্রবণতাই ডরসাল লাইট রেসপন্স। কিন্তু রাতে ঘরের বাতি বা রাস্তার আলো এই স্বাভাবিক সংকেতকে বিভ্রান্ত করতে পারে। তখন পোকা কৃত্রিম আলোকে ওপরের দিক ভেবে শরীর ঘোরাতে থাকে। ফলে সোজা পথে উড়ে যাওয়ার পরিবর্তে আলোর চারপাশে ঘুরপাক খায়। কখনো একই জায়গায় বারবার চক্কর দিতে থাকে।
কার্তিক মাসে গ্রিন লিফহপার বেশি দেখা যাওয়ার পেছনে ঋতু পরিবর্তন ও ধানখেতের অবস্থার ভূমিকা থাকতে পারে। এ সময় আমন ধান পাকে। ধানগাছের পাতা ও কাণ্ড থেকে রস শুষে খাওয়া সবুজ পাতা ফড়িংয়ের জন্য ধানখেত একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উৎস। বাংলাদেশের গাজীপুরে ছয় বছর ধরে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সবুজ পাতা ফড়িংয়ের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি ছিল অক্টোবর মাসে। এরপরই ছিল নভেম্বর।
তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও বাতাসের আর্দ্রতাও এদের সংখ্যা ওঠানামায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কার্তিক মাসে সব পোকা একসঙ্গে ডিম পাড়ে বলেই এদের সংখ্যা বেড়ে যায়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। প্রজাতিভেদে এদের প্রজনন ও জীবনচক্র ভিন্ন। আবার ধানখেতে পোকা বাড়লেই বাসাবাড়িতে এদের সংখ্যা বাড়বে, এমনটিও সব সময় ঘটে না।
গ্রিন লিফহপার মানুষের রক্ত খায় না। এদের মুখের অংশ মূলত গাছের কোষ ছিদ্র করে রস শুষে নেওয়ার উপযোগী। তাই মশা বা ছারপোকার মতো মানুষের রক্ত খাওয়ার জন্য এরা আসে না। তবে কিছু প্রজাতির লিফহপার ভুলবশত মানুষের ত্বকে মুখের অংশ ফুটিয়ে দিতে পারে। ২০১৩ সালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনামূলক গবেষণায় মানুষের ত্বকে এভাবে খোঁচা দেওয়া বা কামড়ানোর ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন দেশের পর্যবেক্ষণ একত্র করা হয়। গবেষণায় অন্তত ৩৯ প্রজাতির লিফহপারের এমন আচরণের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব পোকা শরীরে বসলে কখনো সুচ ফোটার মতো ব্যথা কিংবা হঠাৎ খোঁচা লাগার অনুভূতি হতে পারে।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এ কারণে সাময়িক অস্বস্তিও তৈরি হতে পারে। তবে এরা মানুষের রক্ত খায় না এবং সাধারণভাবে মানুষের জন্য বিপজ্জনক পোকা হিসেবেও পরিচিত নয়। কোনো পোকা শরীরে বসলে হাত দিয়ে ঝাপটা মেরে সরানোর পরিবর্তে আলতোভাবে সরিয়ে দেওয়া ভালো। কামড়ানোর মতো অনুভূতি হলে আক্রান্ত স্থান সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে নেওয়া যেতে পারে। অস্বস্তি থাকলে ঠান্ডা সেঁক দেওয়া যেতে পারে। তবে তীব্র ফোলা, শ্বাসকষ্ট কিংবা শরীরের অন্য কোথাও অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
গ্রিন লিফহপার ঘরে ঢোকা ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো দরজা-জানালা বন্ধ রাখা। পাশাপাশি জানালায় সূক্ষ্ম জাল বা নেট লাগানো যেতে পারে। সন্ধ্যায় ঘরের বাতি জ্বালানোর সময় দরজা-জানালা বন্ধ রাখলেও পোকা প্রবেশের আশঙ্কা কমে।
ঘরের বাইরের দরজা বা জানালার একেবারে কাছে উজ্জ্বল বাতি না রাখলে এ পোকার আনাগোনা কমানো যেতে পারে। বাতি জানালা থেকে কিছুটা দূরে রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় আলো বন্ধ রাখাও কাজে আসতে পারে। তবে এতে সব পোকা আসা বন্ধ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
আলোর রং বদলালেই গ্রিন লিফহপার আর ঘরে আসবে না, এমন ধারণারও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। বিভিন্ন প্রজাতির পোকা আলোর রং ও তীব্রতার প্রতি ভিন্নভাবে সাড়া দিতে পারে। তাই শুধু বাতির রং পরিবর্তনের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় আলো কমানো এবং দরজা-জানালা সুরক্ষিত রাখাই বেশি বাস্তবসম্মত।
ঘরে পোকা ঢুকে পড়লে সেগুলো মেরে ফেলার প্রয়োজন নেই। এ ক্ষেত্রে জানালা বা দরজা খুলে ঘরের বাতি নিভিয়ে বাইরের দিকে আলো জ্বালিয়ে দিন। এতে পোকাগুলো বাইরে যাওয়ার সুযোগ পাবে। দেয়াল বা মেঝেতে বসে থাকলে কাগজ কিংবা ছোট পাত্রের সাহায্যে ধরে বাইরে ছেড়ে দেওয়া যায়। ঘরের ভেতরে কীটনাশক ছিটানোরও প্রয়োজন নেই।
ইন্টারনেটে গ্রিন লিফহপার তাড়ানোর জন্য লেবু, মরিচ, কর্পূর কিংবা বিভিন্ন ধরনের তেলের মিশ্রণ ব্যবহারের পরামর্শ পাওয়া যায়। কিন্তু এসব উপাদান ঘর থেকে পোকা দূরে রাখে, এমন কোনো প্রমাণ নেই। বরং কর্পূর বা অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ ভুলভাবে ব্যবহার করলে মানুষের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।










