৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা

৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা
৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা
মুক্তিবাণী অনলাইন ডেক্স

৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা

৭ নভেম্বর ২০২৬। ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশের সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি শুধু একটি দিনের নাম নয়; বরং জাতির শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতীক।

বাংলাদেশের জন্ম, মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক উত্থান-পতন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি প্রবাদবাক্য বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য: “অতীত নিয়ে সবসময় পড়ে থাকলে এক চোখ অন্ধ, অতীতকে ভুলে গেলে দু’চোখই অন্ধ।” ইতিহাসকে অস্বীকার করা যায় না, আবার ইতিহাসের গণ্ডিতে আটকে থেকেও ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব নয়। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের পথ রচনা করাই একটি জাতির পরিপক্বতার পরিচয়। ৭ নভেম্বর আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়—স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে পথনির্ধারণী একটি দিন। যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল, যারা জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে দেশে একদলীয় স্বৈরাচারী শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল, যারা দেশের শৌর্য, বীর্য, সাহস ও সম্মানের প্রতীক সেনাবাহিনীর গৌরবকে ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিল—১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবে তাদের পরাজয় ঘটে। এই বিপ্লব প্রমাণ করে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার বিষয় নয়; এটি লাখো শহীদের রক্ত এবং কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষার ফসল।

১৯৭৫ সালের পটভূমি: চার দিনের অনিশ্চয়তা

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা শুরু হয়। এরপর একের পর এক সেনা অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশ অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি উচ্চাভিলাষী অংশ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়। তারা তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে বন্দি করে। এরপর বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয় এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদকে গ্রেপ্তার করা হয়। মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত ও জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রধান বিচারপতি আবু সা’দাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতির পদে বসানো হয়।

এ ঘটনায় সাধারণ জনগণ ও সিপাহিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সেনাবাহিনীর সর্বস্তরে, বিশেষ করে সাধারণ সিপাহিদের কাছে জিয়াউর রহমান ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। ফলে তাঁরা পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পরিকল্পনা করতে থাকেন। ৩ নভেম্বর থেকে ৬ নভেম্বর মধ্যরাত পর্যন্ত দেশ এক শ্বাসরুদ্ধকর, অনিশ্চিত ও ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে ছিল। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ে। কিন্তু ৬ নভেম্বর গভীর রাতে সেনাবাহিনীর সাধারণ সিপাহিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সেই অভ্যুত্থানে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন জানিয়ে আপামর জনতা রাজপথে নেমে আসে। সিপাহি-জনতার সম্মিলিত বিপ্লবে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। পাল্টা অভ্যুত্থান ঠেকাতে গিয়ে প্রাণ হারান খালেদ মোশাররফ ও তাঁর কয়েকজন অনুসারী।

পরদিন ৭ নভেম্বর সর্বস্তরের সৈনিক ও জনতা সম্মিলিতভাবে ঢাকার রাস্তায় নেমে আসেন। এই ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। সৃষ্টি হয় অভূতপূর্ব সংহতির নজির। ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে সংঘটিত সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লব ইতিহাসে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে স্থান লাভ করে। দেশবাসী সেদিন জিয়াউর রহমানের হাতেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেয়।

তৎকালীন দৈনিক বাংলার ৭ নভেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, “সিপাহি ও জনতার মিলিত বিপ্লবে চারদিনের দুঃস্বপ্ন শেষ হয়েছে। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১টায় সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনীর সিপাহি-জওয়ানরা বিপ্লবী অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন। ষড়যন্ত্রের নাগপাশ ছিন্ন করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছেন বিপ্লবী সিপাহীরা।”

৭ নভেম্বর ভোরে রেডিওতে ভেসে আসে, “আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি।” জেনারেল জিয়া জাতির উদ্দেশে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়ে সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।

সেদিন রাজধানী ঢাকা পরিণত হয়েছিল মিছিলের নগরীতে। পথে পথে সিপাহি-জনতা একে অপরকে আলিঙ্গন করেন। “নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর” ও “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস। আনন্দে উদ্বেলিত হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। সাধারণ মানুষ ট্যাঙ্কের নলে ফুলের মালা পরিয়ে দেন। রাজধানী ছাড়িয়ে আনন্দের এই ঢেউ পৌঁছে যায় দেশের সব শহর, নগর ও গ্রামে।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর ‘বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে ৭ নভেম্বর সম্পর্কে লিখেছেন, ১৯৭৫ সালের ৫ ও ৬ নভেম্বর ক্যান্টনমেন্টসহ পুরো শহরে হাজার হাজার প্রচারপত্র ছড়ানো হয়। একটি বিষয়ে ডান ও বাম—উভয় রাজনৈতিক দলই একমত ছিল যে খালেদ মোশাররফ একজন বিশ্বাসঘাতক, ভারতের দালাল এবং তিনি ঘৃণিত বাকশাল ও মুজিববাদ ফিরিয়ে আনতে চাইছেন। ৭ নভেম্বর ভোরের দিকে জওয়ানরা ব্যারাক থেকে বেরিয়ে আসেন। সারা ঢাকা শহরে এই ‘সিপাহি বিপ্লব’ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রাত ১টার মধ্যেই সিপাহিরা পুরো ক্যান্টনমেন্ট দখল করে নেন। একদল জওয়ান যান জেনারেল জিয়ার বাসভবনে। চার দিন বন্দি থাকার পর মুক্তি পান জেনারেল জিয়া। নৈশ পোশাক পরা অবস্থায় উল্লসিত জওয়ানরা তাঁকে কাঁধে করে নিয়ে যান ২ ফিল্ড আর্টিলারির হেডকোয়ার্টারে। ঘটনার আকস্মিকতায় জিয়া তখন বিহ্বল হয়ে পড়েন। নাম না জানা অনেক জওয়ানের সঙ্গে তিনি আলিঙ্গন ও করমর্দন করেন।

মাসকারেনহাস আরও লিখেছেন, রেডিওতে সিপাহি-জনতার বিপ্লবের ঘোষণা এবং জেনারেল জিয়ার ক্ষমতা গ্রহণের খবর ক্রমাগত প্রচারিত হতে থাকলে হাজার হাজার মানুষ স্রোতের মতো রাস্তায় নেমে আসেন। তিন দিন ধরে তাঁরা বিশ্বাস করছিলেন, ভারত খালেদ মোশাররফের মাধ্যমে তাঁদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতাকে বিপন্ন করছে। এখন সেই দুঃস্বপ্ন কেটে গেছে। সর্বত্র জওয়ান ও সাধারণ মানুষ আনন্দে একে অপরকে আলিঙ্গন করেন এবং রাস্তায় নেমে আসেন। সারা রাত তাঁরা স্লোগান দেন—“আল্লাহু আকবর, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ।” পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছিল, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের মতো এ দেশের মানুষ আবার জেগে উঠেছে। এটি ছিল একটি স্মরণীয় রাত।

৭ নভেম্বরের প্রকৃত তাৎপর্য

৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের প্রকৃত তাৎপর্য হলো—শাসক সমাজের ওপর বৈদেশিক মুরুব্বিয়ানার বাধ্যবাধকতা প্রত্যাখ্যান করে গণচেতনায় জাতিরাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং দেশবাসীর মনে সার্বভৌমত্বের গর্ববোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা। পঁচিশ বছর মেয়াদি শান্তি ও মৈত্রী চুক্তির অসম সম্পর্কের মায়াজাল এ দেশের অভিজাত সমাজে যে ভারতমুখাপেক্ষিতা ও হীনম্মন্যতার প্রসার ঘটিয়েছিল, দৃপ্ত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান তা ছিন্ন করেছিল। রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে উৎখাত হয়েছিল দিল্লির প্রাসাদকামী পরগাছার জঞ্জাল।

এই দিন থেকে জাতিরাষ্ট্রের আত্মমর্যাদাবোধ যে স্বকীয়তা, স্বনির্ভরতা ও আত্মোন্নতির উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল, তা আজও জাতিকে প্রেরণা জোগায়। যদিও ভূরাজনৈতিক চক্রান্তে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতা দিল্লির পদলেহী একটি পরিবারতন্ত্রের সংঘশক্তির করায়ত্ত হতে পারে; জাতিরাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও সংবিধানকে নস্যাৎ করে সেই শক্তি এ দেশকে বিশ্বের চোখে স্বশাসনের অযোগ্য প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লাগতে পারে; বাংলাদেশের ভারতভুক্তির একটি নীলনকশাও অনুসরণ করতে পারে—তবু নভেম্বর বিপ্লবে জাগ্রত দেশবাসী পদে পদে নতজানু ভারতমুখাপেক্ষী উদ্যোগগুলোকে জনমতের প্রাচীর দিয়ে প্রতিহত করেছে। জনস্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রের বিকলাঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমিত শক্তি দিয়েও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। চলমান বিশ্বব্যবস্থার সংঘাতপূর্ণ আবর্তে, আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের হুমকিতে কিংবা বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার গোলকধাঁধায় দেশবাসী পথ হারায়নি। রাষ্ট্রঘাতী চক্রান্তের মোকাবিলায় রাজপথে নেমেছে; প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে সোচ্চার হয়েছে। রাষ্ট্রঘাতী চক্রের কবল থেকে অচিরেই আবার রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে নেবে জাগ্রত জনতা—এই বিশ্বাসই ৭ নভেম্বরের চেতনা।

রেডিও বাংলাদেশে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে জেনারেল জিয়াউর রহমান ঘোষণা করেন, তিনি সাময়িকভাবে প্রধান আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। সেনাবাহিনীর অনুরোধে এবং দেশের তৎকালীন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই তিনি এ দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি বলেন, সাধ্য অনুযায়ী নিজের কর্তব্য পালন করবেন। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কঠোর পরিশ্রম করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে অবিলম্বে সবাইকে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন।

৭ নভেম্বর-পরবর্তী রাজনীতি ও জিয়াউর রহমান

৭ নভেম্বরের পর থেকে প্রতিটি সরকার দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করেছে। তবে ড. ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এ দিনের সরকারি ছুটি বাতিল করে এবং দিবসটি পালন থেকে বিরত থাকে। এর ধারাবাহিকতায় আঁতাতের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারও দিবসটি পালন করেনি। এর আগে ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ সরকারও দিবসটি পালন থেকে বিরত ছিল এবং সরকারি ছুটি বাতিল করেছিল। অথচ ৭ নভেম্বর জাতীয় জীবনের একটি ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সৈনিক-জনতা জাতীয় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। তাই ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক বিপ্লব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, তৎকালীন ক্ষমতাসীন মহলের নিজেদের স্বার্থে দেশের স্বাধীনতা বিকিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা এবং ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে মানুষের বাক্‌স্বাধীনতা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার হরণ করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করা হয়। ফলে দেশে চরম অশান্তি ও হতাশা নেমে আসে। বাকশালী সরকার অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী পন্থায় মানুষের ন্যায়সংগত প্রতিবাদ দমন করে। দেশমাতৃকার এই চরম সংকটকালে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর আধিপত্যবাদের এ দেশীয় এজেন্টদের কূটকৌশলে মহান স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করা হয়। এই অরাজক পরিস্থিতিতে স্বজাতির স্বাধীনতা রক্ষায় অকুতোভয় দেশপ্রেমিক সৈনিক এবং জনতার ঢল রাজপথে নেমে আসে। ৭ নভেম্বর সৃষ্টি হয় এক অনন্য সংহতির। ওই পটপরিবর্তনে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত হয় এবং গণতন্ত্র অগ্রগতির পথে এগিয়ে যায়। বহুদলীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। মানুষের মনে স্বস্তি ফিরে আসে। আধিপত্যবাদী শক্তি ও তাদের এ দেশীয় অনুচররা নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথে বাধা মনে করে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যা করে।

দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। একজন ঈমানদার মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম থাকা অপরিহার্য। দেশপ্রেম ও সততা একে অপরের পরিপূরক। যে দেশপ্রেমিক, সে অবশ্যই সৎ; আবার একজন সৎ মানুষের মধ্যেও দেশপ্রেম থাকে। একজন প্রকৃত নেতার মধ্যে অনেক গুণ থাকা আবশ্যক; এর মধ্যে দেশপ্রেম ও সততা অন্যতম। সততা ও দেশপ্রেমের কারণেই শহীদ জিয়া আমাদের প্রিয় নেতা ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। আমাদের বিশ্বাস, জিয়াউর রহমানের কট্টর সমালোচকও তাঁর সততা ও দেশপ্রেম নিয়ে কটূক্তি করতে পারবেন না। সততা ও দেশপ্রেমের প্রশ্নে আপসহীন এই মহান নেতা দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন।

জিয়াউর রহমানের জীবন ও মুক্তিযুদ্ধ

মুহাম্মদ মনসুর রহমান ও জাহানারা খাতুনের দ্বিতীয় পুত্র শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার বাগাবাড়ী গ্রামে তাঁর পিতামহের বসতবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শিশুকাল ও শৈশবের প্রথম অধ্যায় কেটেছে এই বাগাবাড়ী গ্রামেই। মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো শৈশব। কারণ, এ সময়েই নিজেকে আবিষ্কার করা এবং প্রকৃতির মধ্যে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি হয়। জিয়াউর রহমানও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না।

জিয়াউর রহমানের ডাকনাম ছিল ‘কমল’। কমল অর্থ পদ্ম। পিতা মুহাম্মদ মনসুর রহমান ও মাতা জাহানারা খাতুনের অত্যন্ত আদরের সন্তান ছিলেন তিনি। তাঁরা হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁদের এই সন্তান পদ্মের মতো নিজের গুণ, গরিমা ও প্রতিভায় বিকশিত হয়ে উঠবেন। পিতা-মাতার নিবিড় পরিচর্যায় বেড়ে উঠলেও তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে পিতামহ মৌলভী কামাল উদ্দিন মন্ডল এবং মাতামহী রহিমা খাতুনের প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ করা যায়। এ ছাড়া মাতামহ আবুল কাশেম আহম্মেদ, পিতামহী মিসির উন্নিসা বেগম এবং চাচা ডা. মমতাজুর রহমানের পরোক্ষ প্রভাবও তাঁর চরিত্রে দেখা যায়।

ধার্মিক ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পিতামহ মৌলভী কামাল উদ্দিনের সাহচর্যে জিয়াউর রহমানের শৈশবের একটি বড় সময় কেটেছে। একইভাবে তাঁর ওপর মাতামহী রহিমা খাতুনেরও প্রভাব ছিল। তিনি ছিলেন বহু বিরল গুণের অধিকারিণী, তেজস্বিনী নারী। সংগীতচর্চার পাশাপাশি শিক্ষা ও সাহিত্যের প্রতিও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ও অনুরাগ ছিল। জিয়াউর রহমানের মাতা জাহানারা খাতুনের সংগীতগুরু ছিলেন তাঁর মাতামহী। জিয়া সারাদিন পরিশ্রম করে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরলেও খাওয়া-দাওয়ার পর বিছানায় যাওয়ার আগে সংগীতের প্রতি অনুরাগ প্রকাশ করতে ভুলতেন না। শৈশব থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই অভ্যাস তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল।

ছোটবেলায় জিয়া খেলাধুলা করতে খুব পছন্দ করতেন। ফুটবল, হকি ও ক্রিকেট ছিল তাঁর প্রিয় খেলা। মাঝেমধ্যে গুলি ও ডান্ডাও খেলতেন। কখনো বৃষ্টিতে ভিজতেন, কাদা মেখে আনন্দ পেতেন, আবার কখনো আকাশে ঘুড়ি ওড়াতেন। খেলাধুলায় মেতে থাকলেও সন্ধ্যায় রাস্তায় বাতি জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ফিরে যেতেন। এরপর লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতেন। খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা ছিল তাঁর শৈশবের অভ্যাস। স্বল্পভাষী হলেও ছোটবেলায় তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত। চকলেট ছিল তাঁর খুব প্রিয়। মিষ্টি ও মুরগির গোশতও পছন্দ করতেন। বিশেষ করে মুরগির পাখনাকে শৈশবে তিনি ‘লাঙল’ নামে ডাকতেন। তাঁর প্রিয় খাবার ছিল ভাজা বাসি ভাত, যা বগুড়ার আঞ্চলিক ভাষায় ‘কড়কড়া’ নামে পরিচিত।

জিয়াউর রহমানের বয়স যখন চার বছর, তখন থেকেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলে যাতায়াত শুরু করেন। সালটি ছিল ১৯৪০। তাঁর পিতামহ মৌলভী কামাল উদ্দিন মন্ডল ছিলেন বাগাবাড়ি মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক। জিয়ার হাতে খড়ি হয় তাঁরই পিতামহের হাতে। বাগাবাড়িতে ছোট কমলের প্রথম শিক্ষাগুরু ছিলেন তিনি। পিতামহের কাছ থেকে জীবনের বিভিন্ন বিষয় এবং বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের শিক্ষা লাভ করেন জিয়াউর রহমান।

এরপর ১৯৪৩ সালে তাঁর পিতা মুহাম্মদ মনসুর রহমান পরিবারকে কলকাতায় নিয়ে যান। তখন জিয়ার বয়স ছয় বছর। তাঁকে পার্ক সার্কাসের আমীন আলী এভিনিউতে অবস্থিত শিশু বিদ্যাপীঠে ভর্তি করা হয়। সেখানে এক বছর পড়াশোনার পর পরিবার আবার বগুড়ার বাগাবাড়িতে ফিরে যায়। জিয়া এক বছর বাগাবাড়ি মাইনর স্কুলে পড়াশোনা করেন। এরপর পরিবার আবার কলকাতায় ফিরে আসে। ১৯৪৪ সালে তাঁকে কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের হেয়ার স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত তিনি সেখানেই লেখাপড়া করেন।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর সরকারি চাকরির সূত্রে জিয়ার পিতা মো. মনসুর রহমান পরিবার নিয়ে পাকিস্তানের করাচিতে চলে যান। ১৯৪৮ সালের ১ জুলাই জিয়াকে করাচি একাডেমি স্কুলের সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে ওই স্কুলের নাম তাইয়েব আলী আলভী একাডেমি। ১৯৫২ সালে তিনি করাচি একাডেমি স্কুল থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর করাচির ডি. জে. কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। ১৯৫৭ সালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি হয়ে আসেন। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে খেমকারান সেক্টরে একটি কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন। বীরত্বের জন্য তাঁর কোম্পানি পুরস্কৃত হয়। ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পান। একই বছর কোয়েটা স্টাফ কলেজে কমান্ড কোর্সে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে জয়দেবপুরস্থ সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে নিয়োগ পান। উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য পশ্চিম জার্মানিতে যান। ১৯৭০ সালে মেজর হিসেবে দেশে ফিরে চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব পান।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ দেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর বর্বর হামলা চালালে সব স্তরের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। ২৬ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর আক্রমণের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ওই দিন প্রথম প্রহরে চট্টগ্রাম থেকে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন মেজর জিয়াউর রহমান। ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে তাঁকে সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। পরে তিনটি সেক্টরের সমন্বয়ে গঠিত জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। বৃহত্তর চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও কুমিল্লার একাংশে মুক্তিকামী মানুষকে সংগঠিত করেন তিনি। দীর্ঘ নয় মাসের মরণপণ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধে সাহসী অবদানের জন্য তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।

স্বাধীনতার পর তিনি প্রথমে কুমিল্লা ব্রিগেডের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ নিযুক্ত হন। ১৯৭২ সালে কর্নেল, ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি ব্রিগেডিয়ার এবং একই বছরের শেষ দিকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

রাষ্ট্রনায়ক জিয়া ও বহুদলীয় গণতন্ত্র

স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের প্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমান প্রথমে এ দেশের মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশের একজন বরেণ্য রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে রাজনৈতিক ঐক্যের ধারায় ফিরিয়ে আনা এবং সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর উদ্যোগের কারণে তাঁকে আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি গঠনের মধ্য দিয়ে তিনি দেশে উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতির সূচনা করেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছিলেন দলটির প্রথম মহাসচিব। জিয়ার এই দলে বাম, ডান ও মধ্যপন্থি—সব ধরনের মানুষ স্থান পান। বিএনপির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর সদস্য সংগ্রহ ও নিয়োগপদ্ধতি। দলের প্রায় ৪৫ শতাংশ সদস্য শুধু রাজনীতিতে নতুন ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন তরুণ।

১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়াউর রহমান জয়লাভ করেন। ওই নির্বাচনে মোট ১০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর আগে মে মাসে তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং নিজের প্রতি জনসমর্থন যাচাইয়ের জন্য ৩০ মে গণভোটের আয়োজন করা হয়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সূচক ভোটে তিনি বিপুল জনসমর্থন লাভ করেন। ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২৯৮টি আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়লাভ করে। মালেক উকিলের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ৩৯টি এবং মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ দুটি আসনে জয়ী হয়। এ ছাড়া জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল আটটি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি একটি এবং মুসলিম ডেমোক্রেটিক লীগ ২০টি আসনে জয়লাভ করে।

জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম জননির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। তিনি কৃষকের পর্ণকুটিরে গিয়েছেন, শ্রমিকের বস্তিতে গিয়েছেন। গ্রামে গ্রামে মাইলের পর মাইল হেঁটে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা শুনেছেন এবং সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করেছেন। তাঁর সৃজনশীল নেতৃত্ব, দূরদর্শী রাজনৈতিক চিন্তা, জনসাধারণকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলার উদ্যোগ এবং নিজের প্রশ্নাতীত সততা তাঁকে সমসাময়িক সময়ের ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে বিভিন্ন মতের মানুষের সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন। ‘দেশ’ ও ‘মানুষ’ই ছিল তাঁর রাজনীতির প্রধান প্রতিপাদ্য।

১৯৭৬ সালের ১৩ মার্চ রামপুরা টেলিভিশন ভবনে বেতার ও তথ্য বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তাদের এক সমাবেশে জেনারেল জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, “আমরা সকলে বাংলাদেশী। আমরা প্রথমে বাংলাদেশী এবং শেষেও বাংলাদেশী। এই মাটি আমাদের, এই মাটি থেকে আমাদের অনুপ্রেরণা আহরণ করতে হবে। জাতিকে শক্তিশালী করাই আমাদের লক্ষ্য। ঐক্য, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, নিষ্ঠা ও কঠোর মেহনতের মাধ্যমেই তা সম্ভব।” (দৈনিক বাংলা, ১৪ মার্চ ১৯৭৬)

মিথ্যা প্রতিশ্রুতির অপরাজনীতির মাধ্যমে জনগণকে প্রতারিত করে স্বাধীনতা-পরবর্তী ক্ষমতাসীন মহল যখন মানুষের বাক্‌ ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হরণ করে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিল এবং দেশকে দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে ঠেলে দিয়েছিল, তখন জাতি এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সেই পরিস্থিতিতে সৈনিক-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবে শহীদ জিয়া রাষ্ট্রক্ষমতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ক্ষমতায় এসে মানুষের হারানো অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং বাক্‌ ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন। উৎপাদনের রাজনীতি প্রবর্তনের মাধ্যমে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করার উদ্যোগ নেন। তাঁর গণতান্ত্রিক চেতনা এবং বাংলাদেশকে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে। শহীদ জিয়া আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন দেশপ্রেমিক ছিলেন। তাঁর এই অবস্থানকে নিজেদের নীলনকশা বাস্তবায়নের পথে বাধা মনে করে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তাঁর এই আত্মত্যাগ জনগণের মধ্যে দেশবিরোধী চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে ইস্পাতকঠিন গণঐক্য গড়ে তুলেছে।

১৯ দফা কর্মসূচি ও উন্নয়নের রাজনীতি

দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেছিলেন। কর্মসূচিগুলো হলো—

১। সর্বতোভাবে দেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।

২। শাসনতন্ত্রের চারটি মূলনীতি—সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের সমাজতন্ত্র—জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে প্রতিফলিত করা।

৩। সব উপায়ে নিজেদের একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে গড়ে তোলা।

৪। প্রশাসনের সর্বস্তরে, উন্নয়ন কার্যক্রমে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে জনসাধারণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

৫। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কৃষির উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ তথা জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা।

৬। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা এবং কেউ যেন অভুক্ত না থাকে, সেই ব্যবস্থা করা।

৭। দেশে কাপড়ের উৎপাদন বাড়িয়ে সবার জন্য অন্তত মোটা কাপড়ের সরবরাহ নিশ্চিত করা।

৮। কোনো নাগরিক যেন গৃহহীন না থাকে, সে জন্য যথাসম্ভব ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৯। দেশকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা।

১০। সব দেশবাসীর জন্য ন্যূনতম চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

১১। সমাজে নারীর যথাযথ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা এবং যুবসমাজকে সুসংগঠিত করে জাতি গঠনে উদ্বুদ্ধ করা।

১২। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে প্রয়োজনীয় উৎসাহ দেওয়া।

১৩। শ্রমিকদের অবস্থার উন্নয়ন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির স্বার্থে সুস্থ শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।

১৪। সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে জনসেবা ও দেশ গঠনের মনোভাব জাগিয়ে তোলা এবং তাঁদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন করা।

১৫। জনসংখ্যা বিস্ফোরণ রোধ করা।

১৬। সব বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা।

১৭। প্রশাসন ও উন্নয়নব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা।

১৮। দুর্নীতিমুক্ত ও ন্যায়নীতিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

১৯। ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রনির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকার পূর্ণ সংরক্ষণ করা এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় করা।

জিয়াউর রহমান ঘোষিত এই ১৯ দফা ছিল তাঁর উন্নয়ন পরিকল্পনার মূলমন্ত্র। প্রেসিডেন্ট জিয়ার সময়ে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে উন্নয়ন সাধিত হয়, তার পেছনে দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করেছে এই ১৯ দফা। জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ‘জাতীয় সেনাবাহিনী’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। প্রশিক্ষণ, কঠোর পরিশ্রম ও কর্তব্যনিষ্ঠার মাধ্যমে সেনা কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং তাঁদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করতে তিনি অবদান রাখেন। ধর্মীয় মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিয়ে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তাঁদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দুর্বল ও শক্তিশালী—সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন। ভারত, চীন, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপনে তিনি সাফল্য দেখান। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য সামনে রেখে বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করেন। জোটনিরপেক্ষ ও ইসলামী দেশগুলোর বিভিন্ন সম্মেলনে তাঁর ব্যক্তিগত ও সক্রিয় অংশগ্রহণ বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে বিশেষ গতি সঞ্চার করে। ব্যক্তিগত কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ নেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বৈদেশিক নীতির দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল তিন ভাগে আলোচনা করা যায়। প্রথমত, জাতিসংঘকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী শান্তির পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে তিনি বাংলাদেশের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। এর ফলেই বাংলাদেশ ১৯৮০ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়। তিনি উপমহাদেশে একটি আঞ্চলিক শান্তিকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে আসিয়ানের মতো একটি সংস্থা গড়ার উদ্যোগ নেন, যা পরবর্তী সময়ে সার্ক নামে প্রতিষ্ঠা পায়।

রাষ্ট্রপতি জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য বহুমুখীকরণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ ও সাহায্যকে উৎসাহিত করা। তাঁর শাসনামলে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার নিরলস প্রচেষ্টার প্রশংসা করে বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনালের সুজান গ্রিন ঢাকা থেকে পাঠানো এক প্রতিবেদনে লিখেছিলেন, “সাম্যের প্রতীক ও সৎ লোকরূপে ব্যাপকভাবে গণ্য জিয়াউর রহমান স্বনির্ভর সংস্কার কর্মসূচি শুরু করে বাংলাদেশের ভিক্ষার ঝুড়ি ভাঙার প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছেন।” মালয়েশিয়ার দৈনিক ‘বিজনেস টাইমস’-এ প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, “অতীতে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত করেছিল যে মহাপ্লাবী সমস্যাগুলো, প্রেসিডেন্ট জিয়া কার্যত সেগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।” (দৈনিক ইত্তেফাক, ৪ নভেম্বর ১৯৭৯)

ওই সময় নিউইয়র্ক টাইমসের এক সংখ্যায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা, স্বনির্ভরতা অর্জন এবং উৎপাদন দ্বিগুণ করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নিরলস প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করা হয়। জনগণকে কাজে সংগঠিত ও অনুপ্রাণিত করতে প্রেসিডেন্ট জিয়া প্রায়ই গ্রামাঞ্চলে সফর করতেন। ‘জনগণের সঙ্গে সংযোগ রক্ষায় বাংলাদেশি নেতা’ শিরোনামে মাইকেল টি. ক্যাফম্যানের এক প্রতিবেদনে গ্রামাঞ্চলে সপ্তাহে তিন-চারবার সফরের সময় জিয়াউর রহমানের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরা হয়।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শহীদ জিয়ার আরেকটি অবদান ছিল নাগরিক বাহিনী গঠনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন। এক কোটি নারী ও পুরুষকে সাধারণ সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর—বিএনসিসি গঠনের মাধ্যমে দেশ গঠন ও নিরাপত্তায় ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি করেন। গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের পদক্ষেপ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কৃষকদের স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়নের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিশেষ প্রচার পায়। আমলানির্ভর প্রকল্পের পরিবর্তে তিনি স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করেন। এতে কৃষকদের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর প্রবর্তন করেন। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাইকে এক প্ল্যাটফর্মে এনে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করার প্রচেষ্টা চালান তিনি। এ ক্ষেত্রে অনেকটা সফলও হন। এই জাতীয়তাবাদী দর্শনই একটি জাতি ও দেশের রক্ষাকবচ।

জিয়া প্রবর্তিত উন্নয়নের রাজনীতির উল্লেখযোগ্য সাফল্যগুলোর মধ্যে রয়েছে—সব দলের অংশগ্রহণে রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান; জাতীয় সংসদের ক্ষমতা বৃদ্ধি; বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া; দেশে কৃষি, গণশিক্ষা ও শিল্প উৎপাদনে বিপ্লব; সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণে স্বেচ্ছাশ্রম ও সরকারি সহায়তার সমন্বয়ে ১ হাজার ৪০০টি খাল খনন ও পুনঃখনন; গণশিক্ষা কার্যক্রম চালু করে অল্প সময়ে ৪০ লাখ মানুষকে অক্ষরজ্ঞান দান; গ্রামাঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও গ্রামোন্নয়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী—ভিডিপি গঠন; গ্রামাঞ্চলে চুরি, ডাকাতি ও রাহাজানি বন্ধ করা; হাজার হাজার মাইল রাস্তাঘাট নির্মাণ; ২৭ হাজার ৫০০ পল্লিচিকিৎসক নিয়োগের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগণের চিকিৎসাসেবার সুযোগ বৃদ্ধি; নতুন নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ; কলকারখানায় তিন শিফট চালু করে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি; কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে দেশকে খাদ্য রপ্তানির পর্যায়ে উন্নীত করা; যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয় ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুব ও নারীসমাজকে সম্পৃক্ত করা; ধর্ম মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সব মানুষের নিজ নিজ ধর্ম পালনের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় গঠনের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সাধন; তৃণমূল পর্যায়ে গ্রামের মানুষকে স্থানীয় প্রশাসন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা; সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে দেশ গড়ার কাজে নেতৃত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে গ্রাম সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন; নির্বাচনের মাধ্যমে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের আসন লাভ; তিন সদস্যবিশিষ্ট আল-কুদস কমিটিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি; দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে সার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ; বেসরকারি খাত ও উদ্যোগকে উৎসাহিত করা; জনশক্তি রপ্তানি, তৈরি পোশাক, হিমায়িত খাদ্য, হস্তশিল্পসহ অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানির দ্বার উন্মোচন এবং শিল্পখাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ। যে গার্মেন্টস ও টেক্সটাইলশিল্পের ওপর আজ বাংলাদেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে, তার গোড়াপত্তন করেন জিয়া।

জিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার সময়কাল ছিল পাঁচ বছরের কিছু বেশি। এই স্বল্প সময়ে তিনি অনেক যুগান্তকারী কাজ করেছেন। ভারতবর্ষের ইতিহাসের পাঠান সম্রাট শেরশাহের সঙ্গে তাঁর শাসনামলের অনেক মিল পাওয়া যায়। শেরশাহের শাসনকালও ছিল সংক্ষিপ্ত; কিন্তু জনকল্যাণে তাঁর কর্মকাণ্ড ছিল অভিনব এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাবসম্পন্ন। জিয়া জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছিলেন। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, নারী ও শিশু—সব ক্ষেত্রেই তিনি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন। গোটা জাতিকে তিনি একাত্তরের মতো ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন বলে মনে করা হয়। সৃষ্টি করেছিলেন দৃঢ় জাতীয় সংহতি। পরিচয়-সংকটে আক্রান্ত ও হীনম্মন্যতায় ভোগা জাতিকে তার নিজস্ব পরিচয় ও স্বাধীন স্বকীয়তার পরিচিতি তুলে ধরেছিলেন। বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সংমিশ্রণে হাজার বছরের যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, তারই পরিচয় হিসেবে তিনি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই জাতীয়তাবাদী দর্শনই ছিল তাঁর মন, মনন, চেতনা ও রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তি। তাঁর প্রিয় গান, যা তিনি আপন মনে গুনগুন করে গাইতেন, ছিল—‘আমার জীবন বাংলাদেশ, আমার মরণ বাংলাদেশ।’

১৯৮১ সালের ৩০ মে: শহীদ জিয়াউর রহমান

১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হন। চট্টগ্রামে বিএনপির উপদলীয় কোন্দল নিরসনের লক্ষ্যে ২৯ মে সকালে পতেঙ্গা বিমানবন্দরে পৌঁছান রাষ্ট্রপতি জিয়া। সার্কিট হাউসে হালকা নাশতা সেরে বারান্দায় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। জুমার নামাজ আদায় করেন চকবাজারের নন্দনপুরা মসজিদে। নামাজ শেষে মুসল্লিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে সার্কিট হাউসে ফিরে আসেন। দুপুরের খাবার শেষে প্রায় দেড় ঘণ্টা বিশ্রাম নেন। বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধ্যাপক, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ আগত অতিথিদের সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা আলোচনা করেন। এরপর স্থানীয় বিএনপির দুই উপদলের সঙ্গে রাত ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত বৈঠক করেন। রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত চিকিৎসক লে. কর্নেল মাহতাবুল ইসলাম খাবার পরখ করে শেষ করার পর রাত ১১টার কিছু পরে জিয়াকে রাতের খাবার দেওয়া হয়। রাতের খাবার শেষে ঢাকায় স্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রায় ১৫ মিনিট টেলিফোনে কথা বলেন। জীবনের আলো নিভে যাওয়ার পাঁচ ঘণ্টা আগে ঘরের আলো নিভিয়ে ঘুমাতে যান তিনি।

রাত আড়াইটার দিকে কালুরঘাটস্থ রেডিও ট্রান্সমিটারের কাছে হাজির হয় ঘাতক দল। দলটির নেতৃত্বে ছিলেন লে. কর্নেল মতিউর রহমান। ঘাতক দল তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে আক্রমণের পরিকল্পনা করে। রাত সাড়ে তিনটার কিছু পরে দল তিনটি প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি চালিয়ে এগিয়ে যায়। কোনো বাধা ছাড়াই ঘাতক দল সার্কিট হাউসে প্রবেশ করে। ভীতি সৃষ্টির জন্য রকেট লঞ্চার থেকে ফায়ার ও গ্রেনেড চার্জ করা হয় এবং মেশিনগানের গুলি চালানো হয়। পাহারারত ৪৪ জন পুলিশের মধ্যে একজন নিহত ও ১২ জন আহত হন। বাকিরা আত্মগোপন করেন। রাষ্ট্রপতির গার্ড রেজিমেন্টের সৈন্যরা তখন তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলেন। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা কর্মকর্তা লে. কর্নেল আহসান ও ক্যাপ্টেন হাফিজ রাষ্ট্রপতিকে রক্ষা করতে গিয়ে ঘাতকদের গুলিতে নিহত হন।

গোলাগুলি ও চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দে জিয়া ঘুম থেকে উঠে বসেন। কী ঘটছে তা দেখতে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তখন তাঁর পরনে ছিল রাতের পোশাক। গভীর আত্মপ্রত্যয় ও অগাধ আস্থা নিয়ে বেরিয়ে এসে বলেন, “কি চাও তোমরা?” কাছে দাঁড়ানো লে. মোসলেহউদ্দিন রীতিমতো ঘাবড়ে যান। তিনি জিয়াকে আশ্বস্ত করে বলেন, “স্যার, আপনি ঘাবরাবেন না। এখানে ভয়ের কিছু নেই।” কিন্তু মোসলেহউদ্দিনের মুখের আশ্বাসবাণী মিলিয়ে যাওয়ার আগেই লে. কর্নেল মতিউর রহমান তাঁর এসএমজি থেকে খুব কাছ থেকে ব্রাশ ফায়ার করেন। এতে জিয়ার শরীরের ডান দিক ঝাঁঝরা হয়ে যায়। দরজার কাছেই মুখ থুবড়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। এরপর মতিউর রহমান বন্দুকের নল দিয়ে জিয়ার প্রাণহীন দেহ উল্টে নেন এবং মুখমণ্ডল ও বুকে এসএমজির ট্রিগার টিপে ম্যাগাজিন খালি করে দেন। আনুমানিক রাত চারটা থেকে সাড়ে চারটার মধ্যে জিয়ার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। তাঁকে হত্যার পর ঘাতক দল দ্রুত সার্কিট হাউস ত্যাগ করে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একাংশের হাতে প্রেসিডেন্ট জিয়া কেন নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর আজও জরুরি। ১৯৭৫ সালে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসার পর জিয়াউর রহমানের চিন্তাজগতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তাঁর ভাবনায় শুধু সেনাবাহিনী বা সামরিক চাকরি নয়, দেশের রাজনীতি, সমাজনীতি ও অর্থনীতিসহ সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়। চিন্তার এই বিস্তৃতির প্রতিফলন ঘটে তাঁর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে। জিয়াউর রহমান নিহত হন তাঁরই প্রিয় সহকর্মী ও অনুগতদের হাতে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। অতীতের ঘটনাবলি পর্যালোচনা করলে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—একটি ষড়যন্ত্র, অন্যটি সেনানায়ক থেকে তাঁর জননায়কে উত্তরণ। ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি বহুল আলোচিত হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা বাস্তবতার প্রতিফলন বলে মনে করা হয়। এক্ষেত্রে বিষয়টিকে ষড়যন্ত্র না বলে একটি রাষ্ট্রের বিরাগভাজন হওয়ার বিষয় হিসেবেও উল্লেখ করা যেতে পারে।

জিয়াউর রহমানের একটি বড় ‘অপরাধ’ ছিল স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের চেষ্টা। তিনি জানতেন, একটি রাষ্ট্র যদি নিজের ইচ্ছা ও স্বার্থ অনুযায়ী পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাহলে সেই রাষ্ট্র সার্বভৌমত্বের মর্যাদা অর্জন করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই নীতি অনুসরণকারী অনেক রাষ্ট্রনায়ককেই নির্মম পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। জিয়াউর রহমানের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে তাঁর জননির্ভর রাজনীতি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক শাসন দীর্ঘায়িত না করে তিনি গণরাজনীতিকে ১৯৭৫-পূর্ব সময়ের পঙ্কিল আবর্ত থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে নিজেও সেনা প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে রাজনীতিকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। জিয়াউর রহমানের আগে ব্যক্তি রাজনীতির কাছে আসত; কিন্তু তিনি রাজনীতিকে ব্যক্তির কাছে নিয়ে যান। এটি রাজনীতিবিদ ও সেনা কর্মকর্তাসহ অনেকের মনোকষ্টের কারণ হয়। এ কারণেই তাঁর বক্তব্যের খণ্ডিত উদ্ধৃতি ব্যবহার করে তাঁকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন সেইসব ব্যক্তি, যাঁরা বিভিন্ন কৌশলে জনগণের ওপর নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে ক্ষমতায় থাকতে চান।

বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যে জিয়াউর রহমানই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি দেশের লাখো মানুষের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, তাঁদের দুয়ারে গিয়েছেন, দিন-রাতে তাঁদের সুখ-দুঃখের কথা শুনেছেন এবং পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর শাসনামলে যে জনরাজনীতির ধারার সূচনা হয়, তাঁকে হত্যার মধ্য দিয়ে সেই ধারার অবসান ঘটে। জনগণের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে এখনো আর কেউ তা স্থাপন করতে পারেননি বলে লেখক মনে করেন। জনরাজনীতির এই বিকাশই জিয়াউর রহমানের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আমলা ও সেনাবাহিনীসহ সমাজের বিভিন্ন সুবিধাভোগী গোষ্ঠী, যারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তাদের কাছে জনরাজনীতির বিকাশ হুমকি হিসেবে দেখা দেয়।

জিয়াউর রহমানের আরেকটি বড় অবদান ছিল আধুনিক বাংলাদেশ নির্মাণের পথচলা শুরু করা। তাঁর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রচেষ্টা দেখা যায়, যার অসংখ্য নিদর্শন এখনো টিকে আছে। তাঁর এই আধুনিকীকরণের উদ্যোগও অন্ধকারের শক্তিকে তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে উৎসাহিত করেছিল বলে লেখকের অভিমত। জিয়াউর রহমান তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে বেঁচে আছেন। যদিও তাঁর কর্মকাণ্ডের বহু প্রতীক মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে, তবু সেই উদ্যোগ জনসমর্থন পায়নি। ঘোষণা দিয়ে কিংবা পরিপত্র জারি করে মানুষের মন থেকে তাদের প্রিয় নেতার নাম মুছে ফেলা যায় না।

জিয়াউর রহমানকে রাজধানী ঢাকায় জাতীয় সংসদের উত্তর পাশে চন্দ্রিমা উদ্যানে দাফন করা হয়। ২০০২ সালের ডিসেম্বরে চন্দ্রিমা উদ্যানে শহীদ জিয়ার সমাধিস্থল ঘিরে মাজার কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়ার জানাজায় বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসমাগম ঘটে। সেখানে প্রায় ২০ লাখেরও বেশি মানুষ সমবেত হন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে অভূতপূর্ব শোকের ছায়া নেমে আসে। গণমানুষের এই শোক তাঁর আদর্শ ও নীতির প্রতি দেশবাসীর ব্যাপক সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে একটি অ্যাভিনিউয়ের নামকরণ করা হয়েছে।

২০২৬ সালের প্রাসঙ্গিকতা: জাতীয় ঐক্যের অঙ্গীকার

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন ক্ষণজন্মা রাষ্ট্রনায়ক। নানা কারণে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ে স্থান করে নিয়েছেন। তাঁর সততা, নিষ্ঠা, গভীর দেশপ্রেম, পরিশ্রমপ্রিয়তা ও নেতৃত্বের দৃঢ়তা এ দেশের সাধারণ মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। তিনি ছিলেন একজন পেশাদার সৈনিক। তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর যে গ্রহণযোগ্যতা ছিল, তা অন্য কোনো রাষ্ট্রনায়কের ভাগ্যে জোটেনি বলে লেখকের অভিমত। মাত্র ছয় বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন জিয়াউর রহমান। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাঁর ওপর গভীর আস্থা রেখেছিল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের সেই আস্থায় কোনো চিড় ধরেনি।

১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম; ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ছিল সেই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রাম; ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন; আর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল ফ্যাসিবাদ ও জনবিরোধী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের জাগরণ। এসব আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা একটাই—স্বাধীন বাংলাদেশে জনগণের সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন। ৭ নভেম্বর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, এই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্য সমুন্নত রাখতে হলে ৭ নভেম্বরের মতো সিপাহি-জনতার বিপ্লবের চেতনা মনেপ্রাণে ধারণ করতে হবে। দলীয় বিভেদ, প্রতিহিংসা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়াই আজকের প্রধান দায়িত্ব। ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান প্রমাণ করে, দেশ ও জাতির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন দেশপ্রেমিক সৈনিক ও সাধারণ মানুষ একসঙ্গে দাঁড়াতে জানে।

এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—ভবিষ্যতে আর কেউ দেশ ও জনগণের অধিকার হরণ করতে পারবে না, বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারবে না। ৭ নভেম্বরের বৈপ্লবিক চেতনাই হোক বাংলাদেশের আগামী নির্মাণের প্রেরণা ও পাথেয়। দেশপ্রেমিক ও গণতন্ত্রকামী জনগণের দীপ্ত উচ্চারণ হোক: “দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।”

৭ নভেম্বর আজ কোনো আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বেঁচে আছে কোটি মানুষের হৃদয়ে—স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের চেতনা হিসেবে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আজ বেঁচে নেই; কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর প্রণীত ১৯ দফা কর্মসূচি, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন, তাঁর সততা, দেশপ্রেম, জনগণের ভালোবাসা এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি। বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—এটাই ছিল শহীদ জিয়ার স্বপ্ন। ৭ নভেম্বরের চেতনা আমাদের সেই স্বপ্ন পূরণের পথেই আহ্বান জানায়।

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র।

monir
Admin

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও