দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ কে চায়? আর কে চায় না? দেশের সাধারণ মানুষকে প্রশ্ন করলে প্রায় সবাই বলবেন, তাঁরা দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চান। রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা—কেউই প্রকাশ্যে দুর্নীতির পক্ষে কথা বলেন না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেওয়া আর নিজের জীবনে দুর্নীতিকে প্রত্যাখ্যান করা এক কথা নয়। আমাদের সমাজে এমন মানুষেরও অভাব নেই, যাঁরা অন্যের দুর্নীতির সমালোচনা করেন, অথচ নিজের স্বার্থে সুযোগ পেলে অনিয়ম করতে দ্বিধা করেন না।
![]()
এই দ্বিচারিতাই দুর্নীতিকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম কারণ। আমরা দুর্নীতিমুক্ত দেশ চাই, কিন্তু নিজের কাজটি নিয়ম মেনে করতে গেলে যখন সময় লাগে, তখন অনেকেই ঘুষ দিয়ে দ্রুত কাজ করিয়ে নিতে চাই। অন্যের ঘুষ নেওয়াকে অপরাধ বলি, আবার নিজের কাজ হাসিলের জন্য ঘুষ দেওয়ার সময় সেটিকে ‘বাধ্য হয়ে দেওয়া’ বলে ব্যাখ্যা করি। এভাবে দুর্নীতি শুধু অফিসের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সমাজের আচরণেও জায়গা করে নেয়।
ধর্মীয় পরিচয় নয়, সততার পরিচয় জরুরি
ছোটবেলা থেকেই অন্যের লেখা নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া, স্বাক্ষর জাল করা, প্রতারণার মাধ্যমে সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা অভিযোগের কথা শুনে আসছি। এসব অনিয়ম নতুন নয়। তবে কোনো অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে বলে সেটিকে স্বাভাবিক মনে করার সুযোগ নেই।
চলতি মাসের ১৩ অক্টোবর মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় একটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, নির্বাহী পরিচালক ও অন্য পরিচালকদের স্বাক্ষর জাল করে ১ হাজার ৫০০ কেজি জিআর চাল উত্তোলন ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে খিজির মুহাম্মদ জুলফিকারের বিরুদ্ধে। অভিযোগটি জানাজানি হওয়ার পর ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ঘটনাটি নিয়ে গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
এখানে মূল প্রশ্ন শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নয়। সরকারি সহায়তার চাল কীভাবে উত্তোলন করা হলো? প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও স্বাক্ষর যাচাইয়ের দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা কী পরীক্ষা করেছিলেন? অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের জবাব জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
কেউ দাড়ি রাখেন, ধর্মীয় পোশাক পরেন কিংবা ধর্মীয় পরিচয় বহন করেন—এসব দিয়ে তাঁর সততা প্রমাণিত হয় না। সততার প্রমাণ পাওয়া যায় কাজে, আচরণে এবং মানুষের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে। একই কথা রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী কিংবা সমাজের যেকোনো পরিচয়ের মানুষের জন্য প্রযোজ্য।
দুর্নীতি ছড়িয়ে আছে বহু খাতে
বাংলাদেশে দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু একটি ঘটনা দিয়ে পুরো চিত্র বোঝা যায় না। সরকারি সেবা, উন্নয়ন প্রকল্প, আইন প্রয়োগ, নিয়োগ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কেনাকাটার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় আসে। তবে কোনো খাতের সব কর্মকর্তা দুর্নীতিগ্রস্ত—এমন সাধারণীকরণও ঠিক নয়। সৎ কর্মকর্তা রয়েছেন; তাঁদের কাজের সুরক্ষা নিশ্চিত করেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
১. বিআরটিএ: ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদ নেওয়ার ক্ষেত্রে দালালনির্ভরতা, অপ্রয়োজনীয় হয়রানি এবং ঘুষের অভিযোগ বহুবার আলোচিত হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী কাজ করতে গিয়েও কেউ যদি দালালের সাহায্য নিতে বাধ্য হন, তাহলে সেবাব্যবস্থার দুর্বলতা খতিয়ে দেখা জরুরি। আবেদন থেকে সনদ পাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ অনলাইনে অনুসরণযোগ্য করতে হবে।
২. পাসপোর্ট বিভাগ: পাসপোর্টের আবেদন, তথ্য সংশোধন কিংবা জরুরি সেবা নিতে গিয়ে বাড়তি টাকা দাবি ও মধ্যস্বত্বভোগীর হয়রানির অভিযোগ শোনা যায়। এসব অভিযোগের প্রতিটি সত্য ধরে নেওয়া যাবে না, কিন্তু অভিযোগ তদন্তের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। সরকারি ফি স্পষ্টভাবে প্রকাশ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৩. পুলিশ বিভাগ: মামলা গ্রহণে অনীহা, অভিযোগকারীকে হয়রানি, তদন্তে পক্ষপাত কিংবা প্রভাবশালীদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ বিচারব্যবস্থা ও জননিরাপত্তার প্রতি মানুষের আস্থা কমায়। পুলিশকে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত রেখে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগের মাধ্যমে কাউকে হয়রানি করার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৪. বিচার বিভাগ ও আদালত-সংশ্লিষ্ট সেবা: বিচারপ্রার্থীদের একটি অংশ মামলা পরিচালনার দীর্ঘসূত্রতা, তারিখের পর তারিখ এবং বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ করেন। আদালত-সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো বিচার বিভাগকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলা যাবে না। বিচারপ্রার্থীর হয়রানি কমাতে মামলা ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রাপ্তি ও অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ করা প্রয়োজন।
৫. বিদ্যুৎ বিভাগ: নতুন সংযোগ, মিটার স্থাপন, বিল সংশোধন, অবৈধ সংযোগ এবং ঠিকাদারি কাজ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। কোথাও অযৌক্তিক বিল, কোথাও সেবা পেতে হয়রানি—এসব অভিযোগের নিষ্পত্তি হতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে। বিদ্যুৎ কেনাকাটা ও প্রকল্পের ব্যয়ও নিয়মিত স্বাধীন নিরীক্ষার আওতায় আনা দরকার।
৬. কৃষি খাত: কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার, বীজ, কৃষি উপকরণ ও ভর্তুকি প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তালিকায় অনিয়ম, প্রভাবশালীদের অগ্রাধিকার কিংবা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে উপকরণ বিক্রির অভিযোগ থাকলে কৃষকই শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন। কৃষি সহায়তার তালিকা প্রকাশ, বিতরণের হিসাব সংরক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে হবে।
৭. সমাজসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা: বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং অন্যান্য সহায়তা দরিদ্র মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত উপকারভোগী বাদ পড়া, অযোগ্য ব্যক্তির নাম তালিকায় ওঠা কিংবা সুবিধা পেতে টাকা দেওয়ার অভিযোগ থাকলে তা কঠোরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তালিকা যাচাইয়ে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং সহজ অভিযোগব্যবস্থা চালু রাখা জরুরি।
৮. এলজিইডি ও উন্নয়ন প্রকল্প: গ্রামীণ সড়ক, সেতু, কালভার্ট ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে নিম্নমানের কাজ, কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল পরিশোধ কিংবা ব্যয়ের সঙ্গে বাস্তব কাজের অসংগতির অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ পরীক্ষা হওয়া উচিত। রাস্তা নির্মাণের কয়েক মাসের মধ্যে ভেঙে গেলে শুধু ঠিকাদারকে দায়ী করলেই চলবে না; প্রকল্প অনুমোদন, তদারকি, মান যাচাই এবং বিল পরিশোধের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের ভূমিকা পরীক্ষা করতে হবে।
৯. মন্ত্রণালয় থেকে ইউনিয়ন পরিষদ: সরকারি কেনাকাটা, প্রকল্প অনুমোদন, নিয়োগ, বদলি, বরাদ্দ বণ্টন এবং স্থানীয় উন্নয়নকাজ—প্রতিটি স্তরেই স্বচ্ছতা প্রয়োজন। কোথাও স্বজনপ্রীতি, কোথাও প্রভাব খাটানো, আবার কোথাও কাজ না করেই বিল তোলার অভিযোগ উঠতে পারে। এসব ক্ষেত্রে প্রকল্পের তথ্য, ব্যয়, ঠিকাদারের পরিচয় ও কাজের অগ্রগতি জনসমক্ষে প্রকাশ করলে অনিয়ম গোপন রাখা কঠিন হবে।
১০. ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম: দুর্যোগের সময় বরাদ্দ চাল, খাদ্যসামগ্রী ও নগদ সহায়তা অসহায় মানুষের অধিকার। এসব সম্পদ আত্মসাৎ, ভুয়া তালিকা তৈরি কিংবা জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা সাধারণ আর্থিক অপরাধের চেয়েও গুরুতর; কারণ এতে বিপদে পড়া মানুষের প্রাপ্য সহায়তা কেড়ে নেওয়া হয়। মৌলভীবাজারের জিআর চাল নিয়ে ওঠা অভিযোগের মতো ঘটনায় কাগজপত্র যাচাই, মজুত ও বিতরণের হিসাব মিলিয়ে দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন।
পরিসংখ্যান কী বলছে?
দুর্নীতির সমস্যা যে শুধু মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক মূল্যায়নেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণাসূচক (Corruption Perceptions Index—CPI) ২০২৪-এ বাংলাদেশ ১০০-এর মধ্যে ২৩ পায় এবং ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫১তম অবস্থানে ছিল। এই সূচক সরকারি খাতের দুর্নীতি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের ধারণা পরিমাপ করে; এটি দেশের প্রতিটি দুর্নীতির ঘটনা গুনে তৈরি করা হিসাব নয়। তবু ফলাফলটি আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। দুর্নীতি প্রতিরোধে শুধু ঘোষণা নয়, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রয়োজন।
দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়বে কে?
দুর্নীতি বন্ধের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, আবার জনগণের ওপর দায় চাপিয়ে সরকারের দায়িত্ব এড়ানোরও সুযোগ নেই। সরকারের দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার, স্বচ্ছ নিয়োগ, সরকারি অর্থের নিরীক্ষা এবং অপরাধীর রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় না দেখে ব্যবস্থা নেওয়া। দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। অভিযোগ তদন্তের নামে কাউকে হয়রানি করা যাবে না, আবার প্রভাবশালী বলে কাউকে ছাড়ও দেওয়া যাবে না।
একই সঙ্গে নাগরিকদেরও নিজেদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে। লাইনে না দাঁড়িয়ে কাজ করানোর জন্য টাকা দেওয়া, পরিচিত লোকের মাধ্যমে নিয়ম ভাঙা, কর ফাঁকি দেওয়া কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করে নিজের সুবিধা নেওয়াও দুর্নীতির সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করে। ছোট অনিয়মকে প্রশ্রয় দিয়ে বড় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সফল হওয়া কঠিন।
সবচেয়ে জরুরি হলো, দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তদন্তের ফল জনগণকে জানানো। অভিযোগ পাওয়ার পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হলো, তদন্ত কোথায় দাঁড়াল, দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো—এসব তথ্য গোপন থাকলে মানুষের সন্দেহ বাড়ে। বিচারহীনতা দুর্নীতিবাজকে সাহসী করে, আর জবাবদিহি তাকে থামাতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত দেখতে সবাই চান—এ কথা আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু প্রকৃত পরীক্ষা বক্তৃতায় নয়, নিজের স্বার্থের সামনে নীতিকে ধরে রাখার মধ্যে। যে ব্যক্তি ঘুষ না দিয়ে নিজের কাজ করাতে চান, যে কর্মকর্তা অনিয়মের নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করেন, যে জনপ্রতিনিধি বরাদ্দের হিসাব প্রকাশ করেন এবং যে সরকার অপরাধীকে পরিচয় না দেখে বিচারের মুখোমুখি করে—তাঁরাই দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের ভিত্তি গড়েন।
প্রশ্ন তাই শুধু, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ কে চায়? আরও জরুরি প্রশ্ন হলো—সুযোগ পেয়েও কে দুর্নীতি করবে না? এই প্রশ্নের উত্তর ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—সব জায়গায় খুঁজতে হবে। নইলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের বক্তব্য থাকবে, কিন্তু দুর্নীতির চর্চাও চলতে থাকবে।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক










পাঠকের মন্তব্য