ব্যাংক কার, অর্থনীতি কার—রাষ্ট্র কি সাধারণ মানুষের?

ফাইল ছবি
ফাইল ছবি
এস এম মেহেদী হাসান

বাংলাদেশের অর্থনীতি কোন পথে এগোচ্ছে? ব্যাংকে টাকা রাখলে তা নিরাপদ থাকবে কি না, ব্যবসায়ী ঋণ পাবেন কি না, শিল্পকারখানায় বিনিয়োগ বাড়বে কি না—এসব প্রশ্ন এখন আর শুধু অর্থনীতিবিদদের আলোচনার বিষয় নয়। সাধারণ আমানতকারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও উদ্যোক্তাদের জীবনও এসব প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কারণ ব্যাংকিং খাত দুর্বল হয়ে পড়লে তার আঘাত শেষ পর্যন্ত গিয়ে লাগে সাধারণ মানুষের পকেটে।

ফাইল ছবি

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনে জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহর বক্তব্য নতুন করে এই সংকটের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাঁর আশঙ্কা, অর্থনীতি ইতিমধ্যে সঠিক পথ থেকে সরে গেছে; প্রয়োজনীয় পরিবর্তন না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, আস্থার সংকট এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে রাষ্ট্র ও অর্থনীতির একটি গভীর সমস্যা।

প্রশ্ন হলো, একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা কেন এমন দুর্বল অবস্থায় পৌঁছায়? কেন কিছু মানুষ বিপুল অর্থের মালিক হন, অথচ সেই অর্থের জোগান দেওয়া সাধারণ আমানতকারীরা নিজেদের সঞ্চয় নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন? কেন ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, অথচ প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনিয়মের অভিযোগ ওঠে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু ব্যাংকের হিসাব দেখলে হবে না। দেখতে হবে রাজনীতি, প্রশাসন, ব্যবসা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে অর্থের সম্পর্কও।

ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষের আস্থা

একটি ব্যাংকের শক্তি শুধু তার ভবন, মূলধন কিংবা শাখার সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষের আস্থা। মানুষ কষ্ট করে টাকা জমায়, সেই টাকা ব্যাংকে রাখে এবং বিশ্বাস করে প্রয়োজনের সময় তা ফেরত পাবে। ব্যাংক সেই আমানত থেকে ঋণ দেয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে অর্থের জোগান দেয়। এই ব্যবস্থার ভিত্তি হলো বিশ্বাস ও দায়িত্বশীলতা।

কিন্তু ঋণ বিতরণে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা বাড়তে থাকলে সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরে। মানুষ যখন দেখে, সাধারণ গ্রাহককে সামান্য কাজের জন্য নিয়মের কঠোরতা মেনে চলতে হয়, অথচ প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতারা বিপুল ঋণ নিয়েও দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পান, তখন ব্যাংকিং ব্যবস্থার ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

আস্থার সংকট এক দিনে তৈরি হয় না। দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মের অভিযোগ জমতে থাকে, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায় না। তখন মানুষ শুধু একটি ব্যাংকের ওপর নয়, পুরো ব্যবস্থার ওপর সন্দেহ করতে শুরু করে। এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

অলিগার্ক কারা, আর তাঁদের প্রভাব এত বেশি কেন?

অলিগার্ক বলতে সাধারণত এমন অল্পসংখ্যক ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিকে বোঝায়, যাঁরা বিপুল সম্পদের পাশাপাশি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নীতি নির্ধারণ কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। ব্যবসায় সফল হওয়া অপরাধ নয়। বড় শিল্প গড়ে তোলা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং বিনিয়োগ বাড়ানো দেশের জন্য প্রয়োজনীয়। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে নিয়ম নিজের পক্ষে বদলে নেওয়া হয়।

কোনো ব্যবসায়ী যদি রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে সহজে ঋণ পান, ঋণ পরিশোধ না করেও বারবার বিশেষ সুবিধা পান কিংবা ঋণের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পান, তাহলে প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক নিয়ম ভেঙে পড়ে। নিয়ম মেনে চলা উদ্যোক্তা পিছিয়ে পড়েন, আর প্রভাবশালী ব্যক্তি বাড়তি সুবিধা পান। এতে শুধু ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; পুরো অর্থনীতিতে অন্যায্য প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।

মাহবুব উল্লাহর বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি সমস্যাটিকে শুধু কয়েকজন অসৎ ব্যবসায়ীর আচরণ হিসেবে দেখেননি। তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যখন জনগণের স্বার্থের পরিবর্তে গুটিকয় প্রভাবশালী মানুষের সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হয়, তখন এ ধরনের গোষ্ঠী শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

এই বক্তব্যের তাৎপর্য এখানেই। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুধু ব্যক্তিকে দোষারোপ করলেই হবে না; যে ব্যবস্থায় অনিয়ম করে লাভবান হওয়া যায় এবং জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব, সেই ব্যবস্থারও পরিবর্তন করতে হবে।

বিপুল ঋণ, কিন্তু উৎপাদন কোথায়?

ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নতুন কারখানা গড়তে, উৎপাদন বাড়াতে কিংবা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ঋণ নিতে পারে। কিন্তু ঋণ যদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগের পরিবর্তে ক্ষমতা ও প্রভাবের ভিত্তিতে বিতরণ করা হয়, তাহলে তা অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

সম্মেলনে উপস্থাপিত বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল সুশাসন, ঋণ পুনর্গঠনের সুবিধার অপব্যবহার এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতি ব্যাংকিং খাতের সমস্যাকে বাড়িয়েছে। এসব বিষয় যথাযথ তথ্য দিয়ে যাচাই ও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তবে সাধারণ অর্থনৈতিক যুক্তিটি পরিষ্কার: ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, পরিশোধের সক্ষমতা এবং অর্থের ব্যবহার যাচাই না হলে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়ে।

একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে ঋণ না পেয়ে ব্যবসা শুরু করতে না পারলে তার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নষ্ট হয়। একটি মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অর্থ না পেলে উৎপাদন বাড়াতে পারে না। নতুন কারখানা না হলে নতুন চাকরিও তৈরি হয় না। অন্যদিকে বড় অঙ্কের ঋণ অনাদায়ী থাকলে ব্যাংকের অর্থ আটকে যায়। সেই অর্থ দিয়ে নতুন উদ্যোক্তাকে ঋণ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

ফলে ঋণখেলাপির সমস্যা কেবল ব্যাংকের ব্যালান্সশিটের সমস্যা নয়। এর প্রভাব পড়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও মানুষের আয়েও।

অলস টাকা আছে, তবু ঋণের সংকট কেন?

সম্মেলনে অর্থনীতিবিদ বরকত-এ-খোদা ব্যাংক খাতের একটি বিপরীতমুখী পরিস্থিতির কথা বলেছেন। তাঁর উপস্থাপনা অনুযায়ী, একদিকে কিছু ব্যাংক তারল্যসংকটে ভুগছে, অন্যদিকে পুরো খাতে বিপুল পরিমাণ অলস বা অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। তিনি ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অলস তারল্য চার ট্রিলিয়ন টাকার বেশি হওয়ার তথ্যও উল্লেখ করেছেন।

এই সংখ্যার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও উৎস যাচাই করা জরুরি। তবে এখানে যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা গুরুত্বপূর্ণ: ব্যাংকিং খাতে অর্থ থাকলেও সেই অর্থ কেন কার্যকরভাবে উৎপাদনশীল খাতে পৌঁছাচ্ছে না?

এর উত্তর একক নয়। ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা, ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা, ঋণ পরিশোধের ঝুঁকি, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা—সবই এর সঙ্গে যুক্ত। কোনো ব্যাংকের হাতে অর্থ থাকলেই তা নির্বিচারে ঋণ দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু ব্যাংকিং খাতের একাংশ দুর্বল হয়ে পড়া এবং অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা অর্থায়নের সংকটে থাকা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুতর সতর্কবার্তা।

ব্যাংককে এমন অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে, যেখানে আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তা বজায় থাকবে, ভালো উদ্যোক্তা ন্যায্য শর্তে ঋণ পাবেন এবং ঋণের অর্থ উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে কাজে লাগবে।

অর্থ পাচারের বোঝা শেষ পর্যন্ত কার?

ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করা, ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে অর্থ নেওয়া কিংবা অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার প্রভাব বহুমাত্রিক। ব্যাংকের সম্পদ কমে, বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হয় এবং আর্থিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়।

সম্মেলনে বিপুল অঙ্কের ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের যে পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে, তা যাচাইযোগ্য প্রতিবেদন ও নির্ভরযোগ্য উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ ধরনের অঙ্ককে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রচার করার আগে তথ্যের ভিত্তি স্পষ্ট করা জরুরি। তবে অনিয়মের অর্থ যদি বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং তা উদ্ধার করা না যায়, তাহলে দেশের উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার: ব্যাংকের ক্ষতি হলেই তা সব সময় সরাসরি সরকারি অর্থ দিয়ে পূরণ করা হয় না। কিন্তু কোনো ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রয়োজন হলে সেই ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত করদাতা ও বৃহত্তর অর্থনীতির ওপর পড়তে পারে। তাই দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা, অর্থের গতিপথ অনুসন্ধান করা এবং আইনসম্মত উপায়ে অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা চালানো অত্যন্ত জরুরি।

সংস্কার চাই, কিন্তু দায়মুক্তি নয়

ব্যাংক খাতের সংকট সমাধানে দুর্বল ব্যাংককে শুধু টিকিয়ে রাখাই যথেষ্ট নয়। আবার একটি ব্যাংক সমস্যায় পড়েছে বলেই হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াও ঠিক হবে না, যাতে সাধারণ আমানতকারী ও নিরপরাধ কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। প্রয়োজন বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে পরিকল্পিত সংস্কার।

প্রথমত, প্রতিটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। কোন ব্যাংকের কত খেলাপি ঋণ, কত মূলধন ঘাটতি এবং কত অর্থ আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে—এসব তথ্য যথাসম্ভব স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব বন্ধ করতে হবে। বড় ঋণের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই, জামানত মূল্যায়ন এবং ঋণের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

তৃতীয়ত, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ও প্রতারণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে ব্যবসায়িক ব্যর্থতা, প্রকৃত আর্থিক সংকট এবং পরিকল্পিত জালিয়াতিকে এক করে দেখা যাবে না। তদন্ত ও বিচার হতে হবে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে।

চতুর্থত, ব্যাংক পরিচালনায় পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, নিরীক্ষক এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব স্পষ্ট হতে হবে। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে শুধু ঋণগ্রহীতা নয়, দায়িত্বে অবহেলা বা যোগসাজশে জড়িত ব্যক্তিদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

সবশেষে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ন্যায্য ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়াতে হবে। অর্থনীতি সচল রাখতে উৎপাদন, রপ্তানি, কৃষি, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উদ্যোগে অর্থের প্রবাহ প্রয়োজন।

রাষ্ট্র কি সবার, নাকি শুধু প্রভাবশালীদের?

ব্যাংকিং সংকটের গভীরে রয়েছে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্ন। সাধারণ মানুষ যদি নিয়ম মেনে চলেও সেবা না পান, আর ক্ষমতাবান কেউ নিয়ম ভেঙে সুবিধা পান, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়। একইভাবে, ছোট ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে কিস্তি আদায়ে কঠোরতা দেখানো হলেও বড় ঋণখেলাপিরা যদি বারবার বিশেষ সুবিধা পান, তাহলে পুরো ব্যবস্থার ন্যায্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব ব্যবসায়ীদের শত্রু হওয়া নয়, আবার কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করাও নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সবার জন্য ন্যায়সংগত নিয়ম তৈরি করা এবং সেই নিয়ম সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা। উদ্যোক্তা সফল হলে দেশের অর্থনীতি লাভবান হবে; কিন্তু সেই সাফল্য যদি অন্যের অধিকার হরণ, রাষ্ট্রীয় সুবিধার অপব্যবহার কিংবা আর্থিক অনিয়মের ওপর দাঁড়ায়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ক্ষতিকর।

ব্যাংক খাতকে সুস্থ করতে তাই শুধু নতুন নীতিমালা ঘোষণা করলেই চলবে না। দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছতা এবং অপরাধের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান জবাবদিহি। মানুষের আমানত রক্ষা করতে হবে, বিনিয়োগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে—কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে না।

অর্থনীতি লাইনচ্যুত হলে তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব, যদি সমস্যার মূল কারণ স্বীকার করা হয় এবং কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস থাকে। কিন্তু অনিয়মকে প্রশ্রয় দিয়ে, দায়ীদের আড়াল করে এবং পুরোনো ব্যবস্থাকেই নতুন নামে চালিয়ে গেলে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

বাংলাদেশের ব্যাংক জনগণের আমানতে চলে, দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে এবং মানুষের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত। সেই ব্যাংক যদি অল্প কয়েকজনের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়, তাহলে ক্ষতি শুধু অর্থনীতির হবে না; ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাসও।

সুতরাং আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন—ব্যাংক খাতকে কার স্বার্থে পরিচালিত করা হবে? অল্প কয়েকজন প্রভাবশালীর জন্য, নাকি দেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে বাংলাদেশের অর্থনীতি সামনে এগোবে, নাকি সংকটের আরও গভীরে চলে যাবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক

monir
Admin

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও