![]()
রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার বিপরীত পাশে সারি সারি টিনের ঘর। সেখানেই রাস্তার পাশে মাটির চুলায় লাকড়ি জ্বালিয়ে রান্না করছিলেন তামান্না (৩২) নামের এক নারী।
কেন লাকড়ি পুড়িয়ে রান্না করছেন, জানতে চাইলে তামান্না বলেন, ‘গ্যাসের দাম বেশি। অত দাম দিয়া গ্যাস কিইন্না কুলাইতে পারি না।’
তামান্নার মতো রাজধানীর নিম্ন আয়ের মানুষের কেউ কেউ এখন মাটির চুলায় লাকড়ি, চেলা কাঠ ও কাগজ পুড়িয়ে রান্না করছেন। তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বেড়ে যাওয়ায় সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্য হারিয়েছেন তাঁরা।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) চলতি নভেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছে ২ হাজার ৬০ টাকা। তবে বাজারে একই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়।
গত মার্চে দেশে ১২ কেজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। সে সময় বাজারে এই সিলিন্ডার বিক্রি হতো দেড় হাজার টাকার আশপাশে।
তামান্নার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বামী ও দুই ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার। স্বামীর সঙ্গে মিলে একটি দোকান চালান তিনি। সেখানে পেঁয়াজু, বেগুনি, চপ, ছোলা, চিকেন রোলসহ বিভিন্ন খাবার বিক্রি করেন।
তামান্না বলেন, ‘বাড়তি দামে অনেকেই গ্যাস কিন্নাই রান্ধে। সারা দিন কাজকাম কইরা আইসা দ্রুত রান্ধার লাইগা গ্যাসে চড়ায়া দেয়। আর যারা গ্যাস কিনতে পারে না, লাকড়িতে রান্ধে। কিছু করার নাই। সংসার চলে না।’
তবে লাকড়ি দিয়ে রান্না করতেও এখন বেশ খরচ হচ্ছে বলে জানান তামান্না। তাঁর ভাষ্য, প্রতি কেজি লাকড়ির দাম ১৫ টাকা এবং প্রতি মণের দাম ৬০০ টাকা।
তামান্নার স্বামী মনির হোসেন বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। তাঁদের দোকানে বিক্রি করা খাবার তৈরির খরচও বেড়েছে। ফলে আয় কমে গেছে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘গরিব সারা জীবন গরিবই থাকব।’
আগারগাঁওয়ের বস্তির আরেক বাসিন্দা রহিমা (৫০)। বাড়ি বাড়ি গিয়ে গৃহকর্মীর কাজ করেন তিনি। তবে বয়স ও অসুস্থতার কারণে এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। তিনিও রান্নার জন্য ব্যবহার করছেন মাটির চুলা।
বাসাবাড়িতে তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সংযোগের মাসিক বিল দুই চুলার জন্য ১ হাজার ৮০ টাকা। অন্যদিকে পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারে নিয়মিত রান্নার জন্য মাসে দুই সিলিন্ডার গ্যাস প্রয়োজন হয়। এতে খরচ দাঁড়ায় প্রায় পাঁচ হাজার টাকা।
রহিমা গণমাধ্যমকে বলেন, আড়াই হাজার টাকা দিয়ে একটি সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্য তাঁর নেই। তাই ভোগান্তি সত্ত্বেও লাকড়ির চুলায় রান্না করতে হচ্ছে।
নিজের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে রহিমা বলেন, ‘আগে গ্যাসে তড়তড়ি রান্না করতাম, তড়তড়ি কামে যাইতে পারতাম। এখন লাকড়ি দিয়ে রান্না করি। কাপড়চোপড়ে কালি লাগে। ধুমাতে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ঘরেও কালি লাগে। লাকড়িতে রানতে অনেক সমস্যা।’
রহিমার এক মেয়ে ও এক ছেলে। প্রায় সাত মাস আগে তাঁর স্বামী মারা গেছেন। মেয়ে পোশাক কারখানায় চাকরি করেন, আর ছেলে অটোরিকশা চালান। নিজের জীবনসংগ্রামের কথা জানিয়ে রহিমা বলেন, ‘বাড়ি আছিলো ভোলা। নদী সব লইয়া গেছে। জায়গাজমি সব নিছে। এহন ঢাকা শহরে কোনোমতে আছি।’
রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়ার কয়েকটি প্লটে টিনের ছাউনির ঘরে বসবাস করেন নিম্ন আয়ের মানুষ। হকারি, অটোরিকশা চালানো কিংবা অন্যের বাসায় কাজ করে চলে তাঁদের সংসার। এসব ঘরেও কেউ কেউ মাটির চুলা তৈরি করে রান্না করছেন।
তাঁদেরই একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি একেকটি বাসায় ঘর মোছা ও কাপড় ধোয়ার কাজ করে মাসে আড়াই হাজার টাকা পান। অথচ একটি গ্যাস সিলিন্ডার কিনতেই খরচ হয় আড়াই হাজার টাকা।
সরকার বর্তমানে বাসাবাড়িতে নতুন গ্যাস-সংযোগ দিচ্ছে না। তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আবাসিক সংযোগে দুই চুলার মাসিক বিল ১ হাজার ৮০ টাকা। অন্যদিকে পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারে নিয়মিত রান্নার জন্য মাসে দুটি সিলিন্ডার প্রয়োজন হয়। এতে ব্যয় হয় প্রায় পাঁচ হাজার টাকা।
একটি সিলিন্ডার কিনতে একসঙ্গে আড়াই হাজার টাকা জোগাড় করাও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কঠিন। ফলে বাধ্য হয়ে তাঁদের লাকড়ির চুলায় ফিরতে হচ্ছে। এদিকে লাকড়ির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে দামও। বিক্রেতাদের ভাষ্য, মানভেদে প্রতি মণে লাকড়ির দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ লাকড়ি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায়।
আগারগাঁওয়ের লাকড়ি বিক্রেতা হাফিজুর (৩৫) গণমাধ্যমকে বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ার আগে দিনে এক থেকে দেড় মণ লাকড়ি বিক্রি করতেন তিনি। এখন প্রতিদিন ৭ থেকে ১০ মণ পর্যন্ত লাকড়ি বিক্রি হচ্ছে।










