ভ্যানডাইকের মুক্তিতে মার্কিন চাপের অভিযোগ কংগ্রেসের, প্রশ্নে মোদী সরকার

মুক্তিবাণী ডেস্ক রিপোর্ট:

ভ্যানডাইকের মুক্তিতে মার্কিন চাপের অভিযোগ কংগ্রেসের, প্রশ্নে মোদী সরকার

ভারতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার মার্কিন নাগরিক ম্যাথিউ অ্যারন ভ্যানডাইককে ডিফল্ট জামিনে মুক্তি এবং নিজ দেশে ফেরার অনুমতি দেওয়ার ঘটনায় নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকারের অভিযোগ তুলেছে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস।

কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশের অভিযোগ, ভ্যানডাইককে মুক্তি দেওয়ার মধ্য দিয়ে মোদী সরকার আবারও মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছে। এতে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে ভ্যানডাইককে ‘সিআইএ এজেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করার কোনো সরকারি প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। বিভিন্ন প্রতিবেদন ও কংগ্রেসের বক্তব্যে তাকে মার্কিন নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভ্যানডাইকের মুক্তিতে মার্কিন চাপের অভিযোগ কংগ্রেসের, প্রশ্নে মোদী সরকার

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে কংগ্রেস ভ্যানডাইকের মুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। দলটির দাবি, এক মাসের ডিফল্ট জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তাকে যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

১৩ মার্চ গ্রেপ্তার, সন্ত্রাসের ষড়যন্ত্রের তদন্ত

১৩ মার্চ ভ্যানডাইকসহ সাত বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ)। ভ্যানডাইককে কলকাতা বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিনে ইউক্রেনের নাগরিক পেত্রো হুরবা, তারাস স্লিভিয়াক ও ইভান সুকমানভস্কিকে লখনৌ বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয়। অপর তিন ইউক্রেনীয় নাগরিক মারিয়ান স্টেফানকিভ, মাকসিম হনচারুক ও ভিক্টর কামিনস্কিকে দিল্লি বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এনআইএর অভিযোগ ছিল, এসব বিদেশি নাগরিক অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ, অবস্থান ও চলাচলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের মিয়ানমারভিত্তিক জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভারত ও মিয়ানমারে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা দেওয়ার অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছিল। পাশাপাশি ড্রোন যুদ্ধের প্রশিক্ষণ এবং ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে কাজ করার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় ছিল।

কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশের দাবি, ১৬ মার্চ আদালতে এনআইএর দেওয়া বক্তব্যে অভিযুক্তদের ভারতবিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি এবং তদন্তের অংশ হিসেবেই এগুলো সামনে এসেছে।

রুবিওর ভারত সফরে ভ্যানডাইকের প্রসঙ্গ

ভ্যানডাইককে ঘিরে কংগ্রেসের অভিযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভারত সফর।

জয়রাম রমেশের দাবি, ২৩ থেকে ২৬ মে ভারত সফরের সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর ভ্যানডাইকের বিষয়টি ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রির কাছে তুলেছিলেন।

ভ্যানডাইকের পরিবারও এর আগে মার্কিন কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছিল। পরিবার-সংশ্লিষ্ট এক বিবৃতিতে বলা হয়, ভারতে ভ্যানডাইকের পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর রুবিও ও বিক্রম মিশ্রিকে অবহিত করেছিলেন।

তবে এই যোগাযোগকে ভ্যানডাইকের মুক্তির জন্য সরাসরি মার্কিন চাপ হিসেবে ভারত সরকার বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে স্বীকার করা হয়নি।

রুবিওর ভারত সফরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীসহ ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও কোয়াড সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।

৮ সেপ্টেম্বর বদলে যায় মামলার গতিপথ

৮ সেপ্টেম্বর মামলায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। ওই দিন এনআইএ সাত বিদেশির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এতে ভ্যানডাইক ও ছয় ইউক্রেনীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্টের ২১ ও ২৩ ধারায় ভারতে অবৈধ প্রবেশ, অবস্থান ও চলাচলের অভিযোগ আনা হয়।

তবে এর আগে যে কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন ইউএপিএর অধীনে তদন্ত চলছিল, অভিযোগপত্রে সেই আইনের ধারা রাখা হয়নি।

এনআইএ অবশ্য আদালতকে জানায়, ইউএপিএ-সংক্রান্ত তদন্ত পুরোপুরি শেষ হয়নি। ভারতে বিপুল পরিমাণ ড্রোন ও ড্রোনের সরঞ্জাম আনা এবং বিপুলসংখ্যক ডিজিটাল ডিভাইস জব্দের বিষয়টি তদন্তাধীন ছিল। এসব ডিভাইস পরীক্ষা করতে আরও সময় প্রয়োজন বলেও জানায় সংস্থাটি।

এনআইএর ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তে ভারতের ঐক্য, অখণ্ডতা, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন তথ্য পাওয়া যেতে পারে। বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের সব দিক খতিয়ে দেখতে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার অনুমতিও চাওয়া হয়।

ইউএপিএ বাদ দেওয়ায় আগেই প্রশ্ন তুলেছিল কংগ্রেস

৮ সেপ্টেম্বর অভিযোগপত্রে ইউএপিএর ধারা না থাকায় কংগ্রেস প্রশ্ন তোলে, মার্কিন কর্তৃপক্ষের চাপে কি মোদী সরকার তদন্তকারী সংস্থাকে ইউএপিএ প্রয়োগ না করার নির্দেশ দিয়েছে?

দলটি আরও জানতে চায়, এর বিনিময়ে ভারত কী পাওয়ার আশা করছে। কংগ্রেসের অভিযোগ ছিল, ভারতীয় নাগরিকদের বিরুদ্ধে ইউএপিএ ব্যবহার করা হলেও বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে হঠাৎ করে এই আইন বাদ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে সরকারের অবস্থান হলো, ভ্যানডাইক ও অন্য ছয় বিদেশির বিরুদ্ধে ইউএপিএ-সংক্রান্ত তদন্ত বন্ধ হয়নি। এনআইএ জানিয়েছে, ইমিগ্রেশন আইনে অভিযোগপত্র দাখিলের পাশাপাশি সন্ত্রাসের ষড়যন্ত্র নিয়ে তদন্ত চলছিল এবং প্রয়োজন হলে পরবর্তী সময়ে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হতে পারে।

ডিফল্ট জামিনে মুক্তি

১৩ মার্চ গ্রেপ্তারের পর ইউএপিএ মামলায় তদন্ত শেষ করার ১৮০ দিনের সময়সীমা ৮ সেপ্টেম্বর শেষ হয়। ওই দিন এনআইএ অভিযোগপত্র দাখিল করলেও সেখানে ইউএপিএর অভিযোগ রাখা হয়নি। এরপর ভ্যানডাইকের আইনজীবীরা ডিফল্ট জামিনের আবেদন করেন।

১৯ সেপ্টেম্বর দিল্লির বিশেষ এনআইএ আদালত ভ্যানডাইককে ডিফল্ট জামিন দেন। বিচারক প্রশান্ত শর্মার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এনআইএর অভিযোগপত্রটি অসম্পূর্ণ বা আংশিক ছিল, কারণ এতে ইমিগ্রেশন আইনের অভিযোগ থাকলেও ইউএপিএ-সংক্রান্ত তদন্ত তখনো চলছিল।

আইনি সময়সীমার মধ্যে তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়ায় ভ্যানডাইক ডিফল্ট জামিন পাওয়ার অধিকারী হয়েছেন বলে আদালত সিদ্ধান্ত দেন।

এরপর ২৪ সেপ্টেম্বর তাকে তিহার জেল থেকে বের হওয়ার এবং যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের কাছে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। একই মামলায় থাকা ছয় ইউক্রেনীয় নাগরিককেও ডিফল্ট জামিন দিয়ে নিজ নিজ দেশে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়।

বিদেশিরা কীভাবে ভারতে ঢুকলেন, প্রশ্ন কংগ্রেসের

ভ্যানডাইকের মুক্তির পর কংগ্রেস ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছেও একাধিক প্রশ্ন তোলে।

জয়রাম রমেশ জানতে চান, সন্দেহভাজন এসব বিদেশি নাগরিক কীভাবে ভারতে প্রবেশের ভিসা পেলেন এবং কীভাবে তারা ভারতের ভেতর দিয়ে মিয়ানমার পর্যন্ত যেতে পারলেন। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তাদের চলাচল ও মিয়ানমারে প্রবেশের বিষয়েও সরকারের কাছে কী তথ্য ছিল, তা জানতে চেয়েছে দলটি।

এনআইএর তদন্ত অনুযায়ী, অভিযুক্তরা পর্যটন ভিসায় ভারতে প্রবেশ করেছিলেন এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি না নিয়েই সেখানে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তারা মিজোরাম দিয়ে মিয়ানমারে প্রবেশ করেন বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।

সব মিলিয়ে ভ্যানডাইকের মুক্তি ও মামলায় ইউএপিএর ধারা না রাখার বিষয়টি নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসের প্রশ্ন, ভ্যানডাইকের বিষয়ে যদি কোনো ধরনের মার্কিন কূটনৈতিক চাপ থেকে থাকে, তাহলে তার বিনিময়ে ভারত কী পেয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মার্কিন চাপের বিনিময়ে কোনো নির্দিষ্ট সুবিধা পাওয়ার প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।

সূত্র: দ্য প্রিন্ট

মুক্তিবাণী

ফেসবুকে

সর্বশেষ আপডেট

এক ক্লিকে বিভাগের খবর


ভিডিও